সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক পরিবার সর্বহারা

প্রকাশিত: ৯:৪৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৮, ২০২২

সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক পরিবার সর্বহারা

 সড়ক দুর্ঘটনা ও রাষ্ট্রের নীতি ব্যবস্থা-ধারাবাহিক পর্ব (দুই)

মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার



বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বিভিন্ন সংস্থা-মহল কর্তৃক চিহ্নিত কারণগুলো হচ্ছে-চালকের অসাবধানতা-অদক্ষতা ও লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, রাস্তার স্বল্পতা-অপ্রশস্ততা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের চলাচল, প্রতিযোগিতামূলকভাবে গাড়ি চালানো ও ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করা, রাস্তার মধ্যে প্রয়োজনীয় ডিভাইডার না থাকা, ওভারব্রিজের স্বল্পতা, সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অসচেতনতা, ফুটপাত হকারদের দখলে থাকা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়কের ওপর অবৈধ হাটবাজার ও স্থাপনা, যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, অতিরিক্ত মাল ও যাত্রী বোঝাই, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় পথ অবরোধ-সভা ও হরতালসহ প্রভৃতি কারণে সৃষ্ট যানজটে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত হওয়া, সড়ক পরিবহণের সঙ্গে সম্পৃক্ত সংস্থা-প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার ঘাটতি, গণপরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না করা ইত্যাদি। ২০২১ সালে সংঘটিত দুর্ঘটনার ৬২ শতাংশের কারণ যানবাহনের বেপরোয়া গতি বলে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের উপরোল্লেখিত প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়েছে।

এটা সত্য, দেশের কোনো না কোনো স্থানে প্রায় প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। সংবাদপত্রে যেসব দুর্ঘটনার খবর প্রকাশিত হয় তার বাইরেও অনেক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষত প্রত্যন্ত এলাকায় যেসব সড়ক-দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় তার সব কটির খবর সংগ্রহ করা এবং সংবাদপত্রে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। বস্তুত, দূরপালস্নার সড়ক পথে এবং বিশেষত হাইওয়েতে আর রাজধানী নগরীসহ দেশের বিভিন্ন শহর/বন্দরে যেসব সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় ও জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে থাকে, প্রধানত সেসবের খবর সংবাদপত্রে ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যমে প্রচার পেয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ও ছোট-বড় সড়কপথে প্রায় প্রতিদিন যেমন দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে তেমনি অনেক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। শুধু দূরপালস্নার পথে ও হাইওয়েতে এবং দেশের বিভিন্ন শহর-বন্দরে নয় রাজধানীতে সংঘটিত হচ্ছে মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা। নগরীর অভ্যন্তরীণ রাজপথ তো বটেই, এমনকি রাজধানীর বুক চিরে বহিরাঞ্চলে চলে যাওয়া এয়ারপোর্ট রোড বা বিমানবন্দরের সুবিস্তৃত ও সুমসৃণ পথে সংঘটিত হচ্ছে দুর্ঘটনা। সারাদেশে জরিপ ও পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, নানা কারণে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা যেমন বিপুল, তেমনি এসব দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আহত, নিহত ও পঙ্গু হয়ে পড়া লোকের সংখ্যা হাজার হাজার। দেশে প্রতি বছর এই যে হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান, আহত হন পঙ্গু হয়ে শেষজীবন কাটানো তার জন্য তাদের উত্তরাধিকাররা ক্ষতিপূরণের খুব কম টাকাই পান। এদিকে চালকের বা দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সাজাও হয় কম। প্রকৃতপক্ষে, সড়ক দুর্ঘটনা শুধু জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে না, দুর্ঘটনায় আকস্মিক ও অকাল মৃতু্যর শিকার হওয়ার দরুন অথবা মৃতু্যর হাত থেকে আপাত রেহাই পেলেও আহত ও পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে তাদের এবং তাদের পরিবার-পরিজন ও উত্তরাধিকারীদের জন্য বিরাট অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। অনেক পরিবার চিরকালের জন্য পঙ্গু ও নিঃস্ব হয়ে পড়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহতদের আত্মীয় ও উত্তরাধিকারীরা নানা পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ ও বিমার টাকা ইত্যাদি পায় না বলে একেবারে পথে বসে যায়। জরিপ ও পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, বিভিন্ন সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হতভাগ্য ব্যক্তিদের উত্তরাধিকারীদের মতো, দেশের বিভিন্ন স্থানে যারা সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন তাদের উত্তরাধিকারীরা বঞ্চনার শিকার।

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত, আহত ও পঙ্গুদের হতভাগ্য উত্তরাধিকারীদের দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ তথা বিমার টাকা পাওয়ার চেয়ে শতগুণ সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো আদৌ তেমন পরিস্থিতির শিকার না হওয়া অর্থাৎ কারও সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত না হওয়া, ও পঙ্গু হয়ে পড়ার মতো দুর্ভাগ্যের শিকার না হওয়া। দৈব-দুর্ঘটনার ওপর মানুষের কোনো হাত না থাক।

মহাসড়কের পাশে কয়েকটি ট্রমা সেন্টার নির্মিত হলেও এগুলো আহতদের যথাযথ সেবা দিতে পারছে না। ফলে মফস্বল এলাকা থেকে বড় শহর বা রাজধানীতে যাওয়ার পথেই আহত অনেকের প্রাণহানি ঘটছে। অভিযুক্ত আসামিদের ৮৩ ভাগ সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় জড়িত চালকদের শনাক্ত করা এখন সহজ হয়ে এলেও গত পাঁচ বছরে আসামি গ্রেফতারের হার বাড়েনি। ২০১৩ সালে সারা দেশে চার শতাধিক থানায় সড়ক দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত ২ হাজার ২৯টি মামলা করা হয়। আসামি করা হয় ২ হাজার ৫৭ জনকে। তবে পুলিশ মাত্র ৩৫২ জনকে গ্রেফতার করেছে। বাকি ১ হাজার ৭০৫ জন রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অর্থাৎ, অভিযুক্তদের মাত্র ১৭ ভাগকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অধরা প্রায় ৮৩ ভাগ। দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট ও পুলিশ প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। নথিপত্রে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বেশিরভাগই গাড়ির চালক। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৮ সালে সারা দেশের বিভিন্ন থানায় সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলা হয় ৪ হাজার ৪২৬টি। আসামি করা হয় ৪ হাজার ৪৩৬ জনকে। এর মধ্যে ১৫৬ জন ছাড়া বাকি ৪ হাজার ২৮০ জন ছিল গাড়ির চালক এবং তাদের বেশিরভাগই ছিল বাস ও ট্রাকের।

সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক পরিবার সর্বহারা । হাজারো মানুষ অসহায়ভাবে বেঁচে আছেন । একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের কান্না – কথাটি শুধু মুখে মুখে উচ্চারণ করলে হবেনা । এটি উপলব্ধি করে রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ।

উদাহরণ স্বরূপ আমি নিজে গত ২৫ জুলাই ২০২২ সোমবার রাত সাড়ে এগারোটায় রাজধানীর সাইন্সল্যাবের মোড়ে মাইক্রোবাস এর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এসেছি। আমার এই দূর্ঘটনা অবস্থায় পথচারী লোকজন বলেছে আমি মৃত্যু। ” রাখে আল্লাহ মারে কে ” আলহামদুলিল্লাহ আমার পরিবার পরিজনসহ সকলের দোয়ায় মহান আল্লাহ তায়ালা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। হাসপাতালে একাধারে ৯ নয়দিন চিকিৎসা নিয়ে বাসায় যখন আসলাম তার দুদিন পরে আমার অবস্থা হঠাৎ করে খারাপ হয়ে যায়। আবারও হাসপাতালে গেলাম, যাবার পর দেখা পরীক্ষা করে আমার দুর্ঘটনা জায়গায় ইনফেকশন হয়েছে । এমতাবস্থায় অপারেশন লাগবে । ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক সীদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে । এরমধ্যে গত ১৩ আগস্ট ২০২২ রাত ১ : ২৫ মিনিটে আমার মাংসপেশিতে অস্ত্রোপ্রচার করা হয়েছে । এতে কিছুটা ঝুঁকিমুক্ত হলাম। এখন দ্বিতীয় অপারেশন হাড় জোড়া লাগানো সেই অস্ত্রোপ্রচারের অপেক্ষায় আছি । এরমধ্যে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ডায়াবেটিস। এই নতুন আরেকটি বিষয় আমাকে রক্ষা দিচ্ছে না। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আসতেছে বিধায় সেই অপারেশন করাতে সমস্যা সম্মুখীন। পরিশেষে সীদ্ধান্তটা নিলাম যদি ডায়াবেটিস আজকাল এরমধ্যে নিয়ন্ত্রণে না আসে তাহলে ইনসোলেন্স নিয়ে অপারেশন করা হবে । সকলের নিকট দোয়া চাই, আমার জন্য দোয়া করবেন যাতে করে মহান আল্লাহ তায়ালা আমাকে পূণরায় পরিপূর্ণ ভাবে সুস্থ করে আবারও সকলের মাঝে আমাকে ফিরে দিন সেই দোয়া চাই । এমতাবস্থায় বিগত সময়ে যাহারা এই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে তাহাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করি সেই সাথে যাহারা আমার মত চিকিৎসাধীন তাহাদের সুস্থতা কামনা করছি। মহান আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের সকলকে এই সমস্ত সড়ক দুর্ঘটনা অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখেন আমিন ।

দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে গত বছর ৩৪০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসবের মধ্যে ১৬৯টি দুর্ঘটনার নেপথ্যে ছিল বাসচালকরা। অর্থাৎ, রাজধানীর ৪৯ ভাগ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ছিল বাসচালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো। পুলিশ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ৩৪০ আসামির মধ্যে মাত্র ১৯৬ জনকে গ্রেফতার করতে পেরেছে পুলিশ। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ২০১৩ সালে ৩৪০টি সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে ১৬৯টি দুর্ঘটনার নেপথ্যে ছিল বাসচালকরা।

চালকদের ওপর করা জরিপে দেখা গেছে, বাসের চালকরাই সবচেয়ে বেশি (৪৮ দশমিক ৭ ভাগ) দুর্ঘটনা ঘটান। চালকদের ৮১ ভাগ প্রশিক্ষণ ছাড়া, শুধু ওস্তাদের কাছ থেকে শিখেই হেল্পার থেকে চালক বনে যান। চালকদের ৪৮ ভাগই মাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষিত। চালকদের সবাই অধিক রোজগারের জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম করেন। জরিপে দেখা গেছে, ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা গাড়ি চালান ৪৮ ভাগ চালক। ১৯ ভাগ চালক গাড়ি চালান ১৩ থেকে ১৬ ঘণ্টা। আবার এসব চালকের গ্রামে বাড়ি থাকলেও ৪১ ভাগই ঘুমান গাড়িতে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে দেশে ৩ হাজার ২৫৬টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৭৭০ যাত্রী, আহত হয়েছেন ১০ হাজার ২৭৮। এর মধ্যে হাত-পা বা অন্য কোনো অঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন ৯২৩। চালক ও পরিবহন শ্রমিক নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটি দেশের জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ পর্যবেক্ষণ করে এ দাবি করে।

আসলে একটি সত্য কথা তিতা হলেও তা মানতে হয়। চাইলেই সব পাওয়া যায় না। অর্থলোভে, ক্ষমতার বলে, রাজনীতির অমসৃণ সড়কে ৫ ইঞ্চি পিচ্ ঢালাই যদি আধা ইঞ্চি দেওয়া হয়। অযোগ্যদের যদি গাড়ি চালনার লাইসেন্স দেওয়া হয়, তা হলে যা ঘটার তাই ঘটছে এবং ঘটবে। গোটা জাতিই যেন সড়ক দুর্ঘটনার মৃত্যুফাঁদে পড়ে এক আতঙ্কিত সমাজের মধ্যে বসবাস করছে। মন্ত্রী-সচিবদের এই নিয়ে ভাববার কথা নয়। তারা তো নিরাপদ দূরত্বে থেকে রক্ষী নিয়ে পথ চলেন। কিন্তু সমস্যা যত আমজনতার। তাই আসুন, সবাই সতর্ক হই এবং অন্তত এই একটি বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তুলি।

চলমান চিত্রে…. ‌।।


লেখকঃ বিশেষ প্রতিনিধি নয়াদেশঃ |√| প্রকাশক বাংলাদেশ জ্ঞান সৃজনশীল |√| ও মানবাধিকার সংগঠক |√|