সিলেটের তিন উপজেলায় পানি কমছে, এখনো পানিবন্দি হাজারো মানুষ

প্রকাশিত: ১:৪২ অপরাহ্ণ, জুন ১, ২০২৪

সিলেটের তিন উপজেলায় পানি কমছে, এখনো পানিবন্দি হাজারো মানুষ

টানা তিনদিন প্লাবিত থাকার পর শুক্রবার বিকেল থেকে সিলেটের বন্যা কবলিত গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পানি কমতে শুরু করেছে। পানি যত কমছে, ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ততই ভেসে উঠছে। নষ্ট হয়ে গেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ নথি, যানবাহন, দোকানের মালামাল; ভেঙে গেছে সড়ক, ভেসে গেছে মাছের ঘের।

গত মঙ্গলবার থেকে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যায় এই তিন উপজেলার প্রায় ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। এছাড়া উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিন উপজেলার গ্রামীণ রাস্তা সহ উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ রক্ষাকারী প্রধান প্রধান সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা সদর হতে জেলা সদরে যাতায়াতের ৩টি রাস্তার বেশ কয়েকটি স্থান পানিতে নিমজ্জিত থাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

পাউবো তথ্যমতে, উপজেলার প্রায় ১৬৬০ হেক্টর কৃষি জমি পানিতে নিমজ্জিত। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ৬৩ মেট্রিকটন জিআর চাল, ২০০০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ১৫ কেজি ওজনের ২০০শতটি বিশেষ প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে।

এছাড়াও এই উপজেলায় বন্যাদুর্ত মানুষের পরিস্থিতি মোকাবেলায় ১০০ মেঃটন জি.আর চাল ও ৫,০০০ প্যাকেট শুকনো খাবার ১০ লক্ষ টাকা জি.আর ক্যাশ, শিশু খাদ্য ক্রয়ের নিমিত্ত ৫ লক্ষ টাকা এবং গো-খাদ্য ক্রয়ের নিমিত্ত ৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট চাহিদা চেয়ে পত্র দিয়েছেন গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলাম।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সিলেট জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম, উপজেলা কৃষি অফিসার রায়হান পারভেজ রনি, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জামাল খান, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শীর্ষেন্দু পুরকায়স্থ সমন্বয়ে গঠিত টিম উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়নের রাস্তাঘাট, সড়ক, ব্রীজ-কালভার্টের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি, গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণে কাজ করছেন।’

এছাড়া এলজিইডি’র উপজেলা প্রকৌশলী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের অনতিবিলম্বে নদী ও খালের পার্শ্বস্থ গুরুত্বপূর্ণ স্থানের বাঁধ, ক্ষতিগ্রস্থ রাস্তাঘাট ও ব্রীজ সমূহকে মেরামত ও সংস্কার করে যানবাহন ও জনচলাচল উপযোগী করতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ এর নির্দেশনায় ১৩ টি ইউনিয়নে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এর মাধ্যমে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।



এদিকে কানাইঘাট উপজেলায় বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। এখনও সুরমা ডাইকের ভাঙণ দিয়ে নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৩০ মে) বিকেলে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১৪৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও আজ শুক্রবার (৩১ মে) বিকেল ২টার দিকে তা কমে বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

গত বুধবার পাহাড়ি ঢলে সুরমা নদীর বিভিন্ন এলাকায় ডাইক ভেঙে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিলে পৌর শহর সহ উপজেলার বেশিরভাগ এলাকার রাস্তা-ঘাট, শিক্ষা, প্রতিষ্ঠান, হাজারো বাড়ি-ঘর বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার রাত থেকে সুরমা ও লোভা নদীর পানি কমতে শুরু করলে পৌর শহর সহ আশপাশ এলাকা বন্যা পরিস্থিতি অনেকটা উন্নতি হলেও প্রত্যন্ত এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

তবে এখনও প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছেন। যেসব এলাকার উচুঁ স্থান ও ঘর-বাড়ি থেকে পানি কমে গেলেও জলাবদ্ধতার কা্রণে বানের কাদা পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এখনও শত শত মানুষ গবাদি পশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বন্যা কবলিত বাড়ি-ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র সহ উঁচু এলাকায় অবস্থান করছেন। এদিকে পানি কমার সাথে সাথে কাঁচা ঘর-বাড়ি ভেঙে পড়ছে এবং পানিবাহিত রোগ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতি দেখা দেয়ার পূর্বেই সুরমা নদীর ভাঙন কবলিত ডাইকগুলো দ্রুত মেরামত করার জন্য সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী গত বৃহস্পতিবার বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। এছাড়াও তিনি আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানরত বানবাসী মানুষের খোঁজ-খবর নেন এবং শুকনা খাবার বিতরণ করেন।

অপরদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা নাসরিন, থানার অফিসার ইনচার্জ জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার বন্যা দেখা দেয়ার পর থেকে বন্যা কবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে বানবাসী মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ সহ খোঁজ-খবর নিচ্ছেন।

অপরদিকে কোম্পানীগঞ্জে বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও এখনো ধলাই নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ।

শুক্রবার বিকেল থেকে উপজেলার কিছু কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করেছে। পানি কমার সাথে সাথে মানুষের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভেসে উঠছে। তবে গত কয়েক দিন পাহাড়ি ঢলের পানি যেভাবে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে সে অনুপাতে পানি কমার চিত্র নগণ্য।

কাঁঠালবাড়ি শিমুলতলা গুচ্ছগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, অনেক বাড়ি ঘরে এক থেকে দেড় ফুট পানি রয়েছে। পানিবন্দি মানুষজন খাটের উপরে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর দিনযাপন করলেও আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন না।

গুচ্ছগ্রামের ফারুক ইসলামের ঘরে গিয়ে দেখা যায়, ৪ বছর ও ৭ বছরের দু’টি সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে একটি খাটের উপর কোন রকম বসে আছেন। খাটের এক কোনায় মাটির চুলাতে রান্না বসিয়েছেন ফারুক ইসলামের স্ত্রী। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাতে ঘরের বারান্দায় পানি ছিল। রাত ১২টার পর ধীরে ধীরে ঘরে মধ্যে পানি প্রবেশ করে। তারপর থেকে কয়েকবার পানি কমেছে ও বেড়েছে। তবে সরকারি কোন সহায়তা পৌঁছায়নি এ গ্রামে। শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত তাদের ঘরে দেড় ফুট পানি ছিল।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুনজিত কুমার চন্দ জানান, কোম্পানীগঞ্জ পাহাড়ি ঢলের পানি শুক্রবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত বিপদ সীমার ১.২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বন্যা কবলিত এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। পরিস্থিতি খারাপ হলে বন্যা কবলিত মানুষকে উদ্ধার ও সার্বিক সহযোগিতা করার জন্য স্বেচ্ছাসেবক টিম সহ উপজেলা প্রশাসনের একাধিক টিম প্রস্তুত রয়েছে।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট