সিলেটে বন্যার কোথাও উন্নতি, কোথাও অবনতি, দুর্ভোগ বাড়ছেই

প্রকাশিত: ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ, মে ২২, ২০২২

সিলেটে বন্যার কোথাও উন্নতি, কোথাও অবনতি, দুর্ভোগ বাড়ছেই

সিলেটের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সিলেট নগর ও জেলায় বন্যার পানি কোথাও বেড়েছে, আবার কোথাও অল্প কমেছে। গত শুক্রবার রাতে ভেঙ্গে যাওয়া জকিগঞ্জের অমলশিদ এলাকায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর উৎসস্থলের বাঁধ দিয়ে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে। ওদিকে, নতুন করে ভাটির দিকে চাপ বেড়েছে পানির।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেট এবং বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, সুরমা নদীতে পানি কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে কুশিয়ারা নদীতে পানি বাড়ছে। তবে সুরমা নদীতে পানি কমলেও এখনো পানি বিপদসীমার ওপর দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে।

উজানে এই সুরমার পানি কিছুটা কমতির দিকে থাকলেও এ পানি নেমে যাওয়ার পথ ভাটির দিকে চাপ বাড়ছে।

এদিকে, তিন নদীর মোহনায় বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় জকিগঞ্জে ২৯৩টি গ্রামের মধ্যে দুই শতাধিক গ্রামই এখন প্লাবিত। সব মিলিয়ে উপজেলার প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের মধ্যে অন্তত ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষ পানিবন্দী। প্লাবিত এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির জন্য মানুষ হাহাকার করছে।

জকিগঞ্জ ছাড়াও পানি বেড়েছে বিশ্বনাথ ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায়। গত দুই দিনে এসব উপজেলায় অন্তত ১৫ থেকে ২০টি গ্রাম নতুনভাবে প্লাবিত হয়েছে। জেলার অন্যান্য উপজেলার কোথাও পানি কমেছে, কোথাও পানি বাড়ছে। বানভাসি মানুষেরা জানিয়েছেন, কিছু এলাকায় পানি কমলেও তার পরিমাণ খুব কম। ফলে ঘরবাড়ি থেকে পানি এখনো সরেনি। এ অবস্থায় ভোগান্তি ঠিক আগের মতোই আছে।

গত ৯দিন ধরে সিলেটে ভারতের উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নামছে। পাশাপাশি বিভাগজুড়ে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এতে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সিলেটের প্রধান দুটি নদী সুরমা, কুশিয়ারাসহ অন্য নদ-নদীর পানি উপচে একের পর এক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে ফসলের ক্ষেত, ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। অনেকের বাসাবাড়িতেও পানি ঢুকেছে। বন্যার কারণে ইতিমধ্যে সিলেট জেলার বহু পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে।

এদিকে, এবারের বন্যা ভাবাচ্ছে সবাইকে। ২০০৪ সালে সর্বশেষ সিলেটে বড় ধরনের বন্যা হলেও তখন নগরীতে ক্ষয়ক্ষতি কম ছিল। এবারের চলমান দুর্যোগকে ১৯৮৬ সালের চেয়েও ব্যাপক বলে কেউ কেউ মনে করছেন। নগরীতে এমন বন্যা আগে দেখা যায়নি। এবারের নজিরবিহীন বন্যা ও জলাবদ্ধতার জন্য সুরমা নদীর নাব্য সংকট দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা।

বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনও দ্রুততার সঙ্গে সুরমা নদী খননের কথা বলেছেন। পরিবেশবাদীরাও দীর্ঘদিন ধরে সুরমা খননের দাবি করে আসছেন।

এ অবস্থায় পানি উন্নয়ন বোর্ডও বলছে, নদী খননের বিকল্প নেই। এ অঞ্চলের নদীগুলো খননের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) এবং সেন্টার ফল এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওলজিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) কাজ শুরু করেছে। তাদের সমীক্ষার পর নদী খননের প্রকল্প নেওয়া হবে। সিলেটে পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এসএম শহিদুল ইসলাম এমনটাই জানিয়েছেন।




এদিকে সিলেট নগরীতে বন্যার পানি কমলেও মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও বিশুদ্ধ খাবার পানি না থাকায় এ দূর্ভোগ আরো বেড়েই চলছে। এ অবস্থায় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত রোগ। বেড়েছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে নগর ছাড়তে শুরু করেছেন। শুক্র ও শনিবার নগরের প্লাবিত এলাকার অনেক বাসিন্দাকে নগর ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে দেখা যায়।

শনিবার বিকেলে সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ডিভিশন-২ এর অধীস্থ নগরের উপশহরের বিভিন্ন ব্লক, তেররতন, সুবহানীঘাট, যতরপুর, মেন্দিবাগ, চালিবন্দর, মাছিমপুর, ছড়ারপাড় এলাকা তলিয়ে আছে। উপশহরে অবস্থিত বিদ্যুতের সাব স্টেশনও গত পাঁচ দিন ধরে পানির নিচে রয়েছে। এজন্য এলাকাগুলো এখনো অন্ধকারে নিমজ্জিত।

নগরীতে পানি কমার সঙ্গে বন্যাদুর্গত এলাকায় দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থাও। এতে করে অসুখ, বিসুখে ভুগছেন অনেকেই। কোথাও শুধু খাদ্য সংকট, কোথাও সুপেয় পানি ও খাবারের। হাজারো বাসা-বাড়িতে নেই গ্যাস। এ অবস্থায় অনেকেই মানবেতর দিন পার করছেন। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছে নগরীর অভিজাত শাহজালাল উপশহর এলাকার বাসিন্দারা। ৮দিন ধরে গোটা উপশহরেই পানি। পাশের যতরপুর থেকে মীরারাজার পর্যন্ত পানি। সুবহানীঘাটের সব এলাকায় পানি ঢুকেছে। এসব এলাকার অনেকেই বাসা-বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। এখনো কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি। একই অবস্থায় নদী তীরবর্তী এলাকাগুলো। রাত হলেই আতঙ্ক বাড়ে মানুষের। নগরীর মাছিমপুর, ছড়ারপাড় এলাকার লোকজনও পানিবন্দি। ওই এলাকায়ও তিনটি আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবার খেয়ে দিন যাপন করছেন বন্যাকবলিত মানুষ।

উপশহরে গিয়ে দেখা যায়, গত সোমবার থেকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে এ, বি, সি, ডি, ব্লকে। সাথে বন্ধ রয়েছে গ্যাস সংযোগও। যেসব বাসা-বাড়ি এবং দোকানপাটে বন্যার পানি প্রবেশ করেছিল, তা ধোয়ামোছা করছেন ভুক্তভোগীরা। তবে বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে তাদেরকে বেগ পেতে হচ্ছে। ওই এলাকার বাসিন্দারা জানান, অনেক ব্লকে এখনো কোমর সমান পানি, ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। পানির মটর তলিয়ে গেছে, তাই পানি তুলতে পারছেন না। কিছু কিছু জায়গায় মটর ঠিক থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় পানি তোলা যাচ্ছে না। অন্তত দেড় ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে ট্যাংকি ভরে পানি মজুদ করা যেত। যারা কষ্ট করে ২-৩ লিটার পানি এনে দিচ্ছেন তাতে ৭-৮ জনের পরিবারের পানির অভাব মেটানো সম্ভব নয়।

ঘরে জমে থাকা পানি সেচে ধোয়ামোছা করছেন উপশহর ই-ব্লকের বাসিন্দা ইমা বেগম। তিনি জানান, শুক্রবার রাতেই তার ঘর থেকে পানি নেমে গেছে। তারপরও ঘরে প্রচুর পানি আটকে আছে। এসব পানি শনিবার সকাল থেকে সেচে বের করছেন। ঘর পরিষ্কার করে জীবাণুনাশক স্প্রে প্রয়োগ করবেন বলে জানান। সি ব্লকের বাসিন্দা ফাতেহা বেগম জানান, পাঁচদিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই। বাসার রিজার্ভ ট্যাংকের পানি শেষ। বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও কখন বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হবে জানি না। ফলে কখন বাসার পানির সমস্যা দূর হবে, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে মহানগর পুলিশের সহযোগীতায় ‘মানবিক টিম’ নামক সংগঠনের সদস্যরা উপশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসা-বাড়িতে বোতলজাত খাবার পানি ভ্যানে করে সরবরাহ করছেন। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিলেট রেঞ্জ পুলিশের এসপি মো. জেদান আল মুছা, এসএমপি’র মিডিয়া শাখার শফি আহমদ পিপিএম। এছাড়া উপশহরে স্থানীয় কাউন্সিলর এডভোকেট ছালেহ আহমদ সেলিম বিভিন্ন বাসা বাড়িতে বোতলজাত পানি দিচ্ছেন। পাশাপশি রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্যরাও নেমেছেন সেবা দিতে।


 

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট