সিলেটের ৭ উপজেলায় বন্যা, সাড়ে ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি

প্রকাশিত: ৬:৩৯ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২৪

সিলেটের ৭ উপজেলায় বন্যা, সাড়ে ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি

টানা বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেম আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় সিলেটের ১৩ উপজেলার মধ্যে ৭টিই আক্রান্ত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ৫ লাখ ৩৩ হাজার ২০২ জন মানুষ। আক্রান্ত হয়েছে ৭ উপজেলার ৪২টি ইউনিয়ন।

বন্যা মোকাবেলায় এ পর্যন্ত আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৫৪৭টি। এরই মধ্যে আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছেন ৪ হাজার ৮০২ জন।

শুক্রবার (৩১ মে) সিলেটের জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যাকবলিত উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে, জকিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও কানাইঘাট।

এর মধ্য কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ৯৩ হাজার, কানাইঘাটে ৮০ হাজার ৬০০ জন, জৈন্তাপুর উপজেলায় ৬৫ হাজার, জকিগঞ্জে ৩৯ হাজার ৮৫২ জন এবং গোয়াইনঘাটে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৫০ জন কন্যাকবলিত হয়েছেন। এ ছাড়া সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায় ৫ হাজার ৫০০ জন এবং গোলপগঞ্জ উপজেলায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন।

বন্যা আক্রান্ত উপজেলার মধ্যে ৭ উপজেলার ৪২টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৩ টি ইউনিয়ন আক্রান্ত হয়েছে গোয়াইনঘাট উপজেলায়। এ উপজেলায় ৫৬টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে ২ হাজার ৩৫৬ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

এ ছাড়া কানাইঘাট উপজেলায় ৯টি ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার ৩১টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১ হাজার ৪৬৬ জন আশ্রয় নিয়েছেন। জকিগঞ্জের বন্যা কবলিত ৮টি ইউনিয়নের জন্য ৫৫টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।এতে আশ্রয় নিয়েছেন ৯৫ জন। জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জের তিনটি করে ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে জৈন্তাপুরে ৪৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৬৭৫ জন এবং কোম্পানীগঞ্জের ৩৫টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১৩৫ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। বিয়ানীবাজারে ৫টি ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় একটি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়েছে। এসব উপজেলায় ৬৭টি ও ৫৭টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তার মধ্যে বিয়ানীবাজারে ৬০ জন এবং গোলাপগঞ্জে ১৫ জন আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন।

সিলেটের জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান বলেন, ‘বন্যা পরিস্থিতি আপাতত কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবে আমরা সার্বিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি। বন্যাকবলিতদের উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হচ্ছে এবং বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ চলছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে ইউনিয়নভিত্তিক মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার এবং বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হচ্ছে।‘

বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা হ্রাস বৃদ্ধি করা হবে বলে জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান।

এদিকে বিয়ানীবাজার উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আকস্মিক অবনতি হয়েছে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর ডাইক ভেঙ্গে একাধিক স্থান দিয়ে পানি প্রবেশ করছে। উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। বুধবার থেকে এসব এলাকায় বাড়তে শুরু করে পানি। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। অনেকের ঘর-বাড়ি তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে গবাদি পশু ও পুকুর-খামারের মাছ। উপজেলার আলীনগর, চারখাই, দুবাগ, শেওলা ও কুড়ারবাজার ইউনিয়নের বেশীরভাগ এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করেছে।

সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মোহাম্মদ সজিব হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সিলেটে প্রায় ৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেট কার্যালয়ের তথ্য মতে, শুক্রবার (৩১ মে) সকাল ৬টায় সিলেটের কানাইঘাট পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ৯৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জকিগঞ্জ উপজেলার কুশিয়ারা নদীর পানি অমলসিদ পয়েন্টে বিপৎসীমার ২০৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া, সারি নদীর পানি গোয়াইনঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় সুরমা নদী কানাইঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে কুশিয়ারা নদীর পানি জকিগঞ্জের অমলসিদ পয়েন্টে বিপদসীমার ২১৩ সেন্টিমিটার এবং শেওলা পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া, সারি নদীর পানি গোয়াইনঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

ইতিমধ্যে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিলেট জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও দুর্গত মানুষের খোঁজ নিতে জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান উপজেলাগুলোতে পরিদর্শন করেছেন। সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা যায়, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার ৫টি উপজেলার মানুষের জন্য ২০০ বস্তা করে মোট ১ হাজার বস্তা শুকনো খাবার, ১৫ মেট্রিক টন করে ৭৫ মেট্রিক টন চাল, ৫০ হাজার টাকা করে আড়াই লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্লাবিত এলাকা ছাড়াও আশপাশের উপজেলাগুলোকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।



এদিকে সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ছড়ার পানি উপচে সিলেট নগরীতে প্রবেশ করছে পানি। শুক্রবার (৩১ মে) সকালে নগরীর তালতলাস্থ সিলেটের ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স কার্যালয় ও তোপখানা এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে। এরপরই ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অন্যত্র সরিয়ে নেন।

সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বলেন- সুরমা নদীতে পানি বেড়েছে এবং সকালে আমরা গিয়ে দেখলাম- পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে নগরের কাজিরবাজারসহ যেসব ড্রেন সুরমায় পড়েছে সেসব ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশনের বদলে উল্টো পানি ঢুকছে। এর জন্য কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে যদি আজ দিনের বেলা বৃষ্টি না হয় তবে সে পানি নেমে যাবে। তিনি বলেন- সকল পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে সিটি করপোরেশন।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো.তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বন্যায় উপজেলার ৭৫ ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পূর্বাভাস থাকায় আমরা আগেই ৫৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করে রেখেছিলাম। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে শালিক রুমাইয়া জানান, উপজেলার ৩০ ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ৪৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় ৭০০ লোক আশ্রয় নিয়েছে।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুনজিত কুমার চন্দ বলেন, ৩৫টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। এখনো কোনো লোক আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেনি। তারা তাদের আত্মীয় স্বজনদের বাসা-বাড়িতে উঠেছেন। উপজেলার ১৪৮টি গ্রামের মধ্যে ৭৫টি গ্রাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। মানুষ আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।

জকিগঞ্জ উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফসানা তাসনিম জানান, উপজেলার অবস্থা খুবই খারাপ। পানি হু-হু করে প্রবেশ করছে। অন্ততপক্ষে অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ৫৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছে ১০-১২টি পরিবার।

কানাইঘাট উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা নাসরীন জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে পানি কিছুটা কমেছে। আমাদের ১৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৬টি কেন্দ্রে মানুষ উঠেছে। প্রায় ১২০০-১৫০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

গোলাপগঞ্জ উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন জানান, আমাদের এখানে দুটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের কয়েকটি গ্রাম কিছুটা প্লাবিত হয়েছে। ৫৭টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি পরিবারকে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে।

বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী শামীম জানান, সরকারি হিসেবে এখনো পর্যন্ত ৫ হাজার ৫শ’ লোক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। দূর্গত মানুষের সহায়তার জন্য ত্রাণ সামগ্রীর চাহিদা চেয়ে পাঠানো হয়েছে। উপজেলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, দুবাগ ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় বন্যার পানির ভয়াবহতা বেশী। ইউনিয়নের একাধিক স্কুলে পানি প্রবেশ করেছে। বিজিবি ক্যাম্প, হাট-বাজার ঝূকির মুখে।

এদিকে সিলেটে বন্যার্তদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য ১৩১টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মনিসর চৌধুরী।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট