একটি দলের কারণে সংস্কার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে : সিলেটে ড. আজাদ

প্রকাশিত: ১০:১২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৫

একটি দলের কারণে সংস্কার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে : সিলেটে ড. আজাদ

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ বলেছেন, ‘বর্তমান সরকারকে জনআকাঙ্খা বাস্তবায়নের জন্য জুলাই ঘোষণা সনদের কার্যক্রম সমাপ্ত করতে হবে এবং জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দিতে হবে। জুলাই সনদ আইনি ভিত্তি না হয় তাহলে আগামী ফেব্রুয়ারীর নির্বাচন হবে ফ্যাসিবাদ আমলের ভিত্তির নির্বাচন। সংস্কারবিহীন নির্বাচন হলে এটি হবে জুলাই চেতনার পরিপন্থী নির্বাচন।’

শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টায় নগরীর রেজিস্ট্রারি মাঠে জুলাই সনদের আইনীভিত্তি, পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচনসহ ৫ দফা দাবীতে সিলেট মহানগর জামায়াতের বিক্ষোভ সমাবেশের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘এ বছরের ৫ আগস্ট বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সরকার জুলাই ঘোষণা পত্র দিয়েছে। সরকার সেই ঘোষণা পত্রে জুলাই স্পিড ধারণ করার পরিবর্তে বিশেষ জাতি-গোষ্টির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। সেই ঘোষণা পত্রে শাপলা চত্বরের গণহত্যার কোনো উল্লেখ নেই, পিলখানায় সেনা হত্যার কথা উল্লেখ নেই, শেখ হাসিনার আমলের গুম-খুন ও জুডিসিয়ালের কথা উল্লেখ নেই। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ওয়াদা করেছিল জুলাই সনদ হবে ঐক্যমতের ভিত্তিতে। ৮৪টি বিষয়ে ঐক্যমত হয়েছে কিন্তু কিছু কিছু বিষয়ে দুই-একটি দল হস্তক্ষেপ করেছে। এই সরকারের ভূমিকা আমরা নিরপেক্ষ দেখিনি।’
সংস্কার কমিশনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকার যেই প্রতিশ্রুতি দেশবাসীকে দিয়েছিল জুলাই চেতনার ভিত্তিতে এবং যে জনআকাঙ্খা তৈরি হয়েছে সেই আকাঙ্খা হচ্ছে বাংলাদেশকে আমরা সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, ফ্যাসিবাদের আমলে যা ঘটেছে তা বর্তমান সরকারের শাষনামলে কোনো কোনো দল নিজের দলের লোকদের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। বিভিন্ন বাজার-হাট দখল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসীতে লিপ্ত হয়েছে। সেই জায়গা থেকে বর্তমান সরকার তার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের শুরুতে প্রথমে ১১টি কমিশন, পরে ৬টি নিয়ে ঐক্যমত কমিশন করেছেন। দীর্ঘ তিন মাস পর এখনও সংস্কারের জন্য বৈঠকের পর বৈঠক হচ্ছে কিন্তু বিশেষ একটি দলের হস্তক্ষেপে সংস্কার বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।’
আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যারা জুলাই চেতনাকে স্বীকার না করে সংস্কারে বাধা প্রদান করতে চায় তারাই প্রকৃতভাবে নির্বাচন বানচাল করতে চায়। দুই একটি দল পিআর পদ্ধতি মানেন না, সংস্কার পদ্ধতিও মানেন না এবং আইনি ভিত্তিও তারা চান না তাহলে ফেব্রুয়ারীর নির্বাচন কিসের ভিত্তিতে করবেন। সেই শেখ হাসিনা আমলের নির্বাচন, দিনের ভোট রাতে দেওয়ার নির্বাচন, ২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্ধন্ধিতার নির্বাচন, ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচন। এই নির্বাচন আর হবে না। জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সেই অপশাসনের কবর রচিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদ বাংলাদেশ থেকে উৎখাত হয়েছে। সেই বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ আমলের নির্বাচন আর হবে না। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন চান, তাহলে সংস্কারকৃত আইনের ভিত্তিতে নির্বাচন দেন। পুরনো পদ্ধতির নির্বাচন বাতিল করেন। বাংলাদেশেও পিআর পদ্ধতির নির্বাচন করতে হবে।

হামিদুর রহমান আজাদ আরও বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামের সরকারের মাধ্যমে আমরা রাষ্ট্রকে নতুন পথ দেখাবো। বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাবে। এই আন্দোলন সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন তাদের হত্যাকারীদের বিচার করা হবে। দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে যারা ধ্বংস করে দিয়েছে সেই দুর্নীতিবাজদের বিচার করা হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে বাংলাদেশে আমরা ইতিহাসের সেরা নির্বাচন উপহার দেব। দেশের মানুষ উৎসবমূখর পরিবেশে ভোট দান করবে। আগামী ফেব্রুয়ারীতে জাতীয় নির্বাচনে মানুষ উৎসব পালন করবে। আগামী নির্বাচন উপলক্ষে সরকার সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, বিচার কার্যক্রমসহ নির্বাচনী টাইমলাইন ঘোষণা করেছে।’
তিনি বলেন, নির্বাচন বানচাল আমরা করতে চাই না, যারা সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করছে আর পিআর চায় না তারাই প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন বানচাল করতে চায়। পিআর পদ্ধতি নিয়ে সমাধান আলোচনার টেবিলে না হলে গণভোটের ব্যবস্থার কথাও জানান তিনি।
হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, ফ্যাসিবাদের শাসনামলে যা ঘটেছে বর্তমান শাসমানলে সরকার না করলেও কোনো কোনো দল চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসে লিপ্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকার কঠোর হস্তে দমনের কথা থাকলেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে দিতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে, মহানগর নায়েবে আমীর ড. নূরুল ইসলাম বাবুল ও সেক্রেটারী মোহাম্মদ শাহজাহান আলীর যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য, সিলেট জেলা আমীর ও সিলেট-১ আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান।

সমাবেশ শেষে রেজিস্ট্রারি মাঠ থেকে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি রেজিস্ট্রারি মাঠ থেকে শুরু হয়ে নগরীর প্রধান প্রধান পয়েন্ট প্রদক্ষিণ শেষে আম্বরখানা পয়েন্টে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়। মিছিলে মহানগর ও বিভিন্ন থানা-ওয়ার্ড-ইউনিটের হাজার হাজার নেতাকর্মী খন্ড খন্ড মিছিল সহকারে অংশ নেন।
মিছিল পূর্ব রেজিস্ট্রারি মাঠের বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন- সিলেট জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী, সাবেক জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও সিলেট-৪ আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী জয়নাল আবেদীন, মহানগর সহকারী সেক্রেটারী জাহেদুর রহমান চৌধুরী, মাওলানা ইসলাম উদ্দিন, সাবেক দক্ষিণ সুরমা উপজেলা চেয়ারম্যান ও সিলেট-৩ আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী মাওলানা লোকমান আহমদ, জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী মাওলানা মাসুক আহমদ, বিশ^নাথ উপজেলা আমীর নিজাম উদ্দিন সিদ্দিকী, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন সিলেট মহানগর সভাপতি এডভোকেট জামিল আহমদ রাজু, বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিল সিলেটের সভাপতি এডভোকেট আলিম উদ্দিন ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেট মহানগর সভাপতি শাহীন আহমেদ প্রমূখ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য, সিলেট জেলা আমীর ও সিলেট-১ আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্খা বাস্তবায়নে জুলাই সনদের আইনী ভিত্তি ও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনসহ জামায়াত ঘোষিত ৫ দফা দাবি পূরণের বিকল্প নেই। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের মাধ্যমে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পতন হয়েছে। নতুন করে আর কাউকে ফ্যাসিবাদী হওয়ার সুযোগ দেয়া হবেনা।
সভাপতির বক্তব্যে সিলেট মহানগর আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আশা-আকাঙ্খার প্রকৃত বাস্তবায়নের স্বার্থে জুলাই সনদের আইনী ভিত্তি প্রদান শুধু জামায়াত নয়, দেশপ্রেমিক ছাত্র-জনতার দাবী। অন্তর্র্বতী কালিন সরকারকে ছাত্র-জনতার আশা আকাঙ্খা বাস্তবায়নে জুলাই সনদের আইনী ভিত্তি, পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের সকল গণহত্যার বিচার, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনসহ জামায়াত ঘোষিত ৫ দফা দাবী মেনেই জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। অন্যথায় জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের রক্তের সাথে কোন উপহাস ছাত্র-জনতা মেনে নিবেনা।
উল্লেখ্য, জামায়াত ঘোষিত ৫ দফা দাবিগুলো হলো- জামায়াতের ৫ দফা দাবিগুলো হলো-১. জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে;২. আগামী জাতীয় নির্বাচনে সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু করতে হবে;৩. অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে;৪. ফ্যাসিস্ট সরকারের সব জুলুম ও গণহত্যা, দুর্নীতির বিচার দৃশ্যমান করতে হবে;৫. স্বৈরাচারের দোসর জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে।


সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট