সিলেট জেলায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৫ শ্রেষ্ঠ জয়িতার সাফল্যের গল্প

প্রকাশিত: ৯:১৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩, ২০২৪

সিলেট জেলায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৫ শ্রেষ্ঠ জয়িতার সাফল্যের গল্প

সিলেট জেলার ৫ ক্যাটাগরীতে সাফল্য অর্জনকারী শ্রেষ্ঠ ৫ জয়িতাকে সম্মাননা সনদ ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়েছে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সিলেট ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস-২০২৩ উদযাপন উপলক্ষে গত ৯ ডিসেম্বর শনিবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক অনুষ্ঠানে শ্রেষ্ঠ ৫ জয়িতাকে সনদ ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিভাগীয় কমিশনার আবু আহমেদ ছিদ্দীকী এনডিসি শ্রেষ্ঠ ৫ জয়িতা অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকার শ্রেষ্ঠ জয়িতা শিপারা বেগম, শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী গোলাপগঞ্জ, নিজ ঢাকাদক্ষিণ এলাকার শ্রেষ্ঠ জয়িতা আদরী রাণী দাস, সফল জননী জৈন্তাপুরের আশামপাড়ার শ্রেষ্ঠ জয়িতা মিনারা বেগম, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছে যে নারী জকিগঞ্জের থানাবাজার এলাকার শ্রেষ্ঠ জয়িতা ফারহানা আক্তার ঝুমি, সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখায় সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকার শ্রেষ্ঠ জয়িতা সাংবাদিক সুবর্ণ হামিদ-কে সম্মাননা সনদ ও ক্রেস্ট প্রদান করেন।
সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ জয়িতাদের সাফল্যের গল্প :
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী : সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ৫নং ওয়ার্ডের শিবগঞ্জ সোনারপাড়ার আহমদ শামীম এর স্ত্রী শ্রেষ্ঠ জয়িতা শিপারা বেগম। ৩১ ডিসেম্বর ১৯৬৫খ্রি. তারিখে শিবগঞ্জ সোনারপাড়া, সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী নিয়ে লেখাপড়া করেন। পরিবারে তার ১ ছেলে ও ১ মেয়ে আছে। ১ম সন্তান মেয়ে ডাঃ শাহরিন ফেরদৌস, বর্তমানে সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজে কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত আছে, ২য় সন্তান রিদওয়ান হাবিব সিলেট এম সি কলেজ থেকে গনিতে অনার্স করেছে এখন মাস্টার্স করছে।
যেভাবে শিপারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন: ১৯৯০ ইং সালে পারিবারিক তার বিয়ে হয়। বিয়ের কিছু দিন পর স্বামী ও শাশুড়ী দুজন মিলে তার সাথে অন্যায় আচরণ করতে থাকেন। অসুস্থ বাবা মাকে দেখতে যেতে চাইলে হিসাব করে রিক্সা ভাড়া দিতো, কিছু নাস্তা কিনে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও অর্থের কারণে খালি হাতে যেতো। অসুস্থ মা একটু ধৈর্য ধরে থাকতে বললেন কেননা আমাদের সমাজে ডিভোর্স হলে সব দোষ মেয়েদের কাঁধে পড়ে। তাই সে সামাজিকতার কারণে নীরব থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেষ্টায় লেগে যায় শিপারা।
১৯৯৭ সালে তিন জন মহিলা মিলে লেডিস স্টার জীমের কার্যক্রম শুরু করেন। তিন জনের মধ্যে একজনের জীমের প্রশিক্ষণ ছিল, তার কাছ থেকে শিপারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কাজ শুরু করে। পরবর্তিতে পার্টনার দুজন বিদেশে চলে গেলে তিনি একাই জীম পরিচালনা করেন। কয়েক বছর পর ব্যক্তিগত কারণে লডিস স্টার জীমের কার্যক্রম বন্ধ করে দেন।
পরে শিপারা শিবগঞ্জ পয়েন্টে ধানসিড়ি লেডিস্ টেইলার্স নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এককভাবে শুরু করেন। একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কাটিং মাষ্টার রেখেছিলেন তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেন। এলাকায় লেডিস্ টেইলার্স না থাকায় খুব ভালো আয় হয়। টেইলার্সে কয়েজন মহিলা কারিগর ছিল। টেলাইলার্সের পাশাপাশি কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে বাসায় পড়াতেন। নিজের সন্তানদের নিজে পড়িয়েছেন। এদের শিক্ষার সিংহভাগ খরচ তার আয়ের টাকা থেকে খরচ করে সন্তানদের মানুষ করেছেন।
সিলেট নগরীর বন্দর বাজারস্থ সিটি সুপার মার্কেটে ২৯নং দোকান কোঠাটি ক্রয় করে মীম কম্পিউটার এন্ড ফটোস্ট্যাস্ট নামে ব্যবসা চালু করেন তিনি। বর্তমানে দোকানে ৪ জন কর্মচারী কর্মরত রয়েছে। এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে শিপারা বেগমের জীবনের মুড় পাল্টে গেছে। অর্থনৈতিক সফলতার কারণে আজ তিনি সমাজের একজন সফল স্বাবলম্বী নারী হিসেবে গর্বিত।
শিপারা বেগম একজন লেখক। অনেক গুলো যৌথ গ্রন্থ ছাড়াও একক কাব্য গ্রন্থ ভোরের আকাশ প্রকাশিত হয়েছে এবং আরো দুটো একক প্রবন্ধ ‘ভ্রমণ ও দর্শন’, ‘গর্বিত সিলেট’ বই দুটোর কাজ চলছে।
শরীরচর্চার ব্যবসা শুরু করেছিলেন মাত্র ১৫ হাজার টাকা দিয়ে। পরবর্তী ঐ ব্যবসার আয় থেকে লেডিস টেইলার্স প্রতিষ্ঠা করেন। যা ধানসিড়ি লেডিস টেইলার্স নামে আজও চলমান রয়েছে। এখান থেকে মাসিক আয় প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। বর্তমানে শিপারা বেগমের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭০ (সত্তর) লাখের কাছাকাছি। তার আয়ের টাকা দিয়ে জৈন্তাপুর চিকনাগুলে কান্দি এলাকায় সতের শতক ফসলের জমি ক্রয় করেছেন। সিলেটের বন্দর বাজারে অবস্থিত সিটি সুপার মার্কেটে ২৯ নম্বর দোকান কোঠা ক্রয় করে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন।
পুরুষ শাসিত সমাজে যে সকল নারী নিজের বুদ্ধি কিংবা মেধা দিয়ে সমাজে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন, তাদের মধ্যে শিপারা বেগম একজন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারী।

শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী : গোলাপগঞ্জে ৭নং লক্ষণাবন্দ ইউনিয়নের নিজ ঢাকাদক্ষিণ গ্রামের রুপন চন্দ্র দে এর স্ত্রী শ্রেষ্ঠ জয়িতা আদরী রাণী দাস। তিনি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। চার বোনের মধ্যে তিনি বড়। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মাতা ছিলেন গৃহিনী।
বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়ে ডাক্তার হবে। তাই তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। ২০০১ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এস.এস.সি ও ২০০৩ সালে কৃতিত্বের এইচ.এস.সি পাশ করার পর পরিবারের দারিদ্রতার কথা চিন্তা করে তিনি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের পরীক্ষা দেন এবং মেধা তালিকায় ১ম স্থান অধিকার করে গোয়াইনঘাট উপজেলায় সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। এস.এস.সি পরীক্ষার পর থেকেই তিনি টিউশনি করে পড়ার খরচ চলাতেন। সেই ধারাবাহিকতায় চাকুরীর পাশাপাশি তিনি টিউশনিও চালিয়ে যান এবং এর দ্বারা পরিবাবের খরচ ও তার তিন বোনের লেখাপড়ার খরচ যোগাতেন। তিনিসহ তার তিন বোনই সরকারী চাকুরিজীবী এবং এক বোন ফ্রান্সে সফট্ওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।
২০০৮ সালে গোলাপগঞ্জের বিদাইটিকর গ্রামের (নিজ ঢাকা দক্ষিণের) রুপন চন্দ্র দে এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ২ সন্তানের জননী। শ্বশুড় বাড়ী ছিল ৩৫ জনের একান্নবর্তী পরিবার। চাকুরীর সাথে পরিবারের সকল দায়িত্ব পালন করে স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে স্বামী ও পরিবারের সহযোগিতায় লেখাপড়া চালিয়ে যেতে থাকেন। পরিবার, স্বামী, সন্তানসহ সবার দায়িত্ব পালন করে রাত জেগে জেগে পড়ে তিনি তার চাকুরীকালীন বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করে কৃতিত্বের সাথে পাস করেন।
তার অর্জিত সনদসমূহ হচ্ছে- ১) বি.এস.এস, ২) সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন কোর্স, ৩) বি.এড, ৪) এম.এস.এস, ৫) ডিপ্লমা ইন হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন এন্ড সার্জারি কোর্স (২০১৩-২০১৪)।
তিনি যে সকল এওয়ার্ড অর্জন করেন সেগুলো হলো- মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সেরা বিতার্কিক নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে শ্রেষ্ঠ কাব শিক্ষক। ২০১৮ সালে উপজেলার শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষিকা । ২০১৯ সালে জেলার শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষিকা নির্বাচিত হন। ২০২০ সালে বাংলাদেশ স্কাউটসের মেডেল অব মেরিট নির্বাচিত হন । তিনি কাব স্কাউটের দেশ সেরা ২৩ জন শিক্ষকের মধ্যে একজন। ২০২১ সালে সিলেট অনলাইন প্রাইমারী স্কুল পরিচালনার জন্য করোনা যোদ্ধা শিক্ষক সম্মাননা ২০২১ অর্জন করেন। ২০২৩ সালে তিনি সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ কাব শিক্ষক নির্বাচিত হন।
তার সব সময়ের একটা স্বপ্ন ছিল সমাজের জন্য কিছু কাজ করবেন। সেই থেকে তিনি এলাকার দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে পড়াতেন, গরীব ও মেধাবী ৩/৪ জন ছাত্রকে নিজ খরচে এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করান, প্রতিবছর তার নিজের একমাসের বেতন দরিদ্র মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণে ব্যয় করেন। করোনা কালে তার উদ্যোগে ৩ জন সহকর্মী মিলে অনলাইন ক্লাস চালু করে সিলেট বিভাগের ৪০/৪৫ জন শিক্ষক কে এর সাথে যুক্ত করে অনলাইনে ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান করেন। এর জন্য তিনি বিভিন্ন এওয়ার্ড পেয়েছেন। আদরী চাকুরীর শুরু হতেই স্কাউটিং এ যুক্ত ছিলেন এবং তার বিদ্যালয়ের প্রায় ৪৮ জন ছাত্রছাত্রী কাব স্কাউটিং এ যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ১৩ জন শিক্ষার্থী শাপলা কাব সাউটিং এওয়ার্ড পেয়েছে। এছাড়া বিদ্যালয় পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ রক্ষাসহ বিদ্যালয়ের সকল কো কারিকোলাম এক্টভিটি তার তত্ত্বাবধানেই হয়ে আসছে। তিনি প্রাথমিক শিক্ষক কল্যাণ সমিতি, সামাজিক সম্প্রিতি কমিটি, ইউনিয়ন দুর্যোগ প্রতিরোধ কমিটি, ইউনিয়ন সাংস্কৃতিক কমিটি প্রভৃতি বিভিন্ন কমিটিতে সদস্য থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
তিনি পরিবার ও সমাজের বিভিন্ন বাধাকে উপেক্ষা করে থেমে না গিয়ে সমাজে উদাহরণ সৃষ্টি করে নিজ প্রচেষ্টায় শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করে চাকুরী করায় এবং চাকুরী ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দিক থেকে আদরী রাণী দাস সফলতা অর্জন করায় তাকে “শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরীতে তিনি শ্রেষ্ঠ জয়িতা সম্মাননা লাভ করেছেন।
সফল জননী : জৈন্তাপুরের ২নং জৈন্তাপুর ইউনিয়নের আশামপাড়ার গ্রামের কুতুব উদ্দিন স্ত্রী শ্রেষ্ঠ জয়িতা মিনারা বেগম। তিনি ১৯৭৫ইং সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জৈন্তাপুর উপজেলার ২নং জৈন্তাপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চল আসাম পাড়া গ্রামে হারিছ আলী ও রাশিদা খাতুনের ঘরে জন্ম গ্রহণ করেন। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে ৫ম। শিশুকালে পিতৃহারা হন। সব শ্রেনিতে প্রথম স্থান অর্জন করার পরও মিনারার ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও সামাজিক ও আর্থিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে তার আর পড়ালেখার সুযোগ হয়নি। বড় ভাইয়ের দায়িত্বে তৃতীয় শ্রেণি পযর্ন্ত পড়ালেখা করার সুযোগ পান। তারপরও বাঁশ, বেতের হস্তশিল্প ও কাপড় সেলাইয়ের কাজ করে কেটে যায় কৈশোর বেলা।
১৯৯১ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে একই গ্রামের মৃত আব্দুল রশিদের ছেলে কুতুব উদ্দিনের সাথে পারিবারিকভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি পেশায় ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ৭ সন্তানের জননী। এর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দুইজন পানিতে ডুবে মারা যান। নিজে লেখাপড়া করতে না পারলেও জীবনের সব শখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের সবাইকে উচ্চ শিক্ষিত করেছেন।
স্বামীর সীমিত আয়ে ৫ সন্তানের পড়ালেখার খরচ ও সংসার চালানো কষ্টকর ছিলো। তার সকল সন্তান প্রত্যেক শ্রেণিতে ১ম স্থান অর্জন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা বৃত্তি লাভ করে। তার সন্তানরা দেশে-বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে মানুষের সেবায় নিয়োজিত আছে এবং তারা স্বাবলম্বী হয়েছেন।
সফল জননী মিনারা বেগমের ছেলে ডাঃ কাউছার আহমেদ (জন্ম-১৯৯৪) সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে বর্তমানে নিজ উপজেলা জৈন্তাপুর এ জেনারেল ফিজিশিয়ান হিসেবে নিয়মিত রোগী দেখছেন এবং উচ্চতর ডিগ্রির জন্য পড়াশোনা করছেন।
বড় মেয়ে সাকেরা বেগম (জন্ম-১৯৯৪ ইং) শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট হতে স্নাতক (নৃতত্ব বিজ্ঞান বিভাগে) পাশ করেছেন। বর্তমানে আমদানি-রপ্তানিকারক হিসেবে তামাবিল স্থলবন্দরে কমরত।
মেজো মেয়ে ডাঃ উম্মে কুলসুম (জন্ম-১৯৯৭ ইং) রংপুর মেডিকেল কলেজ হতে এম.বি.বি.এস পাশ করেছেন। সে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য পড়াশোনা করতেছেন। আমেরিকান লাইসেন্সিং পরীক্ষায় পাশ করেছেন। বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী।
ছোট মেয়ে ডাঃ উম্মে ফাতেমা (জন্ম: ১৯৯৯ ইং) জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হতে স্কলারশীপ পেয়ে এম,বি. বি.এস পাশ করে ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত আছেন এবং উচ্চতর ডিগ্রির জন্য পড়াশোনা করছেন।
ছোট ছেলে মোঃ ফয়েজ আহমদ (জন্ম-২০০৫ ইং) সিলেট সরকারী মডেল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচ,এস.সি পাস করেছে।
নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছে জকিগঞ্জ উপজেলার ইনামতি গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে সন্তান শ্রেষ্ঠ জয়িতা ফারহানা আক্তার ঝুমি। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণী পাশ করেন এবং লুৎফুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ে কারিগরি শাখা থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন। মাধ্যমিক পাশ করার পর জকিগঞ্জ হাফসা মজুমদার মহিলা কলেজে ভর্তি হন। পিতা না থাকায় একাদশ শ্রেণি পড়া অবস্থা ভাইদের চাপে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ে এক বছর পর তার বড় মেয়ের জন্ম হয়। মেয়ে সন্তান জন্ম দেয়ার কারণে শুরু হয় তার ওপর মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতন। নির্যাতন সহ্য করে সংসার করা অবস্থায় তার দ্বিতীয় মেয়ে জন্ম হয়। ফলে নির্যাতন-অত্যাচার বেড়ে যায়। স্বামী প্রবাসী, বছরে একবার আসতো সে সময় ও বিদেশ থেকে ফোনে বাজে আচরণ করতো। শশুর বাড়ির অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে স্বামী অনুমতি নিয়ে চলে আসেন কলাকুটা গ্রামের একটি বাসায়। দুই মেয়েকে নিয়ে একা বাসায় থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ায় বাবার বাড়িতে চলে যান ঝুমি। স্বামী কথামতো বাবার বাড়ি থেকে পীরেরচক গ্রামে ভাড়া বাসায় উঠেন। সে সময় কেছরী গ্রামে ৭ শতক জায়গা কিনেন তার স্বামী। দেশে এসে বাড়ির কাজ শুরু করার সময় তার স্বামী পরকিয়ায় জড়িয়ে পড়েন। ফলে আবার নির্যাতন শুরু হয়। এ অবস্থায় বাসার কাজ শেষ হয়ে গেলে নতুন বাসায় উঠেন ঝুমি ও সন্তানরা। ইতিমধ্যে তিনি আবারও গর্ভবতী হন। তার স্বামী বিদেশে চলে যাওয়ার আগে যার সাথে তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে সেই মহিলাকে বাসায় নিয়ে এসে তার এবং তার মেয়েদের সব দায়িত্ব দিয়ে যান। কিন্তু সেই মহিলা ঠিকমত খরচ দিত না। তিনি বিষয়টি স্বামীকে জানালে স্বামী উল্টো বলতো ঐ মহিলা ঠিকই দিচ্ছে, সে মিথ্যে বলছেন। ফোনে মেয়েদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতো। সব নির্যাতন সহ্য করে যাওয়া অবস্থায় আবার একটি মেয়ের জন্ম হয়। সাথে সাথে সংবাদটি ঐ মহিলা তার স্বামীকে জানালে স্বামী তাকে ভাল-মন্দ জিজ্ঞাস না করে মেয়ে সন্তান হওয়ার জন্য তাকে তালাক দেয়ার কথা বলে হুমকী দেয়। সেই সময় ফারহানা আক্তার ঝুমি ঐ মহিলাকে বলেন, আজ থেকে আমার আশে পাশে যেনো তোমাকে না দেখি। এরপর স্বামী প্রবাস থেকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেয়। তাই বাধ্য হয় উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মাজেদা রওশন শ্যামলীর কাছে গেলে তিনি তার স্বামীর সাথে যোগাযোগ করলে কয়েক মাস টাকা পাঠান। এরপর আবার স্বামী টাকা পাঠানে বন্ধ করে দেন।
স্বামী বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেয়ায় ঝুমি সন্তানদের নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকেন। জীবনের এত নির্মম সময়ও তিনি তার মেয়েদের পড়ালেখায় পিছিয়ে যেতে দেননি। কোন গৃহ শিক্ষক ছাড়াই তার মেয়েরা পড়ালেখায় এগিয়ে যাচ্ছিল। বড়মেয়ে জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ে। দ্বিতীয় মেয়ে হাফিজ মজুমদার শিক্ষা ট্রাষ্ট বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়েছে এবং ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় সাজ্জাদ মজুমদার বিদ্যানিকেতনের প্রতিভা নিবাসে। ছোট মেয়ে ভরণ মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক প্রাথমিকে পড়ে। এক মেয়েকে প্রতিভা নিবাসে দিয়ে শুরু হল বাকি দুই মেয়েকে নিয়ে যুদ্ধ।
উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরাম থেকে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাজেদা রওশন শ্যামলির মাধ্যমে একটি সেলাই মেশিন পান ঝুমি। ফলে সেলাই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার সুযোগ হয় তার। তখন থেকে স্বামী শুরু করে তাকে বাসা থেকে বের করে দেয়ার। হঠাৎ একদিন ঝুমি শুনতে পারেন তার স্বামী দেশে এসেছেন। মেয়েদের কথা ভেবে হলেও তার স্বামী বাসায় আসবে। সব সমস্য সমাধান হবে। একদিন রাতে বাসায় আসে তবে তাকে মেরে বাসা থেকে বের করে দেয়ার চেষ্টা করে। সে সময় ঝুমি বাথরুমে লুকিয়ে নিজেকে রক্ষা করেন। মেয়েদের চিৎকারে আশেপাশের লোক চলে আসলে তার স্বামী বেরিয়ে যান। বাসা ছেড়ে দেয়ার জন্য বিভিন্ন ভাবে হুমকী দিলে বাধ্য হয়ে ঝুমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গেলে তিনি তার স্বামীকে ডেকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে সংসার করার জন্য চাপ দিলে লুকিয়ে তিনি বিদেশ চলে যান।
সেলাই কাজ ও প্রাইভেট পড়িয়ে সংসার চালাচ্ছেন ঝুমি। পাশাপাশি চাকরির খোঁজা অবস্থায় প্রজন্ম রিসার্চ ফাউন্ডেশনে পরীক্ষা দিয়ে নির্বাচিত হন। তিনি তার মেয়েদের বাবা এবং মা‘র দুটি দায়িত্ব পালন করছেন। তার মেয়েরা তার কাছে রত্ন।
সকল সমস্যা পিছনে ফেলে একা সামনে এগিয়ে যাওয়া শিখে গেছেন। মেয়েদের নিয়ে আনন্দে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি ভাবেন তিনি নারী, তিনি সাহসী, তিনি অপরাজিতা ।
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ৫নং ওয়ার্ডের গোয়াইপাড়ার ৬৪/১ মল্লিকা বাসিন্দা সাংবাদিক সাদিকুর রহমান সাকীর স্ত্রী শ্রেষ্ঠ জতিয়তা সুবর্ণা হামিদ। তিনি পেশায় একজন সাংবাদিক। বর্তমানে চ্যানেল আই ও জাতীয় দৈনিক আমাদের নতুন সময় পত্রিকায় কর্মরত। পাশাপাশি সিলেট উইমেন্স জার্নালিস্ট ক্লাবের সভাপতি এবং সিলেট জেলা প্রেসক্লাব ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন-ইমজার কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য। এর আগে তিনবার ইমজার পাঠাগার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিলেট মহানগরীতে। তার বাবা সদ্য প্রয়াত বাউলশিল্পী আব্দুল হামিদ। মা জাহানারা খানম মিলন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সংরক্ষিত আসনের সাবেক কাউন্সিলর ও সিলেট জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ।
জন্ম ও বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত পরিবারে হলেও তার পথ চলা মোটেই সহজ ছিলো না। বাধা ছিল পদে পদে। যেমনি পরিবার থেকে তেমনি সমাজ থেকে। অনেক ধরনের কটু কথা শুনতে হয়েছে; কিন্তু মনোবল হারাইনি। সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে মানুষের কল্যাণে সমাজের উন্নয়নে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন সুবর্ণা হামিদ। সে পেশাগত দায়িত্বের জায়গা থেকে বাল্যবিবাহ নিরোধ, যৌতুক প্রথা নির্মূল, বিবাহ বিচ্ছেদ বন্ধের পাশাপাশি নারী সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাচ্ছেন। সামাজিক বিভিন্ন বাধাবিপত্তি পেরিয়ে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন।
সমাজে চরমভাবে অবহেলিত, নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার ও পিছিয়ে থাকা হিজড়া জনগোষ্ঠী অর্থাৎ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে পরিচিতদের নিয়ে প্রতিবেদন করায় প্রশাসন ও বিভিন্ন সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হওয়ায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা উপকৃত হয়েছে। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি মিডিয়া ফেলোশিপ লাভ করেন।
মহামারী করোনা ও ভয়াবহ বন্যার সময় ‘ত্রাণ পাচ্ছেননা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ’ শিরোনামে তার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তাদের কাছে সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণ পৌঁছে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি রক্তদান এবং রক্ত সংগ্রহ করে দেয়াও তার আরেকটি সামাজিক কাজ। তিনি সিলেট ব্লাড ফাউন্ডেশনের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন ও রোটারি ক্লাবের সঙ্গেও সমাজ উন্নয়নে কাজ করছেন। সমাজের অসহায় ও দুস্থ নারীদের স্বাবলম্বী করতে তিনি বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।
সুবর্ণা হামিদ সাংবাদিকতায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের পাঁচটি এ্যাওয়ার্ড/ সম্মাননা অর্জন করেছেন। এরমধ্যে রয়েছে, ২০০৮ সালে ‘জালালাবাদ রোটারি ক্লাব এ্যাওয়াড’, ২০১০ সালে জাতীয় পযার্য় থেকে ‘কীর্তিমতি সাংবাদিক সম্মাননা’ ও এক লাখ টাকা পুরস্কার, ২০১১ সালে সিলেটের ‘পারমিতা সম্মাননা’, ২০২১ সালে হিজড়াদের নিয়ে কাজ করেন ‘ইউএসএইড সম্মাননা’ ও ২০২৩ সালে ‘সমষ্টি সম্মাননা’ পেয়েছেন।
তার অর্জিত সফলতাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ৯ সেপ্টেম্বর-২০২৩ তারিখে ’লেখাপড়া করতে চায় সিলেটের তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতার’ শিরোনামে জাতীয় দৈনিক আমাদের নতুন সময়-এ তার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তিনজন হিজড়ার লেখাপড়া দায়িত্ব নেন প্রবাসী ফারমিছ আক্তার।
৮ অক্টোবর-২০২২ সালে ‘সিলেটের লোকালয়ে বানর, হানা দিচ্ছে বাসাবাড়িতে’ শিরোনামে দৈনিক আমাদের নতুন সময় তার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করলে বনবিভাগ বানরদের খাবারের ব্যবস্থা করেন। ফলে বানরের উৎপাত কমে আসে।
৪ সেপ্টেম্বর-২০২২ সালে ’সিলেটের ফার্মেসিগুলোতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণহীন ঔষধ’ শিরোনামে দৈনিক আমাদের নতুন সময় পত্রিকায় তার প্রতিবেদন ছাপা হলে ভ্রামমাণ আদালত সিলেটের বিভিন্ন ফার্মেসিতে অভিযান চালান।
এক হাত দিয়ে রিকশা চালাতেন প্রতিবন্ধী তিনিরুল, ২০০৮ সালে দৈনিক সবুজ সিলেটে তাকে নিয়ে তার প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সিলেটের নুসরাত সেবা সংস্থা তাকে একটি রিকশা ও নগদ অর্থ প্রদান করেন।
দৈনিক সবুজ সিলেটে-২০০৮ সালে আরেকটি প্রতিবেদন ‘একই পরিবারের সবাই শারীরিক প্রতিবন্ধী’ শিরোনামে ছাপা হলে ব্যক্তিগতভাবে একজন তাদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করেন।
নাজমা নামের এক অসহায় মেয়ের একটি পা ছিলো না তাকে নিয়ে ২০০৭ সালে দৈনিক সবুজ সিলেট পত্রিকায় তার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর জালালাবাদ রোটারি ক্লাবের মাধ্যমে কৃত্রিম পা পান নাজমা।
৯ ডিসেম্বর-২০০৭ সালে দৈনিক সবুজ সিলেটে ‘তবুও থেমে নেই সুফিয়াদের জীবন’ শিরোনামে একটি ফিচার নিউজ ছাপা হলে আর্থিক সহযোগিতা পান ঐ মহিলা।
উপরোক্ত কাজগুলোর মাধ্যমে সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ সাংবাদিক সুবর্ণা হামিদকে শ্রেষ্ঠ জয়িতা সম্মাননা লাভ করেছেন।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট