|
প্রকাশিত: ১২:৫৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২৬
মোহাম্মদ মহসীন : বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ছিল অন্যায়, চরম বৈষম্য এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আমজনতার সুমহান জাগরণের অধ্যায়। রাজপথে আঁকা দেওয়ালচিত্র বা গ্রাফিতিতে রক্তের রঙে লেখা শহীদের নামগুলো কেবল কোনো ব্যক্তিবিশেষের পরিচয় নয়; এগুলো একেকটি প্রতিবাদের মশাল, স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ের অমলিন দলিল।
রাজপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (পুলিশ) ও তৎকালীন শাসকদলের ক্যাডার বাহিনীর (ছাত্রলীগ-যুবলীগ) নির্বিচার টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও তাজা বুলেটের মুখোমুখি হয়ে যেসব সূর্যসন্তান আত্মাহুতি দিয়েছিলেন, তাঁদের স্মৃতি ধারণ করেই উদযাপিত হচ্ছে ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’।
এ অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার লাল বৃত্তে যেন দেখতে পাই ফ্যাসিস্ট বিরোধী শহদের রক্ত এবং তার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আন্দোলনকারী আহত, পংগু তরুণ ও বীর শহীদদের। তাঁদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের চালানো নৃশংসতা পৃথিবীর যেকোন বর্বরতাকে ছড়িয়ে যায়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ। ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বুক পেতে দু হাত প্রসারিত করে বীরদর্পে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ছাত্রলীগের ধাওয়া এবং পুলিশের খুব কাছ থেকে ছররা গুলি ছুড়লে বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে রাজপথেই ঢলে পড়েন সাঈদ। শহীদ হন তিনি। তাঁর এই অবিচল সাহস পুরো আন্দোলনকে দেশের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে দেয়। বিইউপি-এর শিক্ষার্থী ও তরুণ ফ্রিল্যান্সার মির মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। ১৮ জুলাই উত্তরার রাজপথে আন্দোলনরত তৃষ্ণার্ত শিক্ষার্থীদের মাঝে ‘পানি লাগবে কারোর, পানি?’ বলে পানি ও বিস্কুট বিতরণ করছিলেন। এর ঠিক কিছুক্ষণ পরেই পুলিশের ছোঁড়া বুলেট তাঁর কপালে এসে লাগে। তৃষ্ণার্তদের মুখে পানি তুলে দেওয়ার অপরাধে কেড়ে নেওয়া হয় তাঁর তাজা প্রাণ। এর পূর্বেই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক ভিত তৈরি হয়েছিল বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। ২০১৯ সালে ভারতের সাথে অসম চুক্তির প্রতিবাদে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় বুয়েটের শেরেবাংলা হলে দীর্ঘ সাড়ে ছয় ঘণ্টা ধরে ফ্যাসিস্টদের লালিত ক্যাডাররা রড ও ক্রিকেট স্টাম্পের দ্বারা নির্মম আঘাতে আঘাতে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের একদল সন্ত্রাসী। তাই গণ-অভ্যুত্থানের নানান গ্রাফিতিতে শ্রদ্ধার সাথে স্থান পেয়েছেন বাকস্বাধীনতার প্রতীক আবরার। সাভারের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (MIST)-এর সিএসসি বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ আশহাবুল ইয়ামিন ১৮ জুলাই সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে শহীদ হন। পরবর্তীতে দেখা যায়, সাভারের পুলিশ সদস্যরা
আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে পুলিশের সাঁজোয়া যানের (APCV) ওপর তুলে পরে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়, যা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজ ধানমন্ডি এলাকায় আন্দোলনকারীদের সাথে উপস্থিত ছিলেন। ১৮ জুলাই ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ হামলা ও গোলাগুলির সময় মাত্র ১৭ বছর বয়সী ফাইয়াজের বুকে তাজা গুলি চালানো হলে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। ওয়াসিম আকরাম চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতা। ১৬ জুলাই চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের অস্ত্রধারীদের হামলা ও সরাসরি গুলিবর্ষণে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে শহীদ হন তিনি। জিল্লুর, শান্ত, ফারহামিয়া, তানভিন, ইরফান, রিয়া, ইয়ামিন, তামজিদ, তাহমিদ, রেজওয়ান, শাকিল, দীপ্ত, প্রিয় সহ অসংখ্য উদীয়মান তরুণ প্রজন্মের সেই বিশাল আত্মত্যাগের সাক্ষ্য বহন করে। কেউ পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেডে ও বুলেটে প্রাণ হারিয়েছেন, কেউবা রেহাই পাননি শাসকদলের সংঘাত থেকে।
গণ-অভ্যুত্থানের স্বৈরাচারবিরোধী অগ্নিঝরা দিনগুলোতে দেশের অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা-উপজেলা শহরের ন্যায় আধ্যাত্মিক ও ঐতিহ্যের নগরী সিলেটও ছিল আন্দোলনের অন্যতম উত্তাল দুর্গ। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি), এমসি কলেজ, লিডিং ইউনিভার্সিটি এবং সাধারণ ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে ঐতিহাসিক কোর্ট পয়েন্ট, বন্দরবাজার, চৌহাট্টা ও জিন্দাবাজার এলাকা কাঁপিয়ে তোলেন। এই আন্দোলনে সিলেটের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। সেদিন বন্দরবাজার এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন দৈনিক নয়াদিগন্ত ও দৈনিক জালালাবাদ-এর প্রতিনিধি, তরুণ সাংবাদিক এ টি এম তুরাব (আবু তাহের মুহাম্মদ তুরাব)। গায়ে স্পষ্ট ‘প্রেস’ লেখা জ্যাকেট এবং মাথায় হেলমেট থাকা সত্ত্বেও পুলিশের ছররা গুলিতে মারাত্মক আহত হন তিনি এবং ওই দিনই হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তুরাবের এই বলিদান প্রমাণ করে, ছাত্র-জনতার সাথে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপরও সেদিন কেমন অমানবিক নিপীড়ন চালিয়েছিল পুলিশ প্রশাসন। জনতাকে খুণ করে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি শাসকগোষ্ঠী, ৫ আগস্ট ২০২৪ তথা ৩৬ জুলাই দেশ থেকে পালিয়ে ইতিহাসের আস্তাকুড়েই নিক্ষিপ্ত হয়েছে।
তাই দিবসটির মূল তাৎপর্য অনুধাবন করে আমাদের অঙ্গীকার হলো ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ শুধু শোক প্রকাশের দিন নয়; এটি স্বৈরাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের বিজয়ের দিন। এই দিবসের প্রধান দাবিসমূহ- হত্যার ন্যায়বিচার, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া, আহত ও পঙ্গুত্ব বরণকারী হাজারো শিক্ষার্থী ও আমজনতার সুচিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা; স্বৈরাচারমুক্ত যে স্বাধীন ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে তরুণরা রক্ত দিয়েছে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্পন্ন করা; এবং তরুণদের আত্মত্যাগের ওপর ভিত্তি করে শেখ হাসিনার পলায়ন ও স্বৈরাচারের পতনের মাধ্যমে যে নতুন ভোরের সূচনা হয়েছে, তাকে অক্ষুণ্ণ রাখা।
লেখক : প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, সিলেট।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D