২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:০০ অপরাহ্ণ, মে ২৫, ২০২৬
বিদ্রোহ, প্রেম, সাম্য আর মানবতার অবিনাশী উচ্চারণে বাংলা সাহিত্যকে যিনি নতুন ভাষা দিয়েছিলেন, সেই কাজী নজরুল ইসলাম-এর ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ (সোমবার, ২৫ মে)। দিনটি ঘিরে চায়ের নগরী সিলেট থেকে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে আয়োজন করা হয়েছে নানা কর্মসূচির। আলোচনা সভা, নজরুলসংগীত, কবিতা আবৃত্তি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্মরণানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের এই অগ্নিপুরুষের জীবন ও দর্শন।
এবারের জন্মজয়ন্তীকে ঘিরে সরকারি আয়োজনও ছিল ব্যাপক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও পর্যটন বিভাগকে।
জাতীয় পর্যায়ের মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রিশাল-এ। কবির স্মৃতিবিজড়িত এই জনপদে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল একাডেমি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী চলছে আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নজরুলসংগীত পরিবেশনা।
এদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সিলেটে নজরুলের শতবর্ষ স্মরণোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।
‘সিংহবাড়িতে কবি নজরুল’ শিরোনামে নগরের বালুচরে অবস্থিত শিল্পকলা একাডেমিতে বিকাল সাড়ে ৪টায় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সিলেট তথা সিংহবাড়ি আগমনের শতবর্ষ ও ১২৮তম জন্মজয়ন্তী পালিত হবে। অনুষ্ঠানের আয়োজক সিংহবাড়ির সংগঠন ‘ উপেন্দ্র-বীণাপাণি স্মৃতি পরিষদ, সিলেট’।
অনুষ্ঠানে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও বিদেশি অতিথিরা উপস্থিত থাকবেন। দুই পর্বে সাজানো অনুষ্ঠানে প্রথম পর্বে থাকবে উদ্বোধনী সংগীত, শুভেচ্ছা বক্তব্য, দলীয় ও একক সংগীত পরিবেশনা, নৃত্য ও আবৃত্তি। দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে সিংহবাড়ির কৃতী সন্তান বিশিষ্ট নজরুল সংগীত শিল্পী ইংল্যান্ড প্রবাসী ড. শর্মিলা সেন উর্মির ‘পরদেশি বঁধুয়া’ শিরোনামে এক ঘণ্টার নজরুল সংগীত পরিবেশনা করবেন।
১৯২৬ ও ১৯২৮ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সিলেট আসেন। ১৯২৬ সালে অসুস্থ অবস্থায় তিনি যখন সিলেটে অবস্থান করেন, তখন সিংহবাড়ির সদস্যদের আন্তরিক সেবা ও ভালোবাসা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। সেই সম্পর্কের উজ্জ্বল সাক্ষী হয়ে আছে সিংহবাড়ির কন্যা লীলাবতী মজুমদারের উদ্দেশে লেখা কবির হৃদয়ছোঁয়া কবিতা।
রাজধানীতেও ছিল উৎসবমুখর আয়োজন। বাংলা একাডেমি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজন করেছে সেমিনার, নজরুল পুরস্কার প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অন্যদিকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-তে “দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি” শিরোনামে তিন দিনব্যাপী বিশেষ আয়োজনের সমাপনী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নজরুল ইনস্টিটিউট-এর উদ্যোগেও রয়েছে নানা কর্মসূচি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় সত্তা, জাতীয় চেতনা ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রতীক। তাঁর সাহিত্যকে বিশ্বপরিসরে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। অনুষ্ঠানে নজরুল গবেষণা ও কবির জীবনদর্শন নিয়ে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দুই গুণী ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয় নজরুল পদক ও সম্মাননা। পরে তিনি নজরুল স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করেন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে মর্যাদা দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকার।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ২৪ মে ১৯৭২ সালে কলকাতা হতে সপরিবারে ঢাকায় আনা হয় এবং তার বসবাসের জন্য ধানমন্ডিস্থ ২৮ নম্বর (পুরাতন) সড়কের ৩৩০-বি বাড়িটি বরাদ্দ প্রদান করা হয়। কবিকে ১৯৭৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্ৰদান করা হয় এবং একই বছরে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। জীবনাবসানের পর কবিকে পরিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। পরবর্তীতে তাকে জাতীয় কবি হিসেবে সম্বোধন করে কবি নজরুল ইনস্টিটিউট আইন, ২০১৮ জারি করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, ১৯২৯ সালের ১০ ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের কলকাতার এলবার্ট হলে সমগ্র বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে নেতাজী সুবাস চন্দ্র বসু, বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, এস, ওয়াজেদ আলী, দীনেশ চন্দ্ৰ দাশসহ বহু বরণ্যে ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ‘জাতীয় কাণ্ডারি’ এবং ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশে কবির জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে প্রদত্ত বাণীতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী/প্রধান উপদেষ্টাগণ কবিকে ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কাজী নজরুল ইসলাম সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত হলেও তাকে জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করে সরকারিভাবে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি।
১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই কবি বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার অন্যতম পথিকৃৎ। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতায় রেখে গেছেন অনন্য অবদান।
জীবনের শুরু থেকেই সংগ্রাম ছিল তার নিত্যসঙ্গী। শৈশবে মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ থেকে শুরু করে লেটো দলে গান লেখা—জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাকে গড়ে তোলে বহুমাত্রিক স্রষ্টায়। ১৯১৭ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতাও তার সাহিত্যকে প্রভাবিত করে।
১৯২২ সালে প্রকাশিত “বিদ্রোহী” কবিতা বাংলা সাহিত্যে যেন এক বিস্ফোরণের জন্ম দেয়। “বল বীর— / চির-উন্নত মম শির!” উচ্চারণে এক নতুন যুগের সূচনা হয় বাংলা কবিতায়। একই সময়ে প্রকাশিত হয় তার কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা, যা বাংলা কাব্যের ধারাই বদলে দেয়। “প্রলয়োল্লাস”, “কামাল পাশা”, “শাত-ইল্-আরব” কিংবা “বিদ্রোহী”—প্রতিটি কবিতাই ছিল সময়কে নাড়িয়ে দেওয়া উচ্চারণ।
কেবল দ্রোহ নয়, প্রেম ও মানবতার কবিও ছিলেন নজরুল। বাংলা কাব্যে গজলের ধারা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তিনি রচনা করেছেন শ্যামাসংগীত, ভক্তিগীতি ও ইসলামী সংগীত। প্রায় চার হাজার গান রচনা ও সুরারোপের মাধ্যমে বাংলা সংগীতকে দিয়েছেন নতুন মাত্রা। তার “খুকি ও কাঠবিড়ালি”, “লিচু চোর” কিংবা “খাঁদু দাদু”-র মতো শিশুতোষ কবিতাও আজও সমান জনপ্রিয়।
রাজদ্রোহের অভিযোগে কারাবন্দী জীবনও তাকে থামাতে পারেনি। প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি অবস্থায় রচিত হয় তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ দোলনচাঁপা-এর বহু কবিতা। শৃঙ্খলিত জীবনেও তিনি লিখেছিলেন স্বাধীনতার গান, মানুষের মুক্তির কথা।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয় কবিকে। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার ইচ্ছানুসারে তাকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ-এর পাশে।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D