মহাকালের মহান ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ সাঃ

প্রকাশিত: ৮:৫৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৯, ২০২২

মহাকালের মহান ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ সাঃ

জাফর আহমাদ


পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ যত বড় নায়ক-মহানায়ক, সমাজ সংস্কারক, দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বিপ্লবী-মহাবিপ্লবীদের ভার ধারণ করেছে তাদের মধ্যে পৃথিবী তার সর্বাঙ্গে একমাত্র যে মহামানবের স্পর্শকে অনুভব করে, যার অবদান ও কীর্তিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে, তিনি বিশ্বমানবতার অকৃত্রিম বন্ধু, পূর্ণাঙ্গ মহামানব, কালেমার পতাকাবাহী মরু-সাইমুম, শেষ নবী, বিশ্বনবী, বিশ^নেতা হজরত মুহাম্মদ সা:। যার চরিত্রে অসংখ্য গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। যাকে পেয়ে তৃষ্ণার্ত পৃথিবী তৃপ্তি লাভ করেছিল। যিনি জীবনের সব দিক ও বিভাগে আমূল পরিবর্তন করে পুরো সমাজ সভ্যতাকে আল্লাহর রঙে রাঙিয়ে গেছেন। তিনি নিছক এমন কোনো ধর্মীয় নেতা ছিলেন না, শুধু মসজিদে বসে মানুষদের ধর্মীয় বাণী শুনাতেন বা বেশির ভাগ সময় ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। অথবা তিনি এমনটিও ছিলেন না, শুধু ইমামতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন বা উপরন্তু ধর্মীয় দিকটি দেখাশোনা করতেন। আর সন্তুষ্ট চিত্রে বাইরের পৃথিবীর নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন অসৎ, আল্লাহবিমুখ তাগুতি শক্তির হাতে।

কুরআন-হাদিস সাক্ষী, তিনি এমনটি করার জন্য প্রেরিত হননি; বরং পৃথিবীর অসংখ্য খোদার নাগপাশ থেকে সমাজ ও সভ্যতাকে মুক্ত করে এক আল্লøাহর গোলামে পরিণত করার সব কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। আল্লøাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘তিনিই তো তার রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য দ্বীনসহকারে পাঠিয়েছেন, যেন এটিকে অন্যান্য সর্বপ্রকার দ্বীনের ওপর বিজয়ী করে দেন- তা মুশরিকদের যতই অপছন্দ হোক না কেন।’ (সূরা আছ-সফ-৯)

আল্লøাহর পক্ষ থেকে যে হেদায়াত তথা আল কুরআন ও সত্য দ্বীন তিনি পেয়েছেন তা মানুয়ের গোটা জীবন ব্যবস্থার প্রত্যেকটি বিভাগের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেখানে কেবল আল্লøাহর আনুগত্য ও বিধান বিজয়ী ছিল। সেখানে আল্লøাহর আনুগত্য ও বিধানের বিপরীত সব প্রকার চিন্তা, চেতনা নামমাত্রও ছিল না। আর এটিই তাঁর কাজ ও এ কাজ তাঁকে অবশ্যই করতে হয়েছে। কাফের ও মুশরিকরা মেনে নেয় তবুও, না মেনে নেয় তবুও এবং বিরোধিতা ও প্রতিরোধের মুখে পুরো শক্তির মোকাবেলা করে রাসূল সা:-কে এ ‘মিশন’ অবশ্যই পূর্ণ করতে হয়েছে। পাহাড়সম বাধা আর বিরোধিতা নিয়ে পুরো তাগুতি শক্তির সাথে লড়ে গেছেন। এ জন্য তাঁকে অসংখ্য নির্যাতন, দুঃখ-কষ্ট, কঠিন ষড়যন্ত্রসহ অত্যধিক সুযোগ-সুবিধা দেয়ার লোভনীয় অফারের সম্মুখীন হতে হয়েছে; কিন্তু কোনো কিছুই তার মিশনকে সম্মুখে এগিয়ে নেয়ার পথকে রোধ করতে পারেনি।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমরা দৈনন্দিন কুরআনের সাথে যে ধরনের আচরণ করে যাচ্ছি, আল্লাহর রাসূল সা:-এর জীবন চরিতের সাথে ঠিক সে আচরণই করে যাচ্ছি। প্রত্যেকেই আমরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী কুরআনকে যেমন শতধা ভাগ করেছি। আল্লøাহর রাসূল সা:-এর জীবন চরিতকেও আমরা আমাদের সুবিধামতো ভাগ করে বিশেষ অংশের ওপর আমল করে যাচ্ছি। প্রকৃতপক্ষেই আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আল কুরআন ও রাসূল সা:-এর চরিতের সহজ ও সরল কাজগুলো ঘটা করে পালন করে যাচ্ছি, কিন্তু জীবনের বেশির ভাগ সমস্যা সমাধানের জন্য ধারস্থ হচ্ছি মানবরচিত মতবাদের কাছে। যার ফলে পার্থিব জীবনে আমরা বিশ্বময় অপমানিত ও লাঞ্ছিত হচ্ছি। কুরআনের সাথে কি ধরনের আচরণ করা হচ্ছে সে সম্পর্কে অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা জিজ্ঞাস করবেন, ‘যারা কুরআনকে টুকরো টুকরো করেছে; সুতরাং তোমার মালিকের শপথ, ওদের সবার কাছে আমি অবশ্যই প্রশ্ন করব। সে সব বিষয়ে, যা কিছু আচরণ তারা (কুরআনের সাথে) করত।’ (সূরা হিজর : ৯১-৯৩)

অথচ কুরআন ছিল রাসূল সা:-এর পথের সার্বক্ষণিক গাইড ও শক্তিশালী মিত্র। দৈনন্দিন এ কুরআনই কঠিন সংগ্রামে তাঁকে শক্তি জোগাত। সে কুরআন তিলাওয়াত, অধ্যয়নে আমরা আমাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যেমন এর সাথে জড়িত হই না; তেমনি রাসূল সা:-এর পুরো জীবন থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করি না। কুরআন থেকে পুরোপুরি ও সত্যিকার হেদায়াত লাভ সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত এর অর্থ অনুধাবন করা না যায়। তেমনি আল্লøাহর রাসূল সা:-এর জীবন থেকে সত্যিকার হেদায়াত লাভ যেমন সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর পুরো জিন্দিগিকে একটি জীবন, একটি আদর্শ হিসেবে গ্রহণ না করা যায়। কুরআন যেমন শুধু সওয়াবের উদ্দেশ্যে তিলাওয়াত করা ও পবিত্র গ্রন্থ আধ্যাত্মিকতার প্রতীক, পবিত্র মুজেজা ইত্যাদি বলে চিত্তকে শান্ত করার জন্য অবতীর্ণ হয়নি; তেমনি রাসূল সা:-এর চরিত্রের বিশেষ কোনো দিক বা অধ্যায় আলোচনা করে আবেগ প্রকাশ করলেই তাঁর সঠিক মূল্যায়ন বা দায়িত্ব পালন করা হবে না।

আল্লøাহর রাসূল সা:-এর চরিত্র ছিল আল কুরআন। তাই আল কুরআন থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাসূল চরিত্রকে বোঝা যেমন সম্ভব নয়; তেমনি আল কুরআনের শিক্ষাকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে রাসূল সা:-এর ২৩ বছরের জীবনের আলোকেই বুঝতে হবে। কারণ বিশ্বনেতা হজরত মুহাম্মদ সা: যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ওই আন্দোলনের চাহিদা অনুযায়ী যখন যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই অবতীর্ণ করা হয়। আল্লøাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা কুরআনকে অস্বীকার করে তারা বলে- আচ্ছা পুরো কুরআন তার ওপর একবারেই নাজিল হয়নি কেন? আসলে কুরআন তো এভাবেই নাজিল হওয়া উচিত ছিল যাতে করে এই ওহি দিয়ে আমি তোমার অন্তরকে মজবুত করে দিতে পারি এ কারণেই আমি একে থেমে থেমে নাজিল করেছি।’ (সূরা ফোরকান-৩২)

তাই কুরআন বুঝার জন্য রাসূলুল্লøাহ সা:-এর সংগ্রামী জীবনকে সামনে রাখতে হবে। সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ সা:-এর সংগ্রামের মাধ্যমে কুরআনকে সহজে বুঝেছিলেন। যারা রাসূল সা:-এর জীবনের আলোকে কুরআনকে বুঝতে চান না কিংবা তদনুযায়ী কাজ করতে নারাজ তাদের বর্ণনা করা হয়েছে এমন গাধা হিসেবে, যারা ওজন বহন করে; কিন্তু তারা জানে না কি বহন করছে এবং তা থেকে না হতে পারে উপকৃত। তারা সেই হতভাগা, যাদের বিরুদ্ধে আল্লøাহর নবী সা: বিচারের দিন অভিযোগ করবেন- ‘হে আমার আল্লøাহ, আমার জাতির লোকেরা এই কুরআনকে উপহাসের বস্তু বানিয়ে নিয়েছিল।’ (সূরা ফোরকান-৩০)