সিলেট-ছাতক রেল যোগাযোগ চালুর দাবী

প্রকাশিত: ৪:০৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০২৪

সিলেট-ছাতক রেল যোগাযোগ চালুর দাবী

ক্ষমতার প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হওয়ায় ছাতকের ঐতিহ্য বলে খ্যাত ছাতক-সিলেট রেল চলাচলের ব্যাপারে আবারো আশাবাদী হয়ে উঠেছেন ছাতকের আপামর জনগন। ছাতক-সিলেট রেল যোগাযোগ পূনঃ স্থাপন এবং রেল যোগাযোগ আধুনিকায়নের দাবী আবারো জোরালো ভাবে উঠেছে। একই দাবীতে ২০২১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিওএসপি বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছিল সিলেটস্থ ছাতক সোশ্যাল ফোরাম।

ঐতিহ্যবাহী ছাতক-সিলেট রেল যোগাযোগ জোড়া-তালি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসলে ও বিগত করোনা মহামারী শুরুর দিকেই সারা দেশের ন্যায় এ রেল লাইনে রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়। এ অঞ্চলের মানুষ তখন মনে করেছিলেন হয়তো পরিস্থিতির উন্নতি হলে আবারো ছাতক-সিলেট রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। সময়ের ব্যবধানে দেশের করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রেল চলাচলও ক্রমে স্বাভাবিক হতে থাকে। কিন্তু ছাতক- সিলেট রেল যোগাযোগের ভাগ্যাকাশে দেখা দেয় কালো মেঘের ঘনঘটা। লাইন সংস্কার সহ বিভিন্ন অজুহাতে কালক্ষেপন করতে থাকে রেল কর্ক্তৃপক্ষ। এ সুযোগে একটি দুর্নীতিবাজ চক্র লাইন সংস্কারের নামে সরকারী অর্থ আত্মসাতের ফঁন্দিতে মাথাছাড়া দিয়ে উঠে। ছাতক-সিলেট লাইন সংস্কারের নামে কয়েক দফায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে যায় এ চক্রটি। ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হতে থাকে ছাতক-সিলেট লাইনে রেল চলাচলের বিষয়টি।

এক সময়ের যাত্রী সাধারনের পদচারনায় মুখরিত ছাতক রেলওয়ে ষ্টেশন হয়ে উঠে অপরাধীদের অভয়ারণ্য। ২০২২ সালের স্মরনকালের ভয়াবহ বন্যায় ছাতক- সিলেট রেল লাইনের ছাতকের অংশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ছাতকের অংশের প্রায় ১৩ কিলোমিটার রেললাইন হয়ে পড়ে লন্ডভন্ড। বিভিন্ন অংশের লাইন,শ্লীপার এবং মাটি-পাথর ভেসে যায় বন্যার প্রবল স্রোতে।

বন্যা পরবর্তি সময়ে অর্থ মন্ত্রনালয়,এডিপি এবং রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ছাতকে এসে কয়েক দফা লাইন পরিদর্শন,জরীপ, ছাতক-সিলেট রেল লাইন আধুনিকায়ন,সিলেট-ছাতক-সুনামগঞ্জ রেল লাইন স্থাপন সহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনীতিবিদ,সুধীজন, সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করে দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাতক-সিলেট রেল যোগাযোগ চালুর ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। লাইন চালুর ব্যাপারে কর্ম তৎপরতাও শুরু হয়েছিল।

কিন্তু মন্ত্রী-এমপির ক্ষমতার লড়াইয়ে আবারো শিখেয় উঠলো ছাতক-সিলেট রেল যোগাযোগ পুনঃ স্থাপন ব্যবস্থা। এক পর্যায়ে রেলওয়ের কোটি-কোটি টাকার সম্পদে চলতে থাকে হরিলুট কারবার। যে যার মতে রেলের লৌহজাত সামগ্রী, লাইন,শ্লীপার,এমনকি লাইনে থাকা বগি পর্যন্ত কেটে বিক্রি করা হয়েছে।লাইনের পাথর চুরি করে নিয়ে পাথর শুন্য করা হয়েছে রেল লাইন। রেলওয়ের কোটি-কোটি টাকার মুল্যের ভু-সম্পদ, স্টাফ কোয়াটার, বাসাবাড়ি,হাসপাতাল, পুকুরসহ বিভিন্ন স্থাপনা যে যার মতো দখল করে নিয়েছে। প্রতিনিয়তই চুরি হতে থাকে রেলওয়ের বিভিন্ন সম্পদ। রেললাইনে থাকা পাথর এখন আর অবশিষ্ট নেই। বিভিন্ন স্থানের কাঠের শ্লীপার প্রতিনিয়তই খুলে নিয়ে যাচ্ছে চোরেরা। অপরাধীদের অভয়ারণ্য জনশুন্য রেল ষ্টেশন রাত্রি নামার সাথে-সাথে বখাটেদের আনাগোনা বেড়ে যায়। অরক্ষিত রেলওয়ে ষ্টেশন এখন মাদকসেবী ও মাদক বিক্রেতাদের নিরাপদ স্থানে পরিনত হয়েছে।

সিলেট অঞ্চলের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীক কেন্দ্র হিসেবে মালামাল পরিবহনকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় ছাতক-সিলেট রেল লাইন। বৃটিশ শাসনামল থেকে উপমহাদেশের মধ্যে ছাতকের ব্যবসা বাণিজ্যে রয়েছে এক গৌরবাজ্জ্বল ইতিহাস। ছাতকের পাথর, চুনাপাথর, বালু, সিমেন্ট, কয়লা ও কমলা লেবু সহ বিভিন্ন ব্যবসায় বাণিজিক সুখ্যাতি ছিল উপ মহাদেশসহ গোটা বিশ্বময়। ছাতকের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে অতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে ছাতক- সিলেট রেল যোগাযোগ। সুদীর্ঘ কালের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং ছাতক- সিলেট রেলের সোনালী অতীত ফিরিয়ে আনার লক্ষে সুনামগঞ্জ জেলার একমাত্র রেলপথ ছাতক-সিলেট রেল যোগাযোগ পূন:স্থাপন ও আধুনিকায়ন করার দাবী এখন সর্বমহলে। রেল চলবে, ডজনহীন রেল ষ্টেশন নীরবতা ভেঙ্গে যাত্রী সাধারনের কোলাহলে আবারো মুখরিত হয়ে উঠবে ছাতক রেলওয়ে ষ্টেশন-এমন প্রত্যাশায় প্রহর গুনছেন ছাতক ও দোয়ারাবাজারের মানুষ।

ছাতক শহরের ব্যবসায়ী ফখরুল আলম, মধু মিয়া, নৌসা মিয়া, কবির মিয়া, জালাল উদ্দিন, গোপাল দাস, জাবেদ আহমদ জানান, আগে সিলেট থেকে মালামাল কম খরচে রেল পথে নিয়ে আসা হতো। এতে পন্যের মুল্যও অনেকটা কম হতো। বর্তমানে পরিবহন খরচ বেশি এজন্য পন্যের দামও অনেকটা বেড়ে যায়।

তারা আরো জানান, দোয়ারাবাজারের কয়েকটি এলাকা সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। এসব এলাকার চাষীরা রেলপথে সবজি নিয়ে সিলেটে বিক্রি করতেন। এতে ন্যায্যমূল্য পেতেন সবজি চাষীরা। নিজ বাড়ি থেকে প্রতিদিন সিলেটের বিভিন্ন কলেজে শিক্ষার্থীরা ট্রেনে করে ছাতক থেকে কলেজে গিয়ে লেখাপড়া করতো। এ সু্যোগ এখন আর নেই। ১০ টাকার ভাড়ায় ছাতক থেকে সিলেট ট্রেনে যেতেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। সারা দিনে এ লাইনে ৩ টি ট্রেন আপ-ডাউন করতো। এই স্বল্প খরছে যাতায়াত এখন যেন দুর্লভে পরিনত হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে ছাতক বাজারের উর্ধ্বতন উপ সহকারী প্রকৌশলী (কার্য) আব্দুল নুর জানান, রেল লাইন আধুনিকায়ন ও সংস্কারে ২৩০ কোটি টাকার একটি বরাদ্ধ হয়েছে। সংস্কার কাজ দ্রুত সময়ের মধ্যে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট