রাতভর অভিযানে সিলেটে ৪ জঙ্গিকে আটক করেছে র‍্যাব

প্রকাশিত: ৬:১২ অপরাহ্ণ, মে ৯, ২০২৩

রাতভর অভিযানে সিলেটে ৪ জঙ্গিকে আটক করেছে র‍্যাব

নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র’ শুরা সদস্য ও দাওয়াতী শাখার প্রধান আবদুল্লাহ মায়মুনসহ ৪ জঙ্গিকে সিলেটের এয়ারপোর্ট থানা এলাকা থেকে আটক করেছে র‍্যাব।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার (৮ মে) দিবাগত রাতভর অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।

আটককৃতরা হলো, সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার হাফিজ মাওলানা মাহমুদ হোসাইনের ছেলে ও ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র’ শুরা সদস্য এবং দাওয়াতী শাখার প্রধান আবদুল্লাহ মায়মুন ওরফে মুমিন (৩৪), ফরিদপুরের চরভদ্রসন এলাকার মৃত. শেখ আব্দুস ছালাম মাষ্টারের ছেলে মো. আবু জাফর তাহান (৪০), চাঁদপুরের মতলব উত্তরের মৃত মোস্তফা কাজীর ছেলে মো. আক্তার কাজী সাইদ অরজে আইজল (৩৮) ও গোপালগঞ্জের মুকসেদপুর এলাকার মৃত আব্দুর রাজ্জাক মোল্লার ছেলে সালাউদ্দিন রাজ্জাক মোল্লা (৩২)।

এসময় তাদের হেফাজত থেকে নগদ ২ লাখ টাকা, ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করা হয়।

মঙ্গলবার (৯ মে) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে র‍্যাব-৯ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব জানিয়েছেন র‍্যাব-৯ এর মিডিয়া অফিসার (সিনিঃ এএসপি) আফসান-আল-আলম।

তিনি জানান, র‍্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা জানতে পারে এই নতুন জঙ্গি সংগঠনের অন্যতম শুরা সদস্য ও দাওয়াতী শাখার প্রধান আব্দুল্লাহ মায়মুন সংগঠনের কয়েকজন সদস্যসহ সিলেটে অবস্থান করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার (৮ মে) এয়ারপোর্ট থানাধীন বড়শালা এলাকা থেকে রাতভর অভিযান চালিয়ে চার জঙ্গিকে আটক করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। আটককৃত সবাই জঙ্গি নতুন সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র সদস্য।

তিনি জানান, আব্দুল্লাহ মায়মুন অভিনব কৌশলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে নতুন জঙ্গি সংগঠনের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের জন্য অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকেন। পাশাপাশি তিনি জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সাথে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র সেতুবন্ধন কাজ করেন।

তিনি জানান, ২০২২ সালের ২৩ আগস্ট কুমিল্লা সদর এলাকা থেকে আট তরুণের নিখোঁজ হয়। নিখোঁজ তরুণদের পরিবার কুমিল্লার কোতয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। নিখোঁজের ঘটনা দেশব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।তখন র‍্যাব ফোর্সেস নিখোঁজদের উদ্ধারে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। নিখোঁজ তরুণদের উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে র‍্যাব ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ নামক একটি নতুন জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয় থাকার তথ্য পায় এবং র‍্যাব জানতে পারে যে, এই সংগঠনের সদস্যরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘কেএনএফ’ এর সহায়তায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে নতুন এই জঙ্গি সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাসহ সর্বমোট ৬৮ জন এবং পাহাড়ে অবস্থান, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কার্যক্রমে জঙ্গিদের সহায়তার জন্য পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘কেএনএফ’ এর ১৭ জন নেতা ও সদস্যকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসি।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতারকৃতদের নিকট থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় এই সংগঠনের আমীর আনিসুর রহমান মাহমুদ, দাওয়াতী কার্যক্রমের প্রধান গ্রেফতারকৃত আব্দুল্লাহ মায়মুন, সংগঠনের উপদেষ্টা শামীম মাহফুজ, অর্থ ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান রাকিব।

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, র‍্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা জানতে পারে এই নতুন জঙ্গি সংগঠনের অন্যতম শুরা সদস্য ও দাওয়াতী শাখার প্রধান আব্দুল্লাহ মায়মুন সংগঠনের কয়েকজন সদস্যসহ সিলেট এলাকায় অবস্থান করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার রাতে র‍্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা এবং র‍্যাব-৯ এর যৌথ অভিযানে সিলেটের এয়ারপোর্ট থানাধীন বড়শালা বাজার এলাকা হতে এই চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার করা হয় নগদ ২ লক্ষ টাকা, ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি।

তিনি জানান, আটক সকলেই পাহাড়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গি। এই জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদি সংগঠন কেএনএফ। এছাড়া আনসার আল ইসলামের সাথেও তাদের যোগসূত্র রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব জানায়, সপ্তাহদিন আগে সিলেট শহরতলীর বড়শলা এলাকায় মিথ্যা পরিচয়ে বাসা ভাড়া নেয় ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ নামক জংগি সংগঠনের চার সদস্য।

র‍্যাব জানায়, গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল্লাহ মায়মুন সিলেটের স্থানীয় একটি মাদ্রাসা হতে দাখিল সম্পন্ন করে। অনলাইনে ফিলিস্তিন, মায়ানমার, ইরাকসহ বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের উপর নির্যাতনের ভিডিও দেখে সে উগ্রবাদে আকৃষ্ট হয়। ২০১৩ সালে সে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে আনসার আল ইসলাম জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেয়। আনসার আল ইসলামের সিলেট বিভাগীয় প্রধানও ছিল সে।

আনসার আল ইসলামের শীর্ষ জঙ্গি নেতা চাকুরিচ্যুত মেজর জিয়ার সাথে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং তার বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিলো। ২০১৯ সালে বগুড়ার একটি সন্ত্রাস বিরোধী মামলায় সে গ্রেফতার হয় এবং এক বছরের অধিক কারাভোগ করে ২০২০ সালের শেষের দিকে জামিনে মুক্তি পায়’ বলে জানান র্যাবের এই কর্মকর্তা।

পরবর্তীতে তার জামিন বাতিল হলে সে আত্মগোপনে চলে যায়। ২০২১ সালে শুরা সদস্য রণবীর ও মানিকের মাধ্যমে ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকীয়ায় যোগ দেয় এবং পাহাড়ে গমন করে। আনসার আল ইসলামের সিলেট বিভাগীয় মাসূল হওয়ায় সে ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকীয়া’র শুরা সদস্য ও দাওয়াতী শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পায়। এছাড়াও সে সিলেট অঞ্চলে সংগঠনটির দাওয়াতী, প্রশিক্ষণসহ সংগঠনটির সার্বিক কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করতো।

সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব কর্মকর্তা আরও জানান, সিলেট বিভাগের যারা এই জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত হয় তারা মায়মুনের মাধ্যমে আসে। শুরুর দিকে তার মাধ্যমে আনসার আল ইসলাম এই জঙ্গি সংগঠনকে ১৫ লক্ষ টাকা অনুদান দেয়, মূলত সে আনসার আল ইসলামের সাথে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারদীয়ার সেতু বন্ধন তৈরি করে। এছাড়াও তার পরিচিত প্রবাসে থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি ও অন্যান্য সংগঠন এবং নিজ অর্থায়নে সে উক্ত জঙ্গি সংগঠনের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করেছে বলে জানা যায়। বিভিন্ন সময়ে সে বিদেশে অবস্থানরত তার আত্মীয়, বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে প্রতি ৩/৪ মাস পরপর ৩০/৩৫ লক্ষ টাকা নিয়ে আসতো বলে সূত্রে জানা যায়।

পাহাড়ে অভিযান শুরু হলে সে সংগঠনের সিদ্ধান্তে সমতলে এসে ঢাকা, নারায়নগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছিল সে। সাম্প্রতিক সময় সে পরিচয় গোপন করে ভুল তথ্য দিয়ে সিলেটের এই বাড়িটিতে ভাড়াটিয়া হিসেবে অবস্থান করছিল। আত্মগোপনে থেকে সে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সাথে যোগাযোগ রেখে সাংগঠনিক বিভিন্ন কাজ করতে থাকে এবং আনসার আল ইসলামের সাথে সম্বনয় করে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছিল বলে জানা যায়।

এদিকে গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছেন র‍্যাব কর্মকর্তারা।


 

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট