দেশে সুশাসনের অভাব রয়েছে বললেন দুদক চেয়ারম্যান

প্রকাশিত: ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৮

দেশে সুশাসনের অভাব রয়েছে বললেন  দুদক চেয়ারম্যান

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, দুর্নীতিবাজ যতই ক্ষমতাবান হোক, তার বিচার একদিন হবে। গতকাল সোমবার রাজধানীতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একার পক্ষে দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমি চাই আপনারা সবাই একসঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমালোচনা করুন। সত্য বলতে হবে, সত্য কী? সত্য হলো দেশে সুশাসনের অভাব রয়েছে। দুর্নীতি সুশাসনের অন্তরায়। আমরা যদি একতাবদ্ধ হয়ে কথা বলতে না পারি তাহলে দুর্নীতি দূর করা সম্ভব না। নতুন প্রজন্ম দুর্নীতিকে ঘৃণা করে। আমি বিশ্বাস করি, দুর্নীতি দমন কমিশন যদি এসব সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করে তাহলে অনেকাংশেই দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব। আপনারা আমাদের (দুদক) কাজের সমালোচনা করবেন। সমালোচনা না করলে আমরা বুঝতে পারব না আমাদের ভুল কোথায়। টিআইবির জাতীয় সম্মেলনের একটি প্যানেল আলোচনার পর এক প্রশ্নে বড় দুর্নীতিবাজদেরও বিচারের আওতায় আনার অঙ্গীকারের কথা বলেন ইকবাল মাহমুদ। প্যানেল আলোচনায় বক্তব্যের পর টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান তার কাছে জানতে চান, ‘বড় বড় দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতাবানদের বিষয়ে দুদক সক্রিয় নয় বলে জনমনে ধারণা রয়েছে। এক্ষেত্রে দুদকের অবস্থান কী?’ উত্তরে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, কৌশলী পদক্ষেপে অগ্রসর হওয়ায় বড় দুর্নীতিবাজদের ধরতে সময় নিচ্ছেন তারা। তবে কেউ ছাড় পাবে না। ছোট গাছ উপড়ানো যেমন সহজ, বড় গাছ উপড়ানো তেমন কঠিন কাজ। আমাদের কৌশলী হতে হয়। এটা একটা যুদ্ধ। এই যুদ্ধে আপনি সব সময় এগিয়ে যাবেন সেটা না। আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে, আবার পিছিয়েও আসতে হতে পারে। আপনারা আমার সঙ্গে একমত হবেন, এটা এত সহজ ব্যাপার না। উই আর স্মল, দে আর বিগ। তবে এটা ঠিক, আমরা বড়দের বিচারের আওতায় আনি নাই- এমন কথা সম্পূর্ণ সত্য নয়। আপনারা দেখেছেন, দৃশ্যমান কিছু আমরা করেছি। টু ক্রিয়েট সাম এক্সামপল দ্যাট হ্যাজ ডান। কথা ঠিক, আমরা বেশি মাত্রায় করতে পারতেছি না, প্রত্যাশার সঙ্গে অ্যাচিভমেন্ট- সেটার অনেক ফারাক। সেটা আমরা বুঝতে পারি। তবে সেটা স্ট্র্যাটেজিক। বড় দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনা ‘সময়ের ব্যাপার’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, সময় গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এমন কোনো কাজ করতে চাই না যে আপনি একটা কাজে হাত দিয়েছেন, হাতটা তুলে নিলেন, তাতে স্ট্র্যাটেজিক্যালি সমস্যা হয়। আমরা যদি হাত দিই, তবে হাত দেবই। হাত আমরা তুলে নেব না। দুর্নীতি দমনে দুদকের কৌশলের কথা জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, একটি কৌশলে দুর্নীতি একেবারে কমে যাবেÑ তা মনে করার কোনো কারণ নেই। আমরা হয়ত কিছু এগিয়ে নিয়ে যাব, পরের কমিশন আরও কিছু এগিয়ে নিয়ে যাবে। সময় প্রয়োজন সে জন্য। আপনারা হতাশ হবেন না। কাক্সিক্ষত মাত্রায় যেতে পারি নাই, সেটা আমাদের স্বীকার করতে হবে। কাক্সিক্ষত মাত্রায় যাওয়ার জন্য সময় দিতে হবে। তিনি বলেন, আপনারা দেখবেন, কত লোক জালে আটকা পড়ে গেছে। আমরা মাঠ প্রস্তুত করছি। ইকবাল মাহমুদের ভাষায়, দুর্নীতি দমন কমিশন সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, সরকারের লেজুড়বৃত্তি করার জন্য দুদক গঠিত হয়নি। এ প্রতিষ্ঠান জনগণের প্রতিষ্ঠান। ‘দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিক এবং চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘কারিগর’-এর উদ্যোক্তা তানিয়া ওয়াহাব বক্তব্য রাখেন। সারাদেশে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য, স্বজন, ইয়েস, ইয়েস ফ্রেন্ডস, ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়েস এবং ওয়াইপ্যাক সদস্যদের নিয়ে এ জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করে টিআইবি। এর আগে দিনব্যাপী এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজউদ্দিন খান। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান শপথবাক্য পাঠ করান। : এছাড়া দুপুরে অপর এক অনুষ্ঠানে বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মিশন প্রধান ডাইসাকু কিহারার নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বেলা ১২টায় দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে এসে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সঙ্গে দুর্নীতি, সুশাসন ও আর্থিক খাতের বিভিন্ন সংস্কারমূলক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় দুদক চেয়ারম্যান বলেন, দুর্নীতি দমন ও সুশাসনে আমাদের দেশ এগোচ্ছে। আইএমএফ প্রতিনিধিদের প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ২০১৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়েরকৃত ৮টি মানিলন্ডারিং মামলা বিচারিক আদালতে রায় হয়েছে। প্রতিটি মামলায়ই আসামিদের সাজা হয়েছে। কোনো দল কিংবা কোনো গোষ্ঠীর চাপে কমিশন একটি মামলাও প্রত্যাহার করেনি এবং ভবিষতেও কোনো মামলা প্রত্যাহার করা হবে না। সরকারি কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে দুদক চেয়ারম্যানকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বর্তমানে বিদ্যমান বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের পারফরমেন্স মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই। তাই প্রতিটি কর্মকর্তার পারফরমেন্স মূল্যায়নের জন্য বার্ষিক কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর করা সমীচীন। তিনি বলেন, আমাদের সকলের মানসিকতার পরিবর্তনের প্রয়োজন। মানসিকতার পরিবর্তন না হলে পদ্ধতিগত সংস্কার সম্ভব নয়। আবার পদ্ধতিগত সংস্কার ছাড়া কোনো অবস্থাতেই সুশাসন নিশ্চিত করা যাবে না। দেশের সরকারি অধিকাংশ বিষয়ই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় না জানিয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, এটাই এখন নেতিবাচক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এটা বন্ধ করার চেষ্টা চলছে।