মৌলভীবাজারে বিক্রি না হওয়ায় নদীতে ফেলা হচ্ছে কোরবানির পশুর চামড়া

প্রকাশিত: ৫:২০ অপরাহ্ণ, মে ৩০, ২০২৬

মৌলভীবাজারে বিক্রি না হওয়ায় নদীতে ফেলা হচ্ছে কোরবানির পশুর চামড়া

মৌলভীবাজারে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ক্রেতার অভাবে অনেকেই চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মাটি চাপা দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ নদ-নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। অন্যান্য বছর এতিমখানা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করলেও এবার সেই চিত্রও দেখা যাচ্ছে না। ফলে কোরবানিদাতা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও চামড়া সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা সবাই পড়েছেন বিপাকে।

শুক্রবার (২৯ মে) বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জেলার ঐতিহ্যবাহী বালিকান্দি চামড়ার হাটসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন পরিস্থিতি দেখা যায়। চামড়া কিনে এনে ব্যবসায়ীরা যেমন ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না, তেমনি লবণের সংকটের কারণে সংরক্ষণ করাও হয়ে উঠেছে কঠিন।

সদর উপজেলার আমতৈল গ্রামের নওয়াব আলী জানান, তিনি দুটি চামড়া ৩০০ টাকায় কিনেছিলেন এবং আরও ১০টি চামড়া দান হিসেবে পেয়েছিলেন। বিক্রির জন্য শহরের পৌর বাস টার্মিনালে গেলেও কোনো ক্রেতা চামড়াগুলোর দাম দিতে রাজি হননি। এতে যাতায়াত খরচ ও সময়—দুই-ই নষ্ট হয়েছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

চামড়া ব্যবসায়ী হাফিজ এনামুল হক শাহনুর বলেন, লবণের সংকটের কারণে শত শত চামড়া নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চামড়া সংরক্ষণ করতে না পেরে তিনি প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০টি চামড়া মনু নদীতে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

একই কথা জানান চামড়া শ্রমিক আল-আমিন। তিনি বলেন, প্রতিবছর কোরবানির সময় লবণের দাম বেড়ে যায়। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব না হওয়ায় মালিকের প্রায় ৪০০টি চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে।

প্রায় দুই শতাব্দীর পুরোনো বালিকান্দি চামড়ার হাটের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক ব্যবসায়ী সৈয়দ মুজাহিদ আলী বলেন, গত ১০-১২ বছর ধরে চামড়ার বাজারে ধারাবাহিক মন্দা চলছে। অনেক ব্যবসায়ী ট্যানারি মালিকদের কাছে লাখ লাখ টাকা পাওনা রেখেই ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।

প্রবীণ চামড়া ব্যবসায়ী সুলেমান মিয়া জানান, শুক্রবার রাত পর্যন্ত তিনি ৫০০টির বেশি চামড়া কিনেছেন। প্রতিটি চামড়ার দাম ১০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে পড়েছে। তবে লবণের অভাবে সব চামড়া সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে না বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বালিকান্দি বাজার চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শওকত আলী বলেন, ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের কাছে তাদের গত বছরের প্রায় ৯৫ লাখ টাকা এখনও বকেয়া রয়েছে। এ বছর প্রায় দুই হাজার চামড়া কেনা হয়েছে। এসব চামড়া সংরক্ষণে তিন থেকে চারশ মণ লবণ প্রয়োজন হলেও মজুত রয়েছে মাত্র দেড়শ মণ। ফলে অনেক চামড়া ও বর্জ্য মাটি চাপা দেওয়া বা নদীতে ফেলে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চামড়া শ্রমিক মাহমদ আলী বলেন, বাজারে যেসব চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। অথচ অনেক ব্যবসায়ী বেশি দামে কেনার দাবি করছেন।

এদিকে সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার আব্দুস শহীদ জানান, তিনি ৩০টি চামড়া ৬ হাজার টাকায় কিনে এখন বিপাকে পড়েছেন। কারণ ক্রেতারা প্রতি চামড়ার দাম মাত্র ৩০ থেকে ৪০ টাকা প্রস্তাব করছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় বালিকান্দি এলাকায় ২৫ থেকে ৩০ জন নিয়মিত চামড়া ব্যবসায়ী ছিলেন। বাজারে দীর্ঘদিনের মন্দার কারণে এখন হাতে গোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী এ পেশায় টিকে আছেন। তারা বলছেন, দ্রুত বাজার স্থিতিশীল না হলে ঐতিহ্যবাহী এই ব্যবসা আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট