দেশের প্রথম কোভিড যোদ্ধা ডাঃ মঈন উদ্দিনের পরিবারের কান্না এখনো থামেনি

প্রকাশিত: ১১:০০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০২১

দেশের প্রথম কোভিড যোদ্ধা ডাঃ মঈন উদ্দিনের পরিবারের কান্না এখনো থামেনি

হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরবো-পরিবারের সদস্যদের এমন আশ্বাস দিয়েই বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন ডা: মো: মঈন উদ্দিন। কথা বার্তার স্বাভাবিকতায় মনে হয়নি, এক সপ্তাহের ব্যবধানে মারা যাবেন প্রাণবন্ত এ মানুষটি। অন্য সবার মতো পরিবারের সদস্যদের কাছেও তার এ মৃত্যু ছিল-অপ্রত্যাশিত।
এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে দেশের প্রথম কোভিড যোদ্ধা শহীদ ডাঃ মোঃ মঈন উদ্দিনের স্ত্রী ডাঃ চৌধুরী রিফাত জাহান স্বামী সম্পর্কে এ মন্তব্য করেন। ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে মারা যান ডাঃ মঈন। এ সময় সকল ভয় উপেক্ষা করে স্বামীর পাশে ছায়ার মতো আগলে ছিলেন ডা: রিফাত।

মারা যাওয়ার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি এ প্রতিবেদকের সাক্ষাত হয় তাঁর (ডাঃ রিফাত) সাথে হাউজিং এস্টেটস্থ বাসায়। আলাপকালে স্বামী সম্পর্কে অনেক স্মৃতিচারণই করেন তিনি। স্বামীর মৃত্যুতে অসহায়ত্বের বিষয়টিও তার কথায় ফুটে উঠে।
তিনি জানান, শহীদ ডাঃ শামসুদ্দিন হাসপাতালে ভর্তির পর সেখানে তার এক্সরে করানো হয়। এরপর তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করতে না পারায় তারা অ্যাম্বুলেন্সযোগেই তারা তাকে নিয়ে ঢাকার পথে রওয়ানা দেন। অ্যাম্বুলেন্সে স্বামীর পাশেই ছিলেন। এমনকি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে তিনি ছিলেন স্বামীর পাশে। স্বল্পভাষী ডাঃ মঈন হাসপাতালের বেডে স্ত্রীর সাথে তেমন কথা না বললেও তাকে কেবল মাথায় হাত বুলাতে বলতেন। জানালেন, মারা যাওয়ার আগের দিন তিনি বাথরুমে যান। বাথরুম থেকে ফেরার পর তিনি কিছুটা অস্থিরতা করতে থাকেন। এরপর ১৫ এপ্রিল ভোরে মারা যান তিনি।
ডা: রিফাত জানান, তার স্বামী এভাবে অকালে মারা যাবেন এটা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।
বাসা থেকে বের হওয়ার দিন-ডাঃ মঈনের খাটে (বিছানায়) যে বিছানার চাদর ছিল, সেই চাদরটি আজো বিছানায় বিছিয়ে রেখেছেন ডা: রিফাত। পাশাপাশি তার নামাজের স্থানটিও রাখা হয়েছে অবিকল। তিনি (ডাঃ) যে স্যান্ডেল ব্যবহার করতেন-সেই স্যান্ডেলটিও রাখা হয়েছে তার বিছানার নিচে। অশ্রæভেজা কণ্ঠে ডা: রিফাত জানালেন স্বামীর স্মৃতি রক্ষার্থেই তার এমন পদক্ষেপ।
বেসরকারি পার্ক ভিউ মেডিকেল কলেজের ফিজিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও এ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান (চলতি দায়িত্ব) ডাঃ রিফাত জাহান অশ্রæসিক্ত নয়নে জানান, বাবার অনুপস্থিতিতে তার দুটি অবুঝ সন্তান জিহাদ ও জায়ান সবচাইতে বেশী কষ্ট পাচ্ছে। ছোট ছেলে জায়ান একটিবারের জন্য হলেও বাবাকে দেখতে চায়। কিন্তু, মা হিসেবে তিনি অনেক সময় তাদেরকে সান্তনা দেয়ার ভাষাটিও হারিয়ে ফেলেন। এ প্রতিবেদকের সাক্ষাতের দিন জায়ানের খতনা (মুসলমানি) দেয়া হয়। এদিন বাবার জন্য সে যেন আরো বেশী ছটপট করতে থাকে। এ প্রতিবেদকের সামনেই সে বার বার মন খারাপ করে বাবার বেড রুমে যাচ্ছিল।
ডা: রিফাত জানান, মৃত্যুর পর সবাই তার স্বামীর প্রশংসা করেছে। একটি লোকও তাকে খারাপ বলেনি-এটাই তার সান্তনা বলে যোগ করেন তিনি।
ডা: মঈন উদ্দিনের ছোট ভগ্নিপতি ও সিলেট পিটিআই’র সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর মোঃ খসরুজ্জামান জানান, আনন্দনিকেতনের শিক্ষার্থী ডাঃ মঈনের ছোট ছেলে আব্দুল্লাহ মাহমুদ জায়ান (৮) এখনো তার বাবার জন্য কাঁদে। পড়ালেখার প্রতি আন্তরিক জায়ান অনলাইনে রুটিন অনুযায়ী ক্লাসে অংশ নেয়। এমনকি হোমওয়ার্কও নিজে নিজে সেরে ফেলে। অটিস্টিক স্কুলের শিক্ষার্থী বড় ছেলে ফাইয়াজ মাহমুদ জিয়াদকে (১৩) বাবার মৃত্যুর বিষয়টি এখনো তেমন আচ করতে পারেনি। ছোট ভাইয়ের সাথে খেলা করে মোবাইলে গেম খেলে তার সময় কাটে। ডাঃ মঈন উদ্দিন ট্রাস্টের সদস্য সচিব খসরুজ্জামান আরো জানান, এখনো স্বামীর মৃত্যুর ক্ষত কাটিয়ে উঠতে পারেননি ডা: মঈনের স্ত্রী।
ডাঃ মঈন উদ্দিনের চাচাতো ভাই, অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা জহুরুল হক ওরফে আইয়বুল হক এ প্রতিবেদককে জানান, ডাঃ মঈন মানুষজনকে উদারহস্তে দান করতেন। কিন্তু, লোকজনকে না জানানোর শর্তে তিনি দান করতেন। এটা ছিল তার চরিত্রের অনন্য বৈশিষ্ট্য। মৃত্যুর পর পারিবারিকভাবে তার তার দানের অনেক খবর জেনেছেন বলে জানান তিনি। ছোট বেলা থেকেই তাঁর এ চাচাতো ভাইটি অসম্ভব মেধাবী ছিলেন বলে জানান তিনি। ডাঃ মঈনের মৃত্যুতে তাদের পুরো পরিবারের পাশাপাশি এলাকার গরীব-অসহায় মানুষ কষ্ট পাচ্ছে বলে জানান তিনি।
সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, এমসি কলেজের ইংরেজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও পরবর্তীতে উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক হায়াতুল ইসলাম আকঞ্জি জানান, ডাঃ মঈন ছিলেন অমায়িক চরিত্রের অধিকারী এক মেধাবী শিক্ষার্থী। চিকিৎসক হবার পরও শিক্ষকদের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ শ্রদ্ধাÑভালোবাসা।
এম সি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক তোতিউর রহমান জানান, ডাঃ মঈনের মেধার তুলনা হয় না। মৃত্যুর পর মানুষ তাকে যেভাবে মূল্যায়ন করেছে-এটাই তার জীবনের সবচাইতে বড় প্রাপ্তি।
‘গরীবের ডাক্তার’ খ্যাত ডাঃ মঈনের মৃত্যুর কারণে অনেক রোগীও পড়েছেন বিপাকে। নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকার জনৈক রোগী জানান, ডাঃ মঈনের দেয়া প্রেসক্রিপশনের ঔষধ খেয়ে অসুস্থতা থেকে তিনি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু, তিনি( ডা: মঈন) মারা যাবার পর তিনি এখন পর্যন্ত আর কোন ডাক্তার দেখাতে যাননি।
ডাঃ মোঃ মঈন উদ্দিন ১৯৭৩ সালের ২ মে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নাদামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের স্কুল থেকে পাঠশালা পাশের পর তিনি ধারণ নতুন বাজার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৮ সালে এসএসসি এবং ১৯৯০ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। একই বছর ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে ১৯৯৮ সালে কৃতিত্বের সাথে এমবিবিএস পাস করেন। এরপর তিনি এফসিপিএস ও এমডি কোর্স সম্পন্ন করেন।
২২তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ স্বাস্থ্য ক্যাডারে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৪ সালের ২০ মে তিনি ওসমানী মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
ডাঃ মঈন উদ্দিন সিলেটে করোনা যুদ্ধে প্রথম সারির যোদ্ধা ছিলেন। ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উদ্যোগে গঠিত সিলেট করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। এর আগে তিনি এ হাসপাতালের ডেঙ্গু প্রতিরোধ কমিটিসহ আরো কয়েকটি কমিটির দায়িত্ব পালন করেন।
গত ৫ এপ্রিল আইইডিসিআর থেকে তার করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে। গত ৩০ মার্চ থেকে তিনি তার বাসায় কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। পজিটিভ রিপোর্ট আসার পর নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকা লকডাউন ঘোষণা করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ৭ এপ্রিল সিলেট নগরীর শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে করোনা আইসোলেশনে সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। ৮ এপ্রিল পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে এ্যাম্বুলেন্সযোগে দ্রæত ঢাকায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট)-এ নেয়া হয়। আইসিইউকে থাকা অবস্থায় ১৫ এপ্রিল বুধবার সকালে পৌনে ৭টায় চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক ডাঃ আবুল কালাম আজাদ তাকে দেশের প্রথম কোভিড যোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেন।

ওইদিনই তাকে নাদামপুরে বাবা-মার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকেও শোক প্রকাশ করা হয়।


  •