রাজনৈতিক অতিখেলায় ফাউলের শঙ্কা

প্রকাশিত: ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

রাজনৈতিক অতিখেলায় ফাউলের শঙ্কা

 মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার


রাজনীতির মাঠে খেলা এখনো বাকি? নাকি চলছে? নাক-মুখ খিঁচে ‘খেলা হবে, খেলা হবে’মর্মে হুইসেল বেজেছিল ঢাকা ঘেঁষা নারায়ণগঞ্জে। ক্ষমতাসীন দলের হেভিওয়েট এমপি শামীম ওসমানের মেয়র আইভিকে দেয়া হুঁশিয়ারিটি অনেক আগের। এ নিয়ে দেশজুড়ে ছিল ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। মুখরোচক ট্রলের ধুম পড়েছিল। গতমাসে ‘খেলা হবে’ হুঙ্কারের ভার্সন চলে আসে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে। সরকারি দল থেকে বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে আবৃত্তির ঢঙে হুঙ্কারে বলা হয়েছে- সামনে খেলা আছে, খেলা হবে। শোকের মাসের সম্মানে আগস্টে এ খেলায় যাচ্ছেন না জানিয়ে বলা হয়েছিল সেপ্টেম্বরে কোনো ছাড় নেই।
সেপ্টেম্বরও এখন শেষলগ্নে। খেলাটি চলছে কিনা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই। তবে, মাঠ গরম। সরকারি দলের নেতাকর্মীরা প্রতিদিন মাঠে থাকছে। বিএনপির সিরিজ কর্মসুচিও চলছে। লাশ পড়ছে বিভিন্ন জায়গায়। তা খেলারই অংশ কিনা প্রশ্ন সামনে আসছে স্বাভাবিকভাবেই। তবে, স্পষ্ট জবাব নেই। হাডুডু, লুডু; কানামাছি, গোল্লাছুট; ক্রিকেট-ফুটবল নানা ধাঁচে উত্তেজনাময় রাজনীতি। ভোলা, মুন্সীগঞ্জ, ফেনী, নোয়াখালী, খুলনা, মাগুরা, যশোর, রাজধানীর বনানীসহ কয়েক জায়গায় রণক্ষেত্র হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশের সঙ্গে বিএনপির সংঘর্ষ, নতুন করে মামলামোকদ্দমা মিলিয়ে সামনে এ খেলা কোথায় গড়াবে এখনই ধারনার মতো নয়।
এ খেলার রেফারি-আম্পায়ার মাঠে না মাঠের বাইরে তাও স্পষ্ট নয়। সাইডলাইনেও ধোঁয়াশা। দর্শক গ্যালারি থেকে দেখছে জনগণ। খেলার এই ময়দানে তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা ছেড়েছে জামায়াতে ইসলামী থেকে। প্রায় দুই দশকের মাথায় এসে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তারা বিএনপি জোটে নেই। জামায়াতের এক নায়েবে আমিরের সঙ্গে সরকারের এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর বৈঠকের গুঞ্জন চাউর হয়েছে বেশ কিছুদিন আগেই। নিবন্ধন ফিরে পেতে লবি করছে দীর্ঘদিন মাঠ রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে থাকা দলটি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য তাদের ১২০ আসনে প্রার্থী ঘোষণায় নতুন বার্তা পাচ্ছে গ্যালারির দর্শকরা। যে দলটির নিবন্ধনই নেই তারা কিভাবে নির্বাচনের স্বপ্ন দেখে মোটা দাগের প্রশ্ন।
বরাবরই জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনীতিতে ভাঙা-গড়া ও নানা মেরুকরণের খেলা হয়। পর্দার আড়ালের খেলাও জমজমাট হয়। এবার নির্বাচনের এক বছর আগেই সেই জম্পেশ খেলার আভাস। দল ও জোট গঠনের পাশাপাশি ভাঙনের বাদ্যও বাজছে। জাতীয় পার্টিতে তা বেশি সুরেলা। বিদেশি কূটনীতিকদের মিশনও জোরদার। দেশের সীমানার বাইরে চলছে তাৎপর্যপূর্ণ তৎপরতা। গুঞ্জন ডালপালা মেলছে।
তারওপর চলমান বিশ্ব উত্তেজনার মধ্যে খেলছে সব দেশই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ খেলায় ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমারসহ আশপাশের বিভিন্ন দেশকে টেক্কাও দিয়েছে বাংলাদেশ। সকালে এদিক, বিকালে ওদিক অথবা সব দিকে বাঙালি খেলা খেলতে গিয়ে এখন ধরাশায়ীর অবস্থা। ভূ-রাজনৈতিক সুবিধাজনক অবস্থানের শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, মিয়ানমার এমনকি পাকিস্তান পর্যন্ত কাউকে ছাড়েনি বাংলাদেশ। আবার পাকাপোক্তভাবে ধরেওনি। লেনদেনের সওদাগরিও করেছে কারো কারো সঙ্গে। জাতিসংঘের প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকা, অল্প কদিনের মধ্যে অবস্থান পাল্টে ভোটদানের মতো বাংলা খেলার পরিণতিতে এখন সবাইকে উজাড় করে দিতে হচ্ছে। ভারত, চীন, তুরস্ক, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ফ্রান্স, সৌদি থেকে আমিরাত পর্যন্ত সবার কাছে ধরনা দিতে হচ্ছে। সমীহ করতে হচ্ছে মিয়ানমারকেও।


ইউক্রেন প্রশ্নে চীন-রাশিয়া উভয়কে তুষ্ট রাখতে রাখতেই ‘যুদ্ধ চাই না’ তত্ত্বে মানবতার অজুহাতে ইউটার্ন দিয়ে চলে গেছে রাশিয়ার বিপক্ষে বা মার্কিন পক্ষে। একই সময়ে আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দানবীয় সরকার বলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর গালমন্দ। যুক্তরাষ্ট্র বিনা দোষে র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে মন্তব্য করে তাদের জাতপাতও উদ্ধার করা হয়েছে। এতে রুশ-চীন বা প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের তুষ্টির আলামত নেই। উপরন্তু এড়িয়ে চলার মতিগতি। কর্তৃত্ববাদে বিনা ভোটে ক্ষমতার নিশ্চয়তা এবং লেনদেনে সবাইকে আয়ত্তে রাখার মওকায়ও ছেদ পড়তে যাচ্ছে। তার ওপর গত কিছুদিন ধরে মিয়ানমারের প্রতি তাদের পক্ষপাতিত্বের ব্যারোমিটার আরো ওপরে। মিয়ানমার থেকে মেরে-কেটে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ধাওয়ানোর কথা কেবল ভুলে যায়নি, পারলে অস্বীকারও করছে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে কোনো কথা কানেই নিতে চাচ্ছে না তারা। রোহিঙ্গাদের জন্য বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থার পাঠানো সহায়তাও কমে যাচ্ছে রহস্যজনকভাবে।
এর পেছনে মারাত্মক কূটনীতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গোটা বিষয়টি মিয়ানমারের জন্য পুলকের। শায়েস্তা হওয়ার বদলে মিয়ানমারের নতুন করে বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে বসার নমুনা এরই মধ্যে স্পষ্ট। দেশটির ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা চলছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার। নিষেধাজ্ঞা ও প্রায় পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও দাপট খাটাচ্ছে বাংলাদেশের ওপর। তাদের একতরফা সমর্থন জোগাচ্ছে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া। মিয়ানমার ইস্যুতে ভারতের অবস্থানও বরাবর বাংলাদেশের বিপরীতে। ভারত দিয়েছে ব্যবহৃত আর্টিলারি, মর্টার, ক্লাশ সাবমেরিন। পাকিস্তানও উদার মিয়ানমারের দিকে। দেশটিকে জেএফ ১৭ দিয়েছে পাকিস্তান। ইসরাইল দিয়েছে উপকূলীয় যুদ্ধযান। এত যুদ্ধাস্ত্র কার বিরুদ্ধে কাজে লাগাবে মিয়ানমার? এ প্রশ্নের জবাব স্পষ্ট না হলেও ঘুরছে নানা বিশ্লেষণ। মিয়ানমার পায়ে পা দিয়ে কারো সঙ্গে গন্ডগোল পাকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না বা বাংলাদেশকে ইউক্রেনের পরিণতিতে ফেলার শঙ্কা উঁকি দিচ্ছে কোনো কোনো মহলে। প্রায়ই বাংলাদেশের ফেনী পর্যন্ত নিজেদের দাবি করতে ছাড়ে না মিয়ানমার। উল্লেখ্য, বিশ্ব গণমাধ্যমে নিন্দনীয়ভাবে উপস্থাপন হলেও মিয়ানমার খাদ্যশস্যে ভরপুর। প্রাকৃতিক সম্পদও প্রচুর। বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা থাকার মধ্যে টিকে থাকা অগণতান্ত্রিক দেশটির সেনাবাহিনী বাংলাদেশ অপেক্ষা শক্তিশালী।
দেশিয় নানা ডামাঢোল ও অতিকথার কচলানিতে উপরোক্ত বাস্তবতা কারো কারো চিন্তায়ও আসছে না। দৃশ্যমান যাবতীয় ব্যস্ততায় অন্তরালের ঘটনার দিকে মনযোগের ফুসরতও হয় না সবার। দৃশ্যায়নই সব নয়। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ষষ্ঠবারের মতো শাস্তি স্থগিত, ‘এই মুহূর্তেই সরকারের পদত্যাগ’ দাবি বা ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের হুমকি-ধমকি, পরক্ষণে বিএনপি মহাসচিবের জবাবই সব নয়। আশপাশে, ডানে-বামে ঘুরছে আরো নানা উপাদান। যেখানে লুকানো কেবল দুদলের নয়, গোটা দেশের ভবিষ্যৎ।
ঘোষণা দিয়ে খেলার পরিণতি আজতক সুখকর হয়নি। এ সংক্রান্ত বহু উদাহরণ রয়েছে। রাজনীতির মাঠ খেলার মাঠ , পাল্টা খেলার ঘোষণা বা হুমকি না দিলেও বিএনপির লাগাতার কর্মসূচির মধ্যে খেলার রসদ কম মনে করা যায় না। এ আগাম খেলায় দর্শকের চেয়ে যেন খেলোয়াড়ই বেশি। কেউ কারে নাহি ছাড়ে প্রতিযোগিতা খেলারামদের মধ্যে। গালমন্দ আর যাচ্ছেতাই মন্তব্য ছোড়ার সার্কাসও জমেছে। কথাচ্ছলে বলা হয়, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। রাজনীতিকে কৌশলের খেলাও বলা হয়। কিন্তু বেশি খেলায় বেশি ফাউল হয়। আর বেশি ফাউলে বেশি পেনাল্টি ও বেশি গোল অবধারিত হয়ে ওঠে। নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াতের এ দূরত্বকে প্রীতিম্যাচ বা টুর্নামেন্ট ভাবছেন কেউ কেউ। তবে, এ ধরনের খেলায় বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কারো পেরে ওঠার দৃষ্টান্ত কম। কিন্তু, এবারের আবহ ও পরিস্থিতি বেশি জটিল। অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির বাইরে আঞ্চলিক-উপআঞ্চলিক পরিসরেও খেলতে হচ্ছে সরকার তথা আওয়ামী লীগকে। সমানে খেলতে হচ্ছে ফ্রন্টে, ডিফেন্সেও। এ খেলার পরিনামে আন্তর্জাতিক পরিসরের খেলায়ও অংশীজন হয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। রুশ-ইউক্রেনসহ বিশ্বের স্নায়ুযুদ্ধের কোনো কোনো অংশীজনের খেলার শিকারে পড়ছে বাংলাদেশ।


লেখক:- ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও প্রকাশক বাংলা পোস্ট|√| প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক জাতীয় জনতা ফোরাম |√| ও প্রকাশক বাংলাদেশ জ্ঞান সৃজনশীল প্রকাশনা|√|

লেখাটি তথ্য সুত্রঃ বাংলাভিশন ডিজিটাল থেকে সংগ্রহ ।