৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৭:৪১ অপরাহ্ণ, জুন ৬, ২০২৬
ছাতক ও সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট, ভুয়া বিল উত্তোলন এবং সরকারি মালামাল আত্মসাতের অভিযোগে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নানা অনিয়ম দুনীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদিরকে বদলি করা হলেও প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া এখনো দায়িত্বে বহাল থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী ঠিকাদার এবং অভিযোগকারীদের দাবি, ছাতক, শান্তিগঞ্জ, জগন্নাথপুর, দোয়ারাবাজার, বিশ্বনাথ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পুরাতন বিদ্যুৎ লাইন সংস্কার, নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়নের নামে কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার বিপুল অঙ্কের বিল উত্তোলন করা হয়েছে। অথচ বাস্তব চিত্রে অনেক কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না।
অভিযোগকারীরা জানান, সরকারি প্রকল্পে ব্যবহৃত তামার কেবল, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ক্রস-আর্ম, রেক ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে। সিলেট-সুনামগঞ্জ, সিলেট-জগন্নাথপুর এবং সিলেট-বিশ্বনাথ সড়কের বিভিন্ন স্থানে এখনো হাজার হাজার বৈদ্যুতিক খুঁটি ও সরঞ্জাম খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এসব মালামাল নিয়ে একাধিকবার ক্রয়-বিক্রয় এবং স্টোরে ফেরত দেখিয়ে ভুয়া বিল উত্তোলনের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা।
এদিকে বিদ্যুৎ সংযোগ ও ট্রান্সফরমার স্থাপনের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগে একসময় একটি চাঁদাবাজি মামলাও দায়ের হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই মামলাটি পরে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ছাতকে দীর্ঘ প্রায় নয় বছর ধরে একই প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। বিভিন্ন টেন্ডারে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, বিল ছাড়ে অনিয়ম এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রকল্পের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিটি ওয়ার্ক অর্ডারের বিপরীতে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দুইহাজার ৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বহু এলাকায় কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, ছাতক, গোবিন্দগঞ্জ ও রাউলী এলাকায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের কাজে অনিয়ম দুনীতি লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের রাউলী এলাকায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ সাব ষ্টেশনের ঠিকাদারি অসম্পূর্ণ কাজ রেখেই ঠিকাদার পালিয়ে যায়। এখনো ও অসম্পূর্ণ রয়েছে স্থাপনার কাজটি। প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার ৬০০টি খুঁটি স্থাপনের কথা থাকলেও বাস্তবে তার বড় অংশ এখনো বিভিন্ন স্থানে পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া একই কাজের বিপরীতে একাধিকবার বিল উত্তোলন, আংশিক কাজ সম্পন্ন করেই পূর্ণাঙ্গ কাজ দেখানো এবং প্রকল্প ও বিভাগীয় অফিস—উভয় উৎস থেকে অর্থ ছাড়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় ও আত্মসাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগকারীরা আরও বলেন, নতুন বিদ্যুৎ লাইন সংযোগ এবং ট্রান্সফরমার স্থাপনের ক্ষেত্রেও অনেক গ্রাহকের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায় করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সংযোগের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ২৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রকল্পের শুরু থেকেই ব্যয় নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি ব্যয় দেখানো, অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে বিল উত্তোলন এবং সরকারি মালামালের যথাযথ হিসাব না থাকায় জনমনে সন্দেহ আরও বেড়েছে।
সূত্র জানায়, প্রকল্পে অনিয়ম, ভুয়া বিল এবং সরকারি মালামাল গায়েব হওয়ার অভিযোগে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগকারী সেবুল নামে এক ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, ২০১৮ সালে প্রকল্প শুরুর পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সব ব্যয়, টেন্ডার, বিল এবং মালামাল ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা ও তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
এদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন, দুই হাজার ৫৩ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও যদি জনগণ প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ সুবিধা না পায়, তাহলে এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের সুফল কোথায়? তাদের দাবি, শুধু বদলি নয়, বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পে ব্যবহৃত প্রতিটি টাকার হিসাব, সরকারি মালামালের ব্যবহার এবং বিল উত্তোলনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, বিদ্যুৎ উন্নয়নের নামে নেওয়া এই মেগা প্রকল্প এখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তই পারে প্রকল্প ঘিরে ওঠা অভিযোগের সত্যতা উদঘাটন করতে এবং জনমনে সৃষ্টি হওয়া প্রশ্নের জবাব দিতে।
এ বিষয়ে অভিযোগের প্রসঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া বলেন, ‘সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদিরের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন।’
অন্যদিকে বদলিকৃত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদিরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকাস্থ প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) চন্দন কুমার সূত্রধর বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D