৩০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৫৮ অপরাহ্ণ, মে ২৯, ২০২৬
ঈদুল আজহার কোরবানির হাট শেষ হয়েছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন পশুর হাট থেকে এখনো ট্রাকে ট্রাকে ফিরছে অবিক্রীত গরু। রাজধানীর গাবতলী, কমলাপুর, দিয়াবাড়ীসহ বিভিন্ন অস্থায়ী পশুর হাটে বড় গরুর সারি পড়ে ছিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। ক্রেতা না পেয়ে লোকসান গুনে অনেকে গরু বিক্রি করেছেন, আবার অনেকে গরু ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। এর মধ্যে ১ কোটির কিছু বেশি পশু কোরবানি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ ২২ থেকে ২৩ লাখ পশু অবিক্রীত রয়ে গেছে।
খামারি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, বড় গরুর চাহিদা কম থাকা এবং সীমান্ত দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে গরু আসায় বাজারে এমন ধস নেমেছে। এর সঙ্গে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও কাদাময় হহাঁট পরিস্থিতি পশু বিক্রিকে আরও কঠিন করে তোলে।
এবার সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন বড় গরুর খামারিরা। রাজধানীর বাজারে বড় গরু নিয়ে আসা অনেকেরই ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ গরু অবিক্রীত থেকে গেছে। কেউ কেউ প্রতি গরুতে লাখ টাকার বেশি ক্ষতির কথা জানিয়েছেন।
বগুড়া সদর থেকে রাজধানীর গাবতলী হাটে ২৫টি গরু এনেছিলেন মাহবুব হোসেন। বিক্রি করতে পেরেছেন মাত্র ১৭টি। তিনি বলেন, সব গরুই বড় ছিল। সবগুলোই লোকসানে বিক্রি করেছি। যে গরুর পেছনে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, সেটাই ঢাকায় এনে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে।
মানিকগঞ্জ থেকে গাবতলী হাটে আসা ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ৫০টা গরু এনেছিলাম, বিক্রি করতে পেরেছি মাত্র ১৮টা। বাকিগুলো ফিরিয়ে নিতে হচ্ছে। এবার আমরা গরুর সঙ্গে নিজেরাও কোরবানি হয়ে গেছি।
আরেক ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার বলেন, ৪০টি গরুর মধ্যে ২০টি বিক্রি হয়নি। ঈদের দুই দিন আগে যে গরুর দাম ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা বলা হয়েছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত ২ লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ঋণ করে গরু কিনেছি। টাকা পরিশোধ করতে হবে বলেই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।
দিনাজপুর থেকে ৮০টি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছিলেন ব্যবসায়ী মামুন। চারটি ট্রাকে করে গরু আনার ভাড়া গুনতে হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। সঙ্গে ছিলেন ১১ জন শ্রমিক।
মামুন বলেন, খাওয়া-দাওয়া, গোসল, টয়লেট—সবকিছুর জন্য টাকা লাগে। এখানে শুধু খরচই হয়েছে, লাভ হয়নি। ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত কোনো গরু বিক্রি করতে পারিনি। বাধ্য হয়ে এখন গরু বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি।
কুষ্টিয়া থেকে ৩০টি গরু নিয়ে রাজধানীর কমলাপুর অস্থায়ী পশুর হাটে এসেছিলেন মো. সোহেল আলী। ১০ জন মিলে প্রায় ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন তাঁরা।
সোহেল আলী বলেন, ৩০টা গরুর মধ্যে মাত্র দুটি বিক্রি করতে পেরেছি। বাকি ২৮টা আবার গ্রামে নিয়ে গেছেন। গরু ফিরিয়ে নিতে শুধু ট্রাক ভাড়াই লেগেছে ৩৩ হাজার টাকা।
কুষ্টিয়ার মিরপুর থেকে চারটি গরু নিয়ে আসা আরেক ব্যবসায়ী বলেন, দুটি গরু বিক্রি করে ইতিমধ্যে এক লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বাকি দুটি গরুর দাম ক্রেতারা বলছেন এক লাখ টাকা করে, অথচ কেনা হয়েছে দেড় লাখ টাকা দিয়ে। তিনি বলেন, এভাবে বিক্রি করলে পুরো পুঁজি শেষ হয়ে যাবে। তাই গরু ফিরিয়ে নিচ্ছি।
মানিকগঞ্জ, পাবনা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও যশোরসহ বিভিন্ন এলাকার খামারি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা ছিল তুলনামূলক বেশি।
বাজারে বড় গরুর ক্রেতা কম থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বড় খামারিরা। অনেক খামারি বলছেন, ঢাকায় এসে থাকা, খাওয়ানো, শ্রমিক খরচ, হাটের খরচ—সব মিলিয়ে কয়েক লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। এখন অবিক্রীত গরু নিয়ে আবার খামারে ফিরে যাওয়ায় খাদ্য ও রক্ষণাবেক্ষণের চাপ আরও বাড়বে।
খামারিদের আশঙ্কা, আগের ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে নতুন ঋণও পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে গোখাদ্যের দাম এখনো অনেক বেশি।
বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি নিলয় হোসেন বলেন, মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। ফলে কম কোরবানি হয়েছে। বড় গরুর বাজার প্রায় ভেঙে পড়েছে।
তিনি বলেন, দেশের ৯৮ শতাংশ কোরবানিতে ছোট গরু ব্যবহৃত হয়। এগুলোর মূল উৎপাদক প্রান্তিক খামারি। বড় করপোরেট খামারগুলোর উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় তারা ছোট গরু উৎপাদনে যায় না।
নিলয় হোসেন বলেন, প্রান্তিক কৃষক নিজের বাড়িতে গরু পালন করেন, তাঁদের খরচ কম। কিন্তু বড় খামারের খরচ অনেক বেশি। এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বড় খামারগুলো।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান বলেন, এখনও কোরবানি হওয়া পশুর চূড়ান্ত হিসাব প্রস্তুত হয়নি। মাঠপর্যায় থেকে তথ্য আসছে। তিনি বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর কোরবানি নির্ভর করে। এবার হয়তো কোরবানি কিছুটা বেশি হয়েছে। তবে চূড়ান্ত হিসাব না আসা পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
অবিক্রীত পশু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু কোরবানির সময় পশু থাকবে, তারপর সারা বছর সংকট থাকবে—এটা হওয়া উচিত নয়। কিছু উদ্বৃত্ত থাকলে সারা বছর বাজারে সরবরাহ বজায় থাকে।
সূত্র : সমকাল

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D