২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:১২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৮, ২০২৪
এমজেএইচ জামিল, সিলেট
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে বদলে গেছে সীমান্ত এলাকারা চোরাচালানের প্রেক্ষাপট। জানা গেছে, একসময় সীমান্ত দিয়ে চিনি মাদকসহ ভারতীয় পণ্য চোরাচালান হলেও এবার পাচার হচ্ছেন মানুষ। এর নেতৃত্বে রয়েছেন পুরনো চোরা কারবারিরা। অভিযোগ রয়েছে, কখনো পুলিশ ও বিজিবিকে ম্যানেজ করে আবার কখনো ফাঁকি দিয়ে সিলেটের সীমান্ত দিয়ে রাঘব বোয়ালের পাশাপাশি পালিয়েছেন চুনোপুটিরা। আরো অনেকেই রয়েছেন পালানোর চেষ্টায়। আর এসব কাজে কাড়ি কাড়ি টাকা গুণতে সক্রিয় রয়েছেন এপার ও ওপারের দালাল চক্র। সীমান্ত দিয়ে যে শুধু পালিয়ে যেতে পারছেন তা নয়। কেউ কেউ সীমান্তে ধরা পড়ছেন জনতার হাতে। আবার পালাতে গিয়ে ঘটছে মৃত্যুর ঘটনাও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে জনরোষে পতন ঘটে আ’লীগ সরকারের। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। ৪ আগস্টও দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে রাজপথ দাপিয়েছেন আ’লীগের অনেক নেতা-কর্মী। অথচ একদিন পরই আত্মগোপনে চলে যান তারা। এমন পরিস্থিতিতে সিলেটের সীমান্ত এলাকায় ভীড় করেন তারা। স্থানীয় ও ভারতীয় দালালদের ম্যানেজ করে দেশ ছেড়ে পালানো শুরু করেন তারা। পালানোর এই তালিকায় আছেন সাবেক মন্ত্রী, সাবেক মেয়র, এমপিসহ আ’লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মী। দালালদের মাধ্যমে সীমান্ত পাড়ি দিতে একেকজনকে গুনতে হচ্ছে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত। আবার কখনো এর কম-বেশি।
জানা গেছে, সিলেটের জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ এবং বিয়ানীবাজার উপজেলার সীমান্তের শতাধিক স্থান দিয়ে দেশে চিনিসহ মাদক চোরাচালানের পুরনো ইতিহাস রয়েছে। তবে ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর আ’লীগের দলীয় নেতা-কর্মীরা দেশ ছেড়ে পালানোর নিরাপদ রুট হিসেবে কানাইঘাটের দনা সীমান্ত ও জকিগঞ্জের সুতারকান্দি সীমান্তকে ব্যবহার করেছেন। কানাইঘাটে দুইপারের স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় সীমান্ত পার হলেও সাবেক এক এমপি ও তার অনুসারীরা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আ’লীগ নেতা-কর্মীদের সীমান্ত পার করে দেন। এমনকি ওই এমপির মাদরাসার ইয়াতিম খানায় বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে আশ্রয় দান করা হয় বলেও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে। মাদরাসার ইয়াতিম খানা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এবং ওই এলাকায় সাবেক এমপির অনুসারী বেশি থাকায় স্থানীয়রা অভিযানের সাহস করতে পারেননি। সেই সুযোগকে ব্যবহার করেই সীমান্ত দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পালাতে সাহায্য করেন ওই সাবেক এমপি ও তার অনুসারীরা। এছাড়া সুনামগঞ্জ, বিয়ানীবাজার সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে গেছেন অনেকেই।
ভারতের করিমগঞ্জ এলাকায় বসবাসরত একাধিক জনের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, সেখানে আ’লীগের শীর্ষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। কেউ কেউ হোটেলেও অবস্থান করছেন। আবার কেউ কেউ বাসা-বাড়িতে ভাড়া দিয়ে থাকছেন বলে ওই সূত্রটি জানিয়েছে। তবে সীমান্তের ওপারে থাকলেও তাদেরকে খুব একটা জনসম্মুখে আসতে দেখা যায়নি বলে জানা গেছে। সেখানে বসে কেউ কেউ অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন আবার কেউ কেউ অন্য দেশে পাড়ি জমাতে ভিসা প্রসেসিংয়ে রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা গেছে, শেখা হাসিনা সরকারের পতনের পর অবৈধ পথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন সাবেক প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট রণজিৎ সরকার, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ও সিলেট-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ ও বিধান কুমার সাহা, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাজমুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক রাহেল সিরাজ ও মহানগর সাধারণ সম্পাদক নাঈম আহমদ, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আফতাব হোসেন খান, সাধারণ সম্পাদক দেবাংশু দাস মিঠু, জেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম। এদের মধ্যে সাবেক সিটি মেয়র আনোয়ারুজ্জামান ও সাবেক সংসদ সদস্য হাবিব দু’জনই ব্রিটিশ নাগরিক। ভারত থেকে তারা ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে চলে গেছেন বলে তাদের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি সিলেটের কানাইঘাট সীমান্তে জনতার হাতে আটক হন বিতর্কিত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। গত ২১ আগস্ট মানিক কানাইঘাট উপজেলার আটগ্রামে অবস্থান নেন। নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে সীমান্ত পার করে দেয়ার জন্য তিনি স্থানীয় দালালদের সহযোগিতা নেন। পরে তাদের সাথেই গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সীমান্ত পাড়ি দিতে হেঁটে রওনা হন। প্রায় ২০ মিনিট হাঁটার পর সীমান্তের একটি জঙ্গলে দালালেরা মানিককে রেখে চলে যান। ওই রাতে তিনি জঙ্গলে একাই ছিলেন। শুক্রবার সকালে তাকে ভারতে পাঠানোর কথা জানিয়েছিলেন দালালেরা। তবে স্থানীয় মানুষের তৎপরতায় সেটি আর হয়নি।
শামসুদ্দিন চৌধুরীকে আটকের সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন সীমান্তবর্তী ডনা খাদিমপাড়া গ্রামের বিলাল আহমেদ। পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বিলাল জানান, এক ব্যক্তিকে অবৈধভাবে ভারতের সীমান্ত পাড়ি দেয়ানো হচ্ছে- এমন তথ্য এলাকাবাসী পান ২১ আগস্ট। কিন্তু বিষয়টির সত্যতা তারা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পরে জানতে পারেন, দালালেরা ওই ব্যক্তিকে ভারতের সীমান্তবর্তী একটি জঙ্গলে নিয়ে রেখে এসেছেন বৃহস্পতিবার। সেটি জানতে পেরে তারা সীমান্ত এলাকায় খোঁজাখুঁজি করে বিকেলের দিকে এক ব্যক্তির অস্তিত্ব জঙ্গলে পান। তবে দালালদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় লোকজন জঙ্গলে গিয়ে দেখেন, এক ব্যক্তি কলাপাতা ওপর শুয়ে আছেন। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে স্থানীয় লোকজন জানতে পারেন, তিনি পালিয়ে অবৈধভাবে ভারতে চলে যেতে চাইছেন। তবে দালালেরা তাকে মারধর করে সাথে থাকা প্রচুর টাকা নিয়ে পালিয়েছেন। পরে বিজিবিকে বিষয়টি জানানো হয়। স্থানীয় লোক মারফত খবর পেয়ে সন্ধ্যার দিকে বিজিবির টহল দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে আটক করে বিজিবির ডনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। ততক্ষণে ডনা ক্যাম্পের আশপাশে উৎসুক মানুষেরা ভিড় জমান।
ডনা বিজিবি ক্যাম্পের নায়েক সুবেদার মহিবউল্লা জানান, ক্যাম্পে এনে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। এরপরই বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারত পালাতে গিয়ে মারা গেছেন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান পান্না। ভারতে পালানোর সময় মেঘালয়ের শিলং পাহাড়ে ওঠার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। গত শুক্রবার (২৩ আগস্ট) মধ্যরাতে এ ঘটনা ঘটে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বেশ কিছুদিন আত্মগোপনে থেকে ভারতে পালাতে চেয়েছিলেন পান্না। সীমান্ত পার হয়ে শুক্রবার রাত ১২টার দিকে মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ের একটি পাহাড়ে ওঠেন তিনি। পাহাড় পার হয়ে ওপারে যাওয়ার চেষ্টার সময়ই হৃদরোগে আক্রান্ত হন। এতে তার মৃত্যু হয়। তবে পান্নার মৃত্যু নিয়ে ভিন্ন তথ্যও মিলেছে। কেউ কেউ বলছেন, পাহাড়ে ওঠার সময় পা পিছলে পড়ে গিয়ে তিনি মারা যান।
সিলেটের তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন পান্না। ওপারেই তার মৃত্যু হয়েছে। গুলি নাকি স্ট্রোকজনিত কারণে, সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সীমান্তের ভারত প্রান্তের একটি থানায় তার লাশ রয়েছে বলে জেনেছে পরিবার।
ভিন্ন একটি সূত্র বলছে, ভারতে পালানোর সময় পান্নার সাথে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিনও ছিলেন। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে আমিনের মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কল দিয়ে বন্ধ পাওয়া গেছে।
আরেকটি সূত্র বলছে, পান্নার সাথে ঝালকাঠি ছাত্রলীগের একজন নেতা ছিলেন। তবে এ বিষয়ে পুলিশের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পান্নার লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের ১৯৯৪ সালের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন পান্না। ২০০৮ সালের নির্বাচনে পিরোজপুর-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান পান্না। পরে ১৪ দলীয় জোটগত নির্বাচনের কারণে সরে যেতে হয় তাকে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ করা যায়, কিন্তু মানবপাচার বন্ধ করা কঠিন। যারা পালিয়ে গেছেন তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গেছেন। সাবেক বিচারপতি মানিক সাহেব পালাতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতা পালাতে গিয়ে মারা গেছেন। যদিও সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রয়েছে। কিন্তু এলাকার তুলনায় জনবল তুলনামুলক কম। আর যারা পাচার হতে চায় তারা দুই পারের দালালদের সাথে যোগাযোগ করে ফাঁকফোকরের অপেক্ষায় থাকে। আর এভাবেই মুলত কিছু আ’লীগের দলীয় নেতা-কর্মীরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়ে গেছেন।
এ ব্যাপারে সিলেট জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও সহকারী পুলিশ সুপার সম্রাট তালুকদার নয়া দিগন্তকে বলেন, সীমান্ত এলাকা টহল দেয়া বিজিবির দায়িত্ব। এছাড়া সীমান্ত উপজেলাগুলোতে পুলিশের নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে। ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানায় হামলা জনিত কারণে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেগুলো সংস্কার চলছে। পাশাপাশি থানা পুলিশের সকল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে বিজিবি সিলেটের অতিরিক্ত পরিচালক (অপারেশন) মেজর সালাউদ্দিন বলেন, সীমান্তে বিজিবির টহল জোরদার আছে। যেকোনো ধরনের চোরাই পণ্য ও মানবপাচার ঠেকাতে বিজিবিকে আরো কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যারা পালিয়েছেন তারা কিভাবে পালিয়েছেন বিষয়টি আমাদের জানা নেই। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সীমান্তে চোরাচালান বন্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি। এছাড়া নিয়মিত অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D