‘সোনার বাংলা’ কি জঙ্গিবাদের পথে ?

প্রকাশিত: ১:৫১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০১৬

Manual5 Ad Code

বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই এ নিয়ে বিতর্ক এখন বাতুলতা মাত্র। জঙ্গিবাদ যে বড় সমস্যা, দেরিতে হলেও সরকার তা মানছে। বিশ্বের কাছে ক্রমশই বড় হয়ে উঠছে একটি প্রশ্ন– বাংলাদেশ কি জঙ্গিবাদের পথে?

জঙ্গি প্রসঙ্গে অবশেষে ‘অস্বীকারের কৌশল’ থেকে সরে এসেছে সরকার। সাম্প্রতিক অতীতেও বহুবার সরকারসংশ্লিষ্টদের বলতে শোনা গেছে, ‘দেশে আইএস নেই।’

Manual7 Ad Code

গত মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, ‘আমাদের গোয়েন্দারা খুব তৎপর। তারা জানিয়েছেন, দেশে কোনো আইএস নেই।’

Manual2 Ad Code

তখন বিদেশি হত্যা, সংখ্যালঘু হত্যার পেছনে বিএনপি-জামায়াতের হাত থাকতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

রমজান মাসে গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলার ঘটনায় ২৯ জন এবং ঈদের দিন শোলাকিয়ায় চার জন নিহত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নিজেই দেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার, জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং প্রত্যাশিত আন্তর্জাতিক সহায়তা সম্পর্কে সারা বিশ্বকে জানানোর সিদ্ধান্ত নেন।

Manual3 Ad Code

এর ফলে সরকার ‘অস্বীকার’ আর ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ ছেড়ে জঙ্গিবাদ নির্মূলে সর্বাত্মক প্রয়াসের দিকে মনোনিবেশ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অতীতে বিএনপি-জামায়াত সরকারও বাংলাদেশে ‘জঙ্গি নেই’ বলে সত্য আড়াল করার চেষ্টা করেছে। জঙ্গি ‘বাংলা ভাই’-এর উত্থানের সময় সব খবরের সত্যতা অস্বীকার করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই। বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি।’

পরে চাপের মুখে বাংলা ভাই এবং শায়খ আব্দুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ ছয় শীর্ষ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হয়। ফাঁসি কার্যকর হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে।

কিন্তু জঙ্গিদের ফাঁসি কার্যকর করার পর থেকে জঙ্গিতৎপরতা নির্মূল করার জন্য সমন্বিত এবং ধারাবাহিক প্রয়াস কখনোই দেখা যায়নি।

প্রসঙ্গত, ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০০৮-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটই ক্ষমতায় রয়েছে।

বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। আফগানিস্তানে তালেবান সৃষ্টির ধারাবাহিকতায় উপমহাদেশের অন্যান্য দেশেও জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়েছে।

ভারতের প্রতিবেশী বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার শুরু গত শতকে। হামলা শুরুর আগে জঙ্গিরা দীর্ঘদিন সংগঠিত হওয়ার সুযোগও পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রিয়াজ সেই সময়ের কথা তুলে ধরতে গিয়ে লিখেছেন, ‘নিরাপত্তা বিশ্লেষক, দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা, সন্ত্রাসবাদ বিষয়ের সাংবাদিক, নিরাপত্তা নীতিমালা তৈরির সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের কাছে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিষয়টি প্রায় দুই দশকের পুরোনো। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের সূচনা নব্বইয়ের দশকের কথাই বলবেন। এটাও উল্লেখ করা দরকার যে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের সূচনার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বিদেশি সংশ্লিষ্টতা। এ দেশে জঙ্গিবাদের উৎসমুখ বলে যাকে চিহ্নিত করা যায়, সেই হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামীর (হুজি) কার্যত প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকায়, জাতীয় প্রেসক্লাবে। আফগান মুজাহিদদের কাবুল বিজয়ে উল্লসিত ওই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশি ‘স্বেচ্ছাসেবীদের’ একাংশ সংবাদ সম্মেলন করেছিল সেদিন। সাংগঠনিকভাবে হুজি সংগঠিত হচ্ছিল আরো কয়েক বছর আগ থেকে। পাকিস্তানে হুজির প্রাথমিক রূপ তৈরি হয় ১৯৮০ সালে, কিন্তু এর আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৮৮ সালে এবং এর প্রসার ঘটে পরবর্তী চার বছরে। এই সময়েই সাংগঠনিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশে বিস্তারের পরিকল্পনা করা হয় এবং তার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশে হুজির যাত্রা শুরু।’

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের সূচনা এবং বিস্তার নিয়ে অনেক তথ্যপূর্ণ লেখালিখি হয়েছে। কিন্তু তারপরও সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বা প্রতিরোধের উদ্যোগ দেখা যায়নি।

২০০৩ সাল থেকে বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরায় বাংলাদেশে বেশ কিছু উগ্রবাদী দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে দৃশ্যত জঙ্গি তৎপরতাবিরোধী ধারাবাহিক কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। পরিণামে জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে। একসময় মনে করা হতো, জঙ্গি তৎপরতা শুধু মাদ্রাসাকেন্দ্রিক।

কিন্তু ধীরে ধীরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, এমনকি দুই-একটি বহুজাতিক কোম্পানিও চলে আসে সন্দেহের আওতায়। সন্দেহের ভিত ক্রমশ মজবুত হয়েছে নানা সময়ে জঙ্গিবাদী অপতৎপরতায় জড়িত সন্দেহে কিছু মানুষ গ্রেপ্তার হওয়ায়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং প্রমাণও ছিল তাদের অনেকের বিরুদ্ধে।

গুলশান হামলার পর থেকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে। বেসরকারি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া ‘অভিজাত’ পরিবারের সন্তানরা কীভাবে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ছে এ নিয়ে সবাই চিন্তিত।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যখন তুমুল মাতামাতি, তখনই বেরিয়ে এসেছে আরো ভয়াবহ তথ্য। দেখা যাচ্ছে, দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই এখন জঙ্গিরা তৎপর।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩ জনকে জঙ্গি তৎপরতায় সম্পৃক্ত থাকায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। ৩৩ জনের মধ্যে ১১ জন নর্থ-সাউথের, ৬ জন বুয়েটের, ৬ জন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের, ৩ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, ৩ জন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ২ জন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের।

Manual6 Ad Code

জঙ্গিবাদ যে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু ঢুকেছে তা-ই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবাদের থাবা নারীদের একটা অংশকেও স্পর্শ করেছে।

বাংলাদেশের জঙ্গিরা দেশের বাইরেও তৎপর৷ সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি জঙ্গি আটকের খবর ইতোমধ্যে সারা বিশ্বে সাড়া জাগিয়েছে। আটক ব্যক্তিরা জানিয়েছে, বাংলাদেশে তারা খেলাফত কায়েম করতে চায়, সেই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই তারা সিঙ্গাপুরে সক্রিয় ছিল। জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে ৪ বাংলাদেশিকে ইতোমধ্যে দোষী সাব্যস্ত করেছে সিঙ্গাপুরের আদালত।

আরো কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি জঙ্গিদের তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। দেশি-বিদেশি সব সংবাদ মাধ্যমেই এসব খবর প্রকাশিত হয়েছে।

অন্য দেশে হামলা চালানোর পর জঙ্গিরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়-আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে এমন খবরও এসেছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক সিরিয়ায় আইএস-এর জন্য ‘জিহাদি’ সংগ্রহে বাংলাদেশে এসেছে বলে খবর পাওয়া গেছে৷ খবরে প্রকাশ, এ কাজে তাদের সহায়তা করেছে কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবি।

সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশি জঙ্গিদের তৎপরতা আন্তর্জাতিক মহলে অজানা নেই। তাই আফগানিস্তান আর পাকিস্তানের পর দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ বাংলাদেশেও কীভাবে জঙ্গিবাদ আস্তানা গাড়তে শুরু করেছে এ নিয়ে নিয়মিতই বিশ্লেষণাত্মক লেখালেখি হচ্ছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সম্প্রতি আইএস বা আইএস সমর্থিত জঙ্গিরা কেন বাংলাদেশে তৎপর হচ্ছে এর কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছে। তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তথাকথিত জঙ্গি সংগঠনটি এখন কৌশলগত কারণেই বাংলাদেশে সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে।

আশার কথা, বাংলাদেশ সরকার দেরিতে হলেও বিষয়টিকে অবশেষে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। তাই প্রধানমন্ত্রীও সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করেছেন।

মসজিদে খুতবায় জঙ্গিবাদ যে ইসলামের শত্রু তা স্পষ্ট করে বলার উদ্যোগ নিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদের হাত থেকে বাঁচাতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং তার যথার্থ বাস্তবায়ন দরকার।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ জঙ্গি নির্মূলে বিশেষ বাহিনী গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন।

তার মতে, ‘জঙ্গি হামলার ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য দেশব্যাপী অ্যাসাইন্ড ফোর্স থাকা উচিৎ। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির মতো, যাদের দায়িত্বই থাকবে জননিরাপত্তা এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। তারা সর্বক্ষণ এটা নিয়েই কাজ করবেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিয়া রহমান জোর দিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক শিক্ষার ওপর। তাছাড়া সমাজে পরিবারের সনাতনী ভূমিকা ফিরিয়ে আনার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেছেন, ‘দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিভিন্নভাবে ভাগ হয়ে আছে। আমার মনে হয় সর্বস্তরে একরৈখিক শিক্ষা খুবই জরুরি। তাছাড়া নগরায়ন বা তথাকথিত আধুনিকায়নের কারণে পরিবারের সনাতনী ভূমিকাও পাল্টে গেছে। এ অবস্থায় সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে সেদিকে নজর রাখার জন্য পিতা-মাতাকে আরো সজাগ থাকতে হবে। ফেসবুক, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের ওপর এক ধরণের রেগুলেশন থাকাও জরুরি। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের ইস্যুসহ আরো কিছু বিষয়ে যেভাবে টাকা খরচ করে তৎপরতা চালানো হচ্ছে, এগুলো বন্ধ করার জন্য এটা খুব জরুরি।’

গুলশান ট্র্যাজেডির পর থেকে বাংলাদেশকে অনেকটা আতশ কাচের নীচেই রেখেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম। কোনো কোনো প্রতিবেদনে থাকছে একাত্তরে জয় ছিনিয়ে আত্মপ্রকাশ করা দেশটির ভবিষ্যত নিয়ে চরম আশঙ্কার কথা। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে বাংলাদেশ’- এমন শিরোনামও হয়েছে।

সরকারের সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগে অবশ্য ভিন্ন ইঙ্গিত। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইটা যেন সবে শুরু করেছে বাংলাদেশ।

সূত্র : ডয়চে ভেলে

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code