মুমিনদের সফলতা কোন পথে

প্রকাশিত: ৪:৩৫ অপরাহ্ণ, জুন ২, ২০২৬

মুমিনদের সফলতা কোন পথে

মোঃ শামসুল আলম


মানবজীবন এক অনন্ত সফর। রুহের জগৎ থেকে এর পরিভ্রমণের সূচনা, দুনিয়া তার কর্মক্ষেত্র, বারজাখ (কবরজীবন) হলো অন্তর্বর্তী সময় এবং আখিরাত হলো এর ফল লাভের ও উপভোগের স্থান। মানুষ দুনিয়ার সফলতার জন্য কত কিই না করে। অথচ সবাই জানে যে দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়, মানুষও চিরকাল পৃথিবীতে থাকে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোরআনে কারিমে বলেন-

“যে ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পেরেছে, সেই-ই সফলকাম।” (সুরা শামস, আয়াত: ৯)
এখানে পরিশুদ্ধতা বলতে শুধু পাপ থেকে দূরে থাকা বোঝায় না; বরং নিজের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ, ইচ্ছা—সবকিছুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে পরিচালিত করাই প্রকৃত পরিশুদ্ধতা।

অর্থাৎ মানুষের ব্যক্তিত্ব কেবল তার বাহ্যিক রূপ বা সামাজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করা যায় না; তার অন্তরের অবস্থা, তার নৈতিকতা, তার আচরণ—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে তার প্রকৃত পরিচয়।

পার্থিব জীবনে সফলতা চায় না এমন মানুষ হয়ত কেউ নেই কিংবা অতি নগণ্য। নিজস্ব পরিমণ্ডলে প্রত্যেকে সফলতা চায়। দুনিয়ার এই ক্ষুদ্র জীবনে সফল হওয়ার আশায় সবাই ব্যতিব্যস্ত। বহু ত্যাগ ও সাধনার পর কেউ-বা লাভ করে কাঙ্ক্ষিত সফলতা। আবার কারো নিয়তি বরণ করে নেয় শুধুই ব্যর্থতা।

জীবনের সার্থকতা পুরোটাই নিহিত স্রষ্টার আনুগত্যে। এ সত্যটা যেন আমাদের উপলব্ধির বাইরে। সকল আমিত্ব ও অহমিকার মূলোৎপাটন করে অন্যায় অবিচার ও পাপ-পঙ্কিলতা পরিহার করে আত্মশুদ্ধি অর্জনকারী ব্যক্তি কেবল দুই জাহানে সফলকাম। এর স্বীকৃতি পবিত্র কোরআনে বিবৃত হয়েছে এভাবে-

“যে আত্মশুদ্ধি অর্জন করেছে সে অবশ্যই সফল হয়েছে”। (সুরা আ’লা: ১৪)

যাবতীয় পাপাচার ও অশ্লীলতা ছেড়ে নিজেকে শুদ্ধ করে নেয়ার মাঝেই রয়েছে বাস্তব সফলতা ও হৃদয়ের প্রশান্তি।

মানুষের জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তার ভেতরে যেমন ভালো আছে, তেমনি মন্দও আছে। এই ভালো-মন্দের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই তাকে তার চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। আর একজন প্রকৃত মুমিনের জন্য সেই লক্ষ্য একটি—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জান্নাত লাভ করা।

কারণ, দুনিয়ার সবকিছু ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু পারকালের জীবন চিরস্থায়ী। কোরআনে বারবার বলা হয়েছে, আখেরাতের জীবনই প্রকৃত জীবন। (সুরা আসকাবুত, আয়াত: ৬৪)

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং জান্নাত লাভ—এই দুটি বিষয় আলাদা হলেও পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।

কেউ যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পারে, তাহলে জান্নাত তার জন্য নিশ্চিত। আবার জান্নাত লাভের একমাত্র পথও হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তাই একজন মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে।

কোরআনে এমন মানুষের কথা বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের সবকিছু উৎসর্গ করে দেয়। তারা তাদের জীবন, সম্পদ—সব আল্লাহর পথে ব্যয় করতে প্রস্তুত থাকে।

আল্লাহ–তাআলা এই ধরনের বান্দাদের সঙ্গে যেন এক ধরনের ‘লেনদেন’ করেছেন—তাদের জীবন ও সম্পদের বিনিময়ে তিনি তাদের জন্য জান্নাত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি একজন মুমিনকে দুনিয়ার প্রতি আসক্তি থেকে মুক্ত করে এবং তাকে একটি উচ্চতর উদ্দেশ্যের দিকে পরিচালিত করে।

অন্যদিকে, যারা এই সত্যকে উপেক্ষা করে কেবল দুনিয়ার জীবনকে তাদের সবকিছু মনে করে, তারা প্রকৃতপক্ষে একটি বড় বিভ্রান্তির মধ্যে থাকে। দুনিয়ার জীবন বাহ্যিকভাবে যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, তা আসলে ক্ষণস্থায়ী, প্রতারণাময়।

মানুষ এই দুনিয়ায় যা যা অর্জন করে—ধন, সম্পদ, সম্মান—মৃত্যুর পর সেগুলোর কোনো মূল্য থাকে না। তখন শুধু তার আমলই তার সঙ্গে থাকবে।

আখেরাতের বাস্তবতা খুবই কঠিন। সেখানে হয় আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি থাকবে, নয়তো ভয়াবহ শাস্তি। জাহান্নামের শাস্তির কথা কোরআনে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা মানুষের হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়। কেউ যদি এই শাস্তির কথা সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করতে পারে, তাহলে সে কখনোই নিজের ইচ্ছায় সেই পথে হাঁটতে চাইবে না।

কিন্তু সমস্যা হলো, মানুষ দুনিয়ার মোহে পড়ে এই সত্যকে ভুলে যায়। এই কারণেই কোরআন মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছে, দুনিয়ার জীবন আসলে একটি ধোঁকার সামগ্রী। (সুরা হাদিদ, আয়াত: ২০)

এই পৃথিবীতে মানুষ যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন, তার উচিত মাঝে মাঝে থেমে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে চিন্তা করা। সে কোথায় যাচ্ছে, তার লক্ষ্য কী, সে কী অর্জন করতে চায়—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা।

কারণ, যে ব্যক্তি তার লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট নয়, সে কখনোই সঠিক পথে এগোতে পারে না।

মানুষের জীবনের প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী অর্জনে নয়; বরং তার অন্তরের পরিশুদ্ধতা, তার নৈতিক উন্নয়ন এবং তার লক্ষ্য সঠিকভাবে নির্ধারণের মধ্যেই নিহিত। যে ব্যক্তি এই সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে এবং তার জীবনকে সেই অনুযায়ী গড়ে তোলে, সে-ই দুনিয়া ও আখেরাত—উভয় জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারে।

সবশেষে, কোরআন একটি চূড়ান্ত সত্য আমাদের সামনে তুলে ধরে, কেয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষ তার পূর্ণ প্রতিদান পাবে। তখন যার আমল তাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করাবে, সেই-ই হবে প্রকৃত সফলকাম। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫)

এই সফলতা দুনিয়ার কোনো সফলতার সঙ্গে তুলনীয় নয়; এটি চিরস্থায়ী, পরিপূর্ণ এবং পরম শান্তির উৎস।