ছাতকে যৌতুকের বলি গৃহবধূ লুবনা

প্রকাশিত: ৫:৩৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২৬

ছাতকে যৌতুকের বলি গৃহবধূ লুবনা

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় যৌতুকের ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা না পেয়ে লুবনা বেগম (৩১) নামে এক গৃহবধূকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানোর সময় তার ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর অভিযুক্ত স্বামী মো. সুমন পলাতক রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গত ২৯ জুন দুপুরে উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের জোড়াপানি গ্রামে স্বামীর বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত লুবনা বেগমকে প্রথমে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসা শেষে বর্তমানে তিনি বাবার বাড়িতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর ভাই সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার জয়নগর গ্রামের মৃত আলকাছ আলীর ছেলে আজাদ মিয়া (৪৩) গত বৃহস্পতিবার রাতে ছাতক থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০ বছর আগে বিশ্বনাথ উপজেলার জয়নগর গ্রামের লুবনা বেগমের সঙ্গে ছাতক উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের জোড়াপানি গ্রামের সুন্দর আলীর ছেলে মো. সুমনের (২৮) ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক বিয়ে হয়। তাদের সংসারে আরিয়ান (৭) নামে একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই শ্বশুর সুন্দর আলী ও শাশুড়ি আনেছা বেগমের প্ররোচনায় স্বামী সুমন লুবনার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে স্বামী মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন এবং প্রায়ই স্ত্রীকে মারধর করতেন। দীর্ঘদিন নির্যাতন সহ্য করার পর প্রায় এক বছর আগে লুবনা তার সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান।

পরে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজারগাঁও গ্রামের মৃত তফজ্জুল আলীর ছেলে সাজ্জাদুর রহমান (৪৫) নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে লুবনাকে আবার স্বামীর সংসারে ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু সংসারে ফেরার পর পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা কেনার জন্য বাবার বাড়ি থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা এনে দেওয়ার চাপ দেওয়া শুরু হয়।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, যৌতুকের টাকা আদায়ের জন্য প্রায়ই লুবনার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। বিষয়টি মধ্যস্থতাকারী সাজ্জাদুর রহমানকে জানানো হলেও তিনি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৯ জুন দুপুরে স্বামী সুমন, শ্বশুর সুন্দর আলী ও শাশুড়ি আনেছা বেগম লুবনার কক্ষে গিয়ে পুনরায় যৌতুকের টাকা দাবি করেন। লুবনা পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা জানিয়ে টাকা এনে দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

একপর্যায়ে শ্বশুরের নির্দেশে এবং শাশুড়ির সহায়তায় স্বামী সুমন হাতে থাকা ধারালো দা দিয়ে লুবনার ওপর এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করেন। প্রাণ বাঁচাতে তিনি আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে তার দুই হাত, পা, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের কোপ লাগে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হামলায় লুবনার বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের গোড়া, বাম হাতের কনুইয়ের নিচে, ডান হাতের পাতায়, বাম পায়ের হাঁটুর নিচে এবং পিঠের দুই পাশে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। এছাড়া ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মাথা, কান ও শরীরের বিভিন্ন অংশেও গুরুতর জখম হয়।

লুবনার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে এসে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে দ্রুত ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থার অবনতি দেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন।

এ ঘটনার খবর পেয়ে লুবনার ভাই আজাদ মিয়া আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে যান। দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর কিছুটা সুস্থ হলে লুবনা তার ওপর চালানো নির্যাতনের বিস্তারিত ঘটনা ভাই ও স্বজনদের কাছে তুলে ধরেন।

বর্তমানে তিনি বাবার বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার শরীরে একাধিক গভীর ক্ষত রয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হবে। পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছেন বলেও জানান।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকেই প্রধান অভিযুক্ত স্বামী সুমন আত্মগোপনে রয়েছেন। তারা অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের নৃশংস নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার না হলে ভবিষ্যতে যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।

লুবনার ভাই আজাদ মিয়া বলেন, “আমার বোনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাই।”

তিনি আরও জানান, লিখিত অভিযোগের সঙ্গে চিকিৎসার কাগজপত্র, হাসপাতালের প্রতিবেদন এবং আহত লুবনার জখমের আলোকচিত্র থানায় জমা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি। কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো যৌতুকের দাবিতে নারী নির্যাতন, হত্যাচেষ্টা ও হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। তারা এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি যৌতুকবিরোধী সামাজিক সচেতনতা আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।


 

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট