৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:২৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৫
জাতীয় ন্যূনতম মূল মজুরি ৩০ হাজার টাকা ঘোষণা, গণতান্ত্রিক শ্রমআইন প্রণয়ন ও অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সর্বস্তরে রেশনিং চালুসহ ১০ দফা দাবিতে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রত্যয়ে ৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টা হতে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির ৩ নং বার লাইব্রেরী হলে দিনব্যাপী বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি সুখেন্দু তালুকদার মিন্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় প্রতিনিধি সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাস ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্রমিকনেতা রফিকুল ইসলাম।
ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ কেন্দ্রীয় সদস্য ও সিলেট জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. ছাদেক মিয়ার পরিচালনায় অনুষ্ঠিত প্রতিনিধি সভায় ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ সিলেট বিভাগে অন্তর্ভুক্ত ২০ টিরও বেশি রেজিষ্ট্রার্ড বেসিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সেক্টরের শতাধিক প্রতিনিধি এতে অংশগ্রহণ করেন।
প্রতিনিধি সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) সিলেট জেলা কমিটির সহ-সভাপতি অধ্যাপক আবুল ফজল ও জাতীয় ছাত্রদল সিলেট জেলা কমিটির আহবায়ক শুভ আজাদ (শান্ত)।
অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ সিলেট জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কালাম আজাদ ও সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম ছদরুল, বাংলাদেশ স’মিল শ্রমিক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি আইয়ুবুর রহমান, মৌলভীবাজার জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের জুড়ী উপজেলা কমিটির সভাপতি আব্দুল করিম, সুনামগঞ্জ জেলা বারকি শ্রমিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক মো. ফরিদ মিয়া, চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হরিনারায়ন হাজরা, সিলেট জেলা স’মিল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন, সুনামগঞ্জ হকার্স শ্রমিক সংঘের নেতা আব্দুল হাই, নারী চা-শ্রমিকনেত্রী লক্ষী রানী বাক্তি, সিলেট জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা আনোয়ার হোসেন, সুনামগঞ্জ স’মিল শ্রমিক সংঘ সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা স’মিল শ্রমিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান, মৌলভীবাজার জেলা রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. সুহেল মিয়া, বড়লেখা উপজেলা স’মিল শ্রমিক সংঘের সাংগঠনিক সম্পাদক লাল মিয়া, সিলেট রাইস মিল শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শাহজাহান মিয়া, সুনামগঞ্জ রিকশা-ভ্যান শ্রমিক সংঘের সভাপতি আব্দুর রউফ, সিলেট জেলা প্রেস শ্রমিক ইউনিয়নের শাহিন আহমদ, চা-শ্রমিক সংঘ সিলেট জেলা কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম, মীরের চক শ্রমজীবী সংঘের আহবায়ক আলী আহমদ, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সিলেট জেলা কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক রমজান আলী পটু প্রমূখ।
প্রতিনিধি সভার শুরুতে ঢাকার নীলফামারি উত্তরা ইপিজেডের এভারগ্রিন লিমিটেডের শ্রমিকদের ন্যায়সংগত আন্দোলনে পুলিশ ও সেনাবাহিনী গুলিতে নিহত হাবিব নামে এক শ্রমিকের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও নিহত শ্রমিকের পরিবারকে এক জীবন আয়ের সমপরিমান ক্ষতিপুরণ প্রদানের দাবি জানান।
সভায় প্রধান অতিথি রজত বিশ্বাস তাঁর বক্তব্যে বলেন সমগ্র পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা দ্ব›দ্ব-সংঘাতময় এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। পুঁজি ও শক্তি অনুপাতে বাজার পুনর্বন্টনকে কেন্দ্র করে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্ব›েদ্ব মুদ্রাযুদ্ধ, বাণিজ্যযুদ্ধ, আঞ্চলিক ও স্থানিক যুদ্ধের প্রক্রিয়ায় পারমানবিক অস্ত্রের ব্যবহারসহ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। তারই অংশ হিসেবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থল সংযোগ সেতু এবং ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর সংলগ্ন ভ‚রাজনৈতিক ও রণনীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগরীয় নয়াউপনিবেশিক আধাসামন্ততান্ত্রিক বাংলাদেশকে নিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসীযুদ্ধ পরিকল্পনার সাথে সম্পর্কিত করতে জাতিসংঘের ব্যানারে মানবিক করিডোর, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টইেনার টার্মিনাল ডিপি ওয়াল্ডকে ইজারা দেওয়ার তৎপরতা, মার্কিন-বাংলাদেশের যৌথ সামরিক মহড়া, সেনা উপস্থিতি, স্টার লিংক ইন্টারনেট চালুসহ ইতাদি তৎপরতার সাথে সম্পৃক্ত করার অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সকল সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল বিরোধী গণতান্ত্রকি শক্তি ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান।
প্রধান আলোচক রফিকুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বলেন দেশের শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষ বর্তমানে নানাবিধ সংকটে জর্জরিত। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্দ্ধগতিতে সাধারণ জনগণের নাভিশ্বাস উঠছে। প্রতিদিনই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, কিন্ত শ্রমিক মজুরি বাড়ছে না। উপরন্তু শ্রমিক কাজ করে মজুরি পাচ্ছে না, যখন তখন কলকারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ শ্রমিক ছাঁটাই নির্যাতনের বিরুদ্ধে, বকেয়া পাওনা নিয়ে রাজপথে নামলে রাষ্ট্রীয় বাহিনী তাদেও উপর চড়াও হয়। আমাদের দেশে শ্রমিক কৃষক জনগণের শ্রমে-ঘামে যে উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি হয় তার সিংহভাগই লুটপাট করে নেয় সা¤্রাজ্যবাদ ও তার এদেশীয় দালাল জোতদার-মহাজন, দুর্নীতিবাজ আমলারা।
চা শ্রমিক নেতা হরিনারায়ন হাজরা বলেন নিন্মতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক ঘোষিত ৪৩ টি সেক্টরে এবং মজুরি কমিশন ঘোষিত রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প সেক্টরের মজুরির সাথে তুলনা করলে চা-শ্রমিকদের মজুরি অত্যন্ত কম। প্রায় ২০০ বছরের চা-শিল্পের ইতিহাসে আজও চা-শ্রমিকদের মজুরি দৈনিক মাত্র ১৮৭.৪৩ টাকা। চা শ্রমিকদের উপর শোষণ-লুণ্ঠন, নিপীড়ন-নির্যাতনের এহেন মাত্রা প্রাচীন দাস সমাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, চা-শিল্প রক্ষা বলতে মালিকরা শুধু তাদের বল্গাহীন শোষণ-লুণ্ঠনকেই বুঝান। অথচ চা শ্রমিককে বাদ দিলে এই শিল্পের অস্তিত্ব থাকেনা।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম ছদরুল বলেন, সিলেটের পাথর লুটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রকৃত লুটপাটকারীদের না ধরে নিরীহ বারকি শ্রমিকদের হয়রানী করা হচ্ছে। বারকি শ্রমিকরা ব্রিটিশ আমল থেকে সনাতন পদ্ধতিতে নদী থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে বালু ও পাথর উত্তোলন করে আসছিল কিন্তু সম্প্রতি পাথর খেঁকোদের বোমা, ড্রেজার, শ্যালো, সেইভ ইত্যাদি যান্ত্রিক খননযন্ত্রের তান্ডেবে আজ হাজার হাজার বারকি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি বেলচা, বালতি, নেটের সাহায্যে প্রাকৃতিক উপায়ে বালি-পাথর উত্তোলনে বারকি শ্রমিকদের সুযোগ প্রদান এবং ইজারা প্রথা বাতিল করে সরকারিভাবে ক্রয় বিক্রয় কেন্দ্র চালুর দাবি জানান।
হোটেল শ্রমিকনেতা মীর জসিমউদ্দিন বলেন বলেন, গত ৫ মে ২০২৫ হোটেল রেস্টুরেন্ট সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য জাতীয় নিন্মতম মজুরি গেজেট প্রকাশিত হয়। যে নিন্মতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্দ্ধগতির বাজারে তা দিয়ে মাসের ১০ দিন চলাও কঠিন। তাও মালিকরা সরকারের গেজেট বাস্তবায়ন করছেন না। শ্রমিকদের সমস্যা সংকট মোকাবিলায় সরকারের শ্রম ও কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন থাকলেও তারা শুধুমাত্র কাগজে কলমে বাস্তবিকভাবে শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানের প্রেক্ষিতে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখেন না। সভা থেকে হোটেল-রেস্টুরেন্ট সেক্টরের শ্রমিকদের বাঁচার মত মজুরি, শ্রমআইন অনুযায়ী প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা আদায়ের সংগ্রামের পাশাপাশি শ্রমিক শ্রেণির সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে হোটেল-রেস্টুরেন্ট শ্রমিকদেরকে দেশের অপরাপর সেক্টরের শ্রমিকদের ও জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামে একাত্ন হওয়ার আহবান জানান।
স’মিল শ্রমিকনেতা রুহুল আমিন বলেন স’মিল শ্রমিকরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। যে কারণে স’মিলে কর্মরত শ্রমিকদের শতকরা ৬০ ভাগ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দূর্ঘটনায় অঙ্গহানি, পঙ্গুত্বের শিকার হতে হয়, এমন কি কোন কোন ক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করতে হয়। এই ঝুকিপূর্ণ কাজ করে স’মিল শ্রমিক ন্যায্য মজুরি তো দুরের কথা সরকার ঘোষিত নিন্মতম মজুরিও পায় না। এমন কি শ্রমআইনের সুযোগ সুবিধা থেকেও স’মিল শ্রমিকরা বঞ্চিত। অথচ সরকারের শ্রমদপ্তর এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা শ্রমআইন বাস্তবায়নে নির্বিকার।
সভা থেকে জাতীয় ন্যূনতম মূল মজুরি ৩০ হাজার টাকা ঘোষণা, গণতান্ত্রিক শ্রমআইন প্রণয়ন, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রতিষ্ঠা, অনতিবিলম্বে সকল বন্ধ কল-কারখানা চালু, রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নতুন শিল্প-প্রতিষ্ঠান স্থাপন, সভা-সমাবেশ-ধর্মঘট করার অধিকার, অবিলম্বে সকল চা-বাগানের শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি-রেশন পরিশোধ ও বাজারদরের সাথে সংগতিপূর্ণ বাঁচার মত মজুরি; হোটেল, প্রেস, স’মিল, রাইসমিল, নির্মাণ, রাবার সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য ঘোষিত মজুরি বাস্তবায়ন, ব্যাটারি চালিত রিকশা, ইজিবাইক, টমটম উচ্ছেদ বন্ধ, প্রাকৃতিক উপায়ে হাতের সাহায্যে বালু পাথর উত্তোলনের সুযোগ প্রদান, সর্বস্তরে রেশনিং চালু করার দাবি জানান।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D