ছাত‌কের সাবেক মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী সিলেটে গ্রেপ্তার

প্রকাশিত: ৩:৩২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৯, ২০২৬

ছাত‌কের সাবেক মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী সিলেটে গ্রেপ্তার

Manual6 Ad Code

সুনামগঞ্জের ছাতক পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবুল কালাম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুরে সিলেটের তারাপুর চা বাগান এলাকা থেকে জালালাবাদ থানা পুলিশ তাকে আটক করে। পুলিশ জানায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সংক্রান্ত ০৬/২৪ মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

Manual2 Ad Code

জালালাবাদ থানার তদন্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তারেক গ্রেপ্তারের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

টানা চারবারের মেয়র, দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছাতক পৌরসভা গঠনের পর ১৯৯৯ সালে প্রথম নির্বাচনে চেয়ারম্যান হন আব্দুল ওয়াহিদ মজনু মিয়া। এরপরের ২০০৪, ২০১১, ২০১৬ ও ২০২১ সালের নির্বাচনে টানা চারবার মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালাম চৌধুরী। দীর্ঘদিন পৌর এলাকায় তিনি একচ্ছত্র প্রভাব বজায় রেখেছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বৃহত্তর ছাতক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন তার চাচা সুজন মিয়া চৌধুরী; তিনিই ছাতক উপজেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান। পরিবারিক প্রভাব ও রাজনৈতিক বলয়ের কারণে এলাকার রাজনীতিতেও ছিল তাদের আধিপত্য।

ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে উঠে আসা আবুল কালাম চৌধুরী সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনামলে ছাতক পৌর এলাকায় প্রভাবশালী নেতা হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন।

দুর্নীতি–অনিয়ম–চাঁদাবাজির অভিযোগ, পৌরসভার তহবিল, উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডার বাণিজ্যে ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগে মৌখিক ও লিখিতভাবে বহুবার অভিযোগ ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় তিন হাজার পাতার অনিয়মের নথি সামনে আসে, যা তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে— ভুয়া রেজুলেশন তৈরি করে রাস্তা উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অর্থ আত্মসাৎ, পৌরসভায় বিজ্ঞাপনের বিল, টেন্ডার অনুমোদন ও শ্রমিক সরবরাহে অনিয়ম, পৌরসভার উন্নয়ন কাজে নির্মাণ সামগ্রীর মান কমিয়ে বড় অঙ্কের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে তিনি পলাতক ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করে।

ছাতকের শিল্পাঞ্চল ও পরিবহন বাণিজ্যের ওপর দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে আবুল কালাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে। এছাড়া তার ভাইয়েরা লাফার্জ হোলসিম সিমেন্ট কোম্পানি, সিলেট পাল্প অ্যান্ড পেপার মিল, ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড এবং আকিজ প্লাস্টিক লিমিটেডের শ্রমিক সরবরাহ, পরিবহন ও ঠিকাদারি কার্যক্রম দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

পৌর মেয়র থাকা অবস্থায় ‘কালাম অ্যান্ড কোং’ নামে শ্রমিক সরবরাহের ঠিকাদারি চালাতেন তিনি—এমন অভিযোগও বহুবার উঠেছে। স্থানীয় ঠিকাদাররা দাবি করেন, এতে প্রকৃত ঠিকাদাররা বারবার বঞ্চিত হয়েছেন। এ ছাড়া নৌপথে চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিক নিয়োগে প্রভাব খাটানোসহ নানা অভিযোগ ছিল।

মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি পরিবেশের ক্ষতি না করার শপথ নিলেও বাস্তবে ছাতকের কৃষিজমি থেকে মাটি কেটে লাফার্জ হোলসিম সিমেন্ট প্লান্টে সরবরাহ করেন। এতে একদিকে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন—এমন তথ্যও তদন্তে উঠে আসছে।
মাটি কাটার এসব ঘটনায় গত দুই দশকে কোনো সরকারি দপ্তর ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছিল।

পৌর কাউন্সিলরদের একটি অংশ অভিযোগ করেন, মেয়র গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই এককভাবে অনেক কাজ করতেন। ভুয়া রেজুলেশন তৈরি, প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো, কাজের মান নিম্নমানের রাখা—এসব বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল। যদিও তার অনুসারীরা এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে আসছিলেন।

মেয়র পদে থাকাকালে তিনি নির্মাণকাজ পরিদর্শনে গিয়ে মান খারাপ পেলে নির্মাতাদের বকাঝকা করতেন—এমন দৃশ্য বহুবার দেখা গেলেও বাস্তবে এসব ‘দুর্নীতিবিরোধী আচরণ’ ছিল অভিনব কৌশল—এমন মন্তব্যও শোনা যায় স্থানীয়দের মুখে।

স্থানীয়দের দাবি, একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্র দীর্ঘদিন যাবৎ আবুল কালাম চৌধুরীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড আড়াল করতে সক্রিয় ছিল। বিগত সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কোনো দপ্তর কাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থা নেয়নি। এতে এলাকায় একধরনের ‘অদৃশ্য সুরক্ষা বলয়’ তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ছাতক বাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা, বিভিন্ন বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বেও তার পরিবারের সরাসরি প্রভাব ছিল। এতে সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায়ও অস্বচ্ছতা ছিল বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

Manual6 Ad Code

আবুল কালাম চৌধুরীর গ্রেপ্তারের খবরে ছাতক পৌর এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তার সমর্থকরা বিষয়টি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে দাবি করলেও অধিকাংশ নাগরিক দীর্ঘদিনের অভিযোগের বিচার শুরু হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।

দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘ছাতক পৌরসভায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বহু নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রেপ্তারের ঘটনা তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করবে।’

Manual2 Ad Code

ছাতক পৌর শহরের বাগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম চৌধুরী সাত ভাইয়ের মধ্যে চতুর্থ। তার বাবা মরহুম আরজ মিয়া চৌধুরী ছিলেন ব্যবসায়ী ও সালিশ ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিক পরিবার হিসেবেই এলাকায় তাদের পরিচিতি দীর্ঘদিনের।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, আবুল কালাম চৌধুরী ও তাপস চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযুক্ত নথিগুলো অত্যন্ত বিস্তৃত। টেন্ডার বাণিজ্য, পৌরসভার অর্থ আত্মসাৎ, ভূমি দখল, মাটি বিক্রি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগে আরও কয়েকজনকে তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে আরও গ্রেপ্তার হতে পারে।

Manual1 Ad Code

ছাতক পৌরসভায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম–দুর্নীতির অভিযোগের বিচার নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন আগের চেয়ে বেশি। অনেকে মনে করেন, এই প্রথমবার পৌরসভার আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের তদন্ত সঠিক পথে এগুচ্ছে।

একজন প্রবীণ ব্যবসায়ী বলেন, ছাতকের মানুষ বহু বছর ধরে অবিচার সহ্য করেছে। এখন অন্তত তদন্তের দরজা খুলেছে। স্বচ্ছ বিচার হলে সত্য সামনে আসবে।


 

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code