শাকসু নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা, অবরুদ্ধ ভিসি-প্রোভিসিসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা

প্রকাশিত: ৬:৪০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৯, ২০২৬

শাকসু নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা, অবরুদ্ধ ভিসি-প্রোভিসিসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা

স্বতন্ত্র এক প্রার্থীর করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করায় ক্যাম্পাসজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা মিছিল, বিক্ষোভ এবং সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলনে নামেন।

সোমবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে প্রার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে দুপুর ২টা ১০ মিনিটের দিকে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে সড়কের উভয় পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি চালিয়ে যান। এ সময় ‘শাকসু আমার অধিকার, রুখে দেওয়ার সাধ্য কার’সহ বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস এলাকা।

বিকেলে সাড়ে ৫ টার দিকে টানা তিন ঘন্টা সড়ক অবরোধের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বর ও প্রশাসনের ভবনের সামনে বিক্ষোভ করছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

বিক্ষোভে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য প্যানেল’, ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেল, বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং বিপুল সংখ্যক সাধারণ শিক্ষার্থী অংশ নেন।

এর আগে দুপুর সাড়ে ১২ টায় প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা।

দীর্ঘ ২৮ বছর পর মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকাল ৯টায় শাকসু নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরুর কথা ছিল। তবে সোমবার দুপুরে হাইকোর্টের আদেশে নির্বাচন চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত হয়।

বিকেল সোয়া চারটার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তারা নির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিটকারী সহসভাপতি (ভিপি) পদপ্রার্থী স্বতন্ত্র প্রার্থী মুমিনুর রশীদকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। প্রার্থীদের পক্ষে বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী ফয়সাল হোসেন। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেম্বার আদালতে আবেদন করা হয়েছে এবং শুনানি না হওয়া পর্যন্ত সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক অবরোধ অব্যাহত থাকবে।

এদিকে শাকসু নির্বাচন ঘিরে শিক্ষক সমাজেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নেই’- এমন অভিযোগ তুলে শাকসু নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন বিএনপিপন্থী আটজন শিক্ষক। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলনে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি আশরাফ উদ্দিন জানান, পদত্যাগকারী কমিশনারদের পাশাপাশি বিএনপিপন্থী আরও ১০০ থেকে ১৫০ জন শিক্ষক নির্বাচন সংক্রান্ত সব দায়িত্ব থেকে বিরত থাকবেন।

পদত্যাগকারী কমিশনারদের মধ্যে ছয়জনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন- অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, রেজোয়ান আহমেদ, মো. মাহবুবুল আলম, মো. আশরাফ সিদ্দিকী, মুহ. মিজানুর রহমান ও জি এম রবিউল ইসলাম।

অন্যদিকে একই দিন বেলা দেড়টার দিকে জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) সাস্ট চ্যাপটারের পক্ষ থেকে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংগঠনের সদস্যসচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রিটের রায় শাকসু নির্বাচনের বিপক্ষে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেন দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে- সে বিষয়ে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।’ একই সঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই এবং নির্বাচন যথাসময়েই হওয়া উচিত।’

এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিক্ষোভকারীরা প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিলে উপাচার্য এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী, সহ-উপাচার্য মো. সাজেদুল করিম এবং কোষাধ্যক্ষ মো. ইসমাইল হোসেন সেখানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। সন্ধ্যে সাড়ে ৬টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারা প্রশাসনিক ভবনেই অবস্থান করছিলেন।

তবে প্রশাসনিক ভবনের অবরোধ কখন প্রত্যাহার করা হবে এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।


অবরুদ্ধ ভিসি-প্রোভিসিসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা


শিবির সমর্থিত দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য প্যানেলের প্রার্থী দেলোয়োর হাসান শিশির জানান, হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে আমাদের ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত হওয়ার প্রতিবাদে আমরা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক অবরোধ করেছিলাম। তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা মাথায় রেখে আমরা সড়ক থেকে সরে এসে এবার ক্যাম্পাসের ভিতরে প্রশাসনিক ভবন ও গোল চত্বরে অবস্থান নিয়েছি। আমাদের দাবি একটাই আগামীকাল (মঙ্গলবার) শাকসু নির্বাচন চাই, না মানা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।

এদিকে শাবিপ্রবির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদে চলমান সড়ক অবরোধের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে বের হলে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন গণিত বিভাগের প্রধান ও জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফ উদ্দিন।

তিনি নিজ কাজ শেষে বাড়ি ফেরার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে বের হলে আন্দোলনস্থলে থাকা কিছু শিক্ষার্থী তাঁর উদ্দেশে ‘ভুয়া ভুয়া’, ‘দালাল দালাল’ স্লোগান দেন। এসময় তাকে কয়েকজন শিক্ষার্থী পাশের একটি দোকানে প্রবেশ করে সেখানে অবস্থান নেন।

পরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কয়েকজন এগিয়ে এসে তাঁকে নিরাপদে সরে যেতে সহায়তা করেন।

শাকসু নির্বাচন স্থগিতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে সৃষ্টি হওয়া এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা।

এবারের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ২৩ পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৯৭ জন। এছাড়া ছয়টি হল সংসদে লড়ছেন ৮৪ জন। প্রতিটি হল সংসদে নির্বাচনের জন্য ৯টি পদ রয়েছে। সবশেষ শাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ২৫ অগাস্ট।


 

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট