২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ৩, ২০২৪
রোববার মধ্যরাত থেকে টানা ৬/৭ ঘন্টার অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে সুরমা নদীর পানি উপচে সিলেট নগরীতে প্রবেশ করেছে পানি। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরীর বেশকিছু এলাকার বাসিন্দারা। পানি প্রবেশ করেছে ওসমানী হাসপাতালেও। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগি ও চিকিৎসকরা।
রোববার (২ জুন) দিবাগত রাতে সিলেট নগরীর উপশহর, যতরপুর, মেন্দিবাগ, জামতলা, তালতলা, শেখঘাট, কলাপাড়া, মজুমদার পাড়া, লালদীঘিরপাড়, তোপখানা, কাজির বাজার, তেররতন, সোবহানীঘাটসহ অনেক এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
হঠাৎ মধ্যরাতে বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরের বাসিন্দারা। শহরাঞ্চলে এমনিতেই জরাজীর্ণ পরিবেশে বেশিরভাগ মানুষের বসবাস তার ওপর এই বন্যা তাদের মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।
সিলেট নগরীতে বন্যার পানিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়া ও নির্ঘুম রাত কাটানো নিয়ে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র ও সিলেটের স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি দাবি জানিয়েছেন যেন সিলেটের সুরমা নদী এবং নদীর পাশের ছড়া ও খাল খনন করে দেওয়া হয়।
নগরীর লালাদিঘির পার এলাকার মামুন আহমদ বলেন, এমনিতেই ভারত থেকে নেমে আসা উজানি ঢলে সিলেটের বেশ কয়েকটি উপজেলায় অবস্থা ভয়াবহ। এরমধ্যে সুরমা নদীর পানি টইটুম্বুর করছে কয়েকদিন থেকে। আজ টানা বৃষ্টিতে আমাদের ঘরে পানি উঠেছে।
নগরের জামতলা এলাকার বাসিন্দা অনুপ চক্রবর্তী জানান, বাসায় হাঁটুপানি। আসবাবপত্রসহ অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র পানিতে তলিয়ে গেছে। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার পর যদি নদী খনন করা হতো তাহলে আমাদের মতো বাসিন্দাদের এই দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।
নগরীর মিরের ময়দান পায়রা এলাকার বাসিন্দা মো. আজমল আলী তার ফেসবুক আইডিতে মেয়র ও এমপিকে উদ্দেশ্য করে লিখেন, ‘নগরবাসীর দাবি একটাই, সুরমা নদী খনন চাই। সুরমা নদী খনন করুন, বন্যা থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করুন।’
মডেল আশফাক রানা লিখেন, ‘এই মুহূর্তে সিলেট শহরের অবস্থা খুবই নাজেহাল ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বৃষ্টি না থামলে ২০২২ সালের মতো আবার বন্যা দেখা দিতে পারে।’
এডভোকেট দেবব্রত চৌধুরী লিটন লিখেন, ‘আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় নির্ঘুম রাত কাটছে সিলেটবাসীর। প্রথমে রাত ১ টায়, পরে ৩ টা ৫০-দুইবার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে সবকিছু, পানি বাড়ছেই।’
নগরীর তালতলার বাসিন্দা রজত কান্তি গুপ্ত বলেন, ‘২০২২ সালের পরে ঘরে আবারও পানি ঢুকল। পরিবার নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছি। বন্যার আগে যদি নদী, ছড়া, খাল, বিল খনন করা হত তাহলে নগরীতে পানি ঢুকত না।’
রোববার (২ জুন) বিকেলে সিলেট নগরীর বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়টি জানান পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ। তার বরাত দিয়ে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, রোববার বিকেল তিনটা পর্যন্ত সিলেট নগরী সংলগ্ন সুরমা নদীর পানি বিপদসীমা থেকে ১ সে.মি. নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কিন্তু রাতের এই অতি বৃষ্টিতে নতুন করে বন্যার শঙ্কা উকি দিচ্ছে।
রোববার রাত ১১টার দিকে সিলেটে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। টানা ৬/৭ ঘণ্টা বৃষ্টিপাতের কারণে নিদ্রাহীন রাত কাটে সিলেটবাসীর। বিশেষ করে বন্যা-প্লাবিত উপজেলাগুলো ও নগরীর নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের। টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সিলেটের ৮টি উপজেলায় পানি বাড়ার পাশাপাশি সিলেট নগরীতে নতুন নতুন এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। রাস্তাঘাট উপচে পানি ঢুকে পড়েছে বাসা-বাড়িতে।
এর আগে রোববার সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। বেশ কিছু স্থানে কমে এসেছিল পানি। কিন্তু রাতে অতিবৃষ্টিতে ফের নগরীতে পানি বেড়েছে।
এদিকে টানা ৬/৭ ঘন্টার অতিবৃষ্টিতে সিলেটের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঢুকে পড়েছে পানি। পানি ঢুকেছে হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগসহ কয়েকটি ওয়ার্ডে। এতে বিঘ্নিত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। ফলে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ রোগীরা এবং চিকিৎসা দিতে আসা চিকিৎসক ও কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
সোমবার (৩ জুন) ভোর থেকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকসহ আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এতে হাসপাতাল ভবনের নিচতলার প্রায় প্রতিটি কক্ষে পানিতে নিমজ্জিত হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া।
ওসমানী হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের নিচতলায় প্রশাসনিক ভবন, ২৬, ২৭ ও ৩১ নং ওয়ার্ডে পানিতে প্লাবিত হয়েছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী, আত্মীয় স্বজন ও চিকিৎসকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিভিন্ন কক্ষে পানি প্রবেশ করার ফলে অনেক মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সেবা নিতে আসা রোগীর স্বজনরা জানান, ভোর থেকে হাসপাতালে পানি প্রবেশ করেছে। মেঝেতে যারা চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তড়িঘড়ি করে তাদেরকে একজনের বিছানায় দুই রোগীকে জায়গা দেয়া হয়। তাছাড়া ওয়ার্ডে ময়লা-আবর্জনাযুক্ত পানি প্রবেশ করার ফলে চিকিৎসা নিতে এসে উল্টো বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
ওসমানী মেডিকেল কলেজ সূত্রে জানা যায়, ওসমানী মেডিকেল কলেজের উত্তরপাশ ঘেঁষে প্রবাহিত ছড়ার আশ-পাশে বিভিন্ন ভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়েছে। এ কারণে ছড়া দিয়ে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক বাসিন্দা পানির প্রবাহ ওসমানী মেডিকেলের একমাত্র ড্রেনের সাথে সংযুক্ত করেছেন। ফলে ড্রেন উপচে বৃষ্টির পানি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বৈদ্যুতিক উপ কেন্দ্রে প্রবেশ করে। এছাড়া প্যাথলজি বিভাগ, ২৬, ২৭ ও ৩১ নং ওয়ার্ডে হাঁটু সমান পানি রয়েছে।
এব্যাপারে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের নিচতলা পুরোটাতেই পানি ঢুকেছে। ২০২২ সালের বন্যার সময়ও পানি ঢুকে যায়। সংশ্লিষ্টদের বারবার জানানো হলেও কোনো ধরনের ব্যবস্থা না নেয়ায় অতিবৃষ্টি হলেই পানিতে প্লাবিত হয়েছে যায়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সিলেটের আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজীব আহমদ জানিয়েছেন, রোববার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সিলেটে ২২৬ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এরপর সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত আরো ২৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, উজানে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে গত ২৯ মে থেকে সিলেটের গোয়াইঘাট, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ, জকিগঞ্জ ছাড়াও বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ ও সিলেট সদর উপজেলার ছয় লাখ ৪৩ হাজার ৪৭০ জন মানুষ বন্যা আক্রান্ত হন। দুর্গত এলাকাগুলোতে ৫৪৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে তিন হাজার ৭৩৯ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
এদিকে, সিলেট মহানগরীতেও দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে শতাধিক পরিবার অবস্থান করছে বলে জানান, সিলেট সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা সাজলু লস্কর। তিনি বলেন- তাদের জন্য খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। তাছাড়া বন্যা পরিস্থিতি অবনতির বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে ।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D