স্বাধীনতা দিবস ও সূবর্ণজয়ন্তী : মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ও গান : গর্ব ও হতাশার ৫০ বছর!

প্রকাশিত: ১:৪৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৬, ২০২২

স্বাধীনতা দিবস ও সূবর্ণজয়ন্তী : মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ও গান : গর্ব ও হতাশার ৫০ বছর!

 |√| মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার |√|

সমাজ সংস্কৃতিতে মহান স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব মুক্তিযুদ্ধের অবদান – অগ্নিঝরা মার্চ ফিরে দেখা স্বাধীনতার মাস- ধারাবাহিক পর্ব-(( ১৪/ চৌদ্দ -))

মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ও দেশাত্মবোধক গানের ভূমিকা ব্যাপক৷ কিন্তু এ ধরনের চলচ্চিত্র এবং গান যেন রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা এবং বিশেষ দিবস আর বর্ষনির্ভর হয়ে পড়েছে৷

সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রীয় অনুদান ছাড়া মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র খুব কমই হয়েছে৷ কোনো নির্মাতা-প্রযোজক ব্যক্তি উদ্যোগে যদি এগিয়েও আসেন, তারা সব জায়গা থেকে সমান সাড়া পান না৷ প্রচার, পুরস্কারের স্বীকৃতি কিংবা প্রাপ্য অর্থ প্রাপ্তি সব ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য৷

দেশাত্মবোধক গানও অনেকটাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা-নির্ভর ৷ মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে গত দেড় বছরে বেশকিছু দেশের গান তৈরি হয়েছে৷ তবে এ ক্ষেত্রেও ‘বেসরকারি উদ্যোগ’ হাতেগোনা৷

সরকারি অর্থায়নেই বেশি মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মোট চলচ্চিত্রের বেশির ভাগই তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রীয় অনুদানে৷ যদিও সত্তর দশকের সব মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রই হতো বেসরকারি প্রযোজনায়৷ কারণ, তখনও সরকারি অনুদান চালু হয়নি৷ সেই সময়ের কয়েকটি কালজয়ী নির্মাণের তালিকায় রয়েছে মাসুদ পারভেজের প্রযোজনায় চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘ওরা ১১ জন’ (১৯৭২) ও কাজী সবুজ প্রযোজিত ‘সংগ্রাম’ (১৯৭৪), রমলা সাহা প্রযোজিত সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ (১৯৭২), মমতাজ আলীর ‘রক্তাক্ত বাংলা’ (১৯৭২), আনন্দ’র ‘বাঘা বাঙালি’ (১৯৭২), বাংলাদেশ ফিল্মস ইন্টারন্যাশনাল প্রযোজিত আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩), খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’ (১৯৭৩), ফিল্ম ইন্টারন্যাশনাল প্রযোজিত আলমগীর কুমকুমের ‘আমার জন্মভূমি’ (১৯৭৩), নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’ (১৯৭৪), আনোয়ার আশরাফ ও শাজীদা শামীমের প্রযোজনায় হারুনর রশিদ পরিচালিত ‘মেঘের অনেক রঙ’ (১৯৭৬)৷

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ৫০টির মতো ছবি তৈরি হয়েছে৷ ৫০ বছরে সংখ্যাটাকে খুব কম মনে করেন না ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর৷ তিনি অ্যামেরিকা থেকে ডয়েচে ভেলেকে বলেন,‘‘আপাতদৃষ্টিতে সংখ্যাটি কম মনে হলেও যদি আমরা একটু ভেবে দেখি– এ দেশে বছরে যত ছবি তৈরি হয়, যত সিনেমা হল অবশিষ্ট আছে, যত দর্শক রয়েছে; সেখানে ৫০ বছরে ৫০টি ছবি খুব একটা কম নয়৷ একটু ব্যাখ্যা করলে দেখা যাবে, ছবিগুলো কিন্তু ১৯৭২ থেকে শুরু হয়ে ধারাবাহিকভাবে এ পর্যন্ত হয়েছে সেরকম নয়৷ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ছবি হয়েছে থেমে থেমে৷ সেক্ষেত্রে ৫০টি ছবিকে খুব একটা কম বলা যাবে না৷’’

মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের ‘বন্ধ্যাত্বের’ সময়:-

বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ফিল্ম অফিসার মো. ফখরুল আলম প্রতিবেদক মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদারকে বলেন, সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বই দশকের বড় একটা সময় পর্যন্ত শহীদুল হক খানের ‘কলমীলতা’ (১৯৮১) বাদে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কোনো ছবি হয়নি৷ নব্বই দশকে বেসরকারিভাবে নির্মিত ছবির তালিকায় রয়েছে অনুপম চিত্রয়ন ট্রাস্ট প্রযোজিত নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘একাত্তরের যীশু’ (১৯৯৩), কিনো-আই ফিল্মস প্রযোজিত তানভীর মোকাম্মেলের ‘নদীর নাম মধুমতি’ (১৯৯৫), অডিও ভিশন প্রযোজিত তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫) ও ‘মুক্তির কথা’ (১৯৯৯), খান আতাউর রহমানের ‘এখনো অনেক রাত’ (১৯৯৭)৷

ফিল্ম আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, একবিংশ শতাব্দীতে বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধনির্ভর ছবির তালিকায় রয়েছে ক্যাথরিন মাসুদ প্রযোজিত তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ (২০০২), নক্ষত্র চলচ্চিত্রের প্রযোজনায় তৌকীর আহমেদের ‘জয়যাত্রা’ (২০০৪), ব্যক্তি প্রযোজনায় মোরশেদুল ইসলামের ‘খেলাঘর’ (২০০৬), ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড প্রযোজিত হুমায়ুন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’ (২০০৪), চাষী নজরুল ইসলামের ‘মেঘের পরে মেঘ’ (২০০৪) ও ‘ধ্রুবতারা’ (২০০৬), আবুল খায়ের প্রযোজিত মোরশেদুল ইসলামের ‘অনিল বাগচীর একদিন’ (২০১৫)৷

রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধ নির্ভর ছবির তালিকায় উল্লেখযোগ্য– হারুনর রশিদের ‘আমরা তোমাদের ভুলবো না’ (১৯৯৩), হুমায়ুন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪), চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ (১৯৯৭), তানভীর মোকাম্মেলের ‘রাবেয়া’ (২০০৮) ও ‘জীবনঢুলী’ (২০১৩), নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘গেরিলা’ (২০১১), মোরশেদুল ইসলামের ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ (২০১১), জাহিদুর রহিম অঞ্জনের ‘মেঘমল্লার’ (২০১৪), ফাখরুল আরেফিন খানের ‘ভুবন মাঝি’ (২০১৭)৷ আজ মুক্তি পেয়েছে নূরুল আলম আতিকের ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’৷

নির্মাণে অপ্রতুল অনুদান:-:

১৯৭৬-৭৭ অর্থবছর থেকে দেশীয় চলচ্চিত্রে সরকারি অনুদান চালু হয়৷ আগে ছবিপ্রতি ২৫ লাখ টাকার অনুদান দেওয়া হতো৷ ২০১৪ সালের পর থেকে তথ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন শাখায় ৬০-৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিচ্ছে নির্মাতাদের৷ যদিও মুক্তিযুদ্ধনির্ভর ছবি নির্মাণে এই অঙ্ককে যথাযথ মনে করেন না নাসির উদ্দীন ইউসুফ৷ তার পরামর্শ, ‘‘সরকার যেমন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলাদা মন্ত্রণালয় করেছে, সেভাবে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েও ভাবা উচিত৷ মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নিয়ে আলাদা বিবেচনার জন্য মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে৷ মুক্তিযুদ্ধের ছবির জন্য এক কোটি টাকা লাগে, তবে আনুষঙ্গিক মিলিয়ে একটু বেশিও খরচ হয়৷’’


চলচ্চিত্রের দুঃসময়ে দর্শক খরা, অপাত্রে অনুদান:-:

সরকারি অনুদান ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ছবি বেশি নির্মাণ হয় না৷ এমন কেন? মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে অর্থলগ্নিতে প্রযোজকদের অনীহার কারণ কী? ফরিদুর রেজা সাগর মানছেন, মুক্তিযুদ্ধনির্ভর ছবি তৈরির জন্য যে মননশীলতা, আগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতা দরকার, সবক্ষেত্রে সেসব পাওয়া যায় না৷ আবার এসব পাওয়া গেলেও তার প্রতিফলন যে পর্দায় ঘটবে সেরকমও হচ্ছে না৷

মুক্তিযুদ্ধের ছবির মান নিয়ে অসন্তোষের কথা শোনা যায় অনেক বছর ধরে৷ নাসির উদ্দীন ইউসুফের দৃষ্টিতে, ‘‘মূলধারায় মুক্তিযুদ্ধের যেসব ছবি হয়েছে, একদিক দিয়ে এক-দুটি ছাড়া বাকিগুলো আমলে নেওয়ার মতো নয়৷ এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের ছবির প্রতি দর্শকদের আগ্রহ কম৷ যেগুলোতে একাত্তরের বাস্তব চিত্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের পেছনে থাকা স্বপ্নগুলো খুঁজে পাওয়া যায়, তেমন ছবি কিন্তু দর্শকরা দেখে৷ মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকার যথেষ্ট অনুদান দিয়েছে, কিন্তু আমরা সেগুলো বানাতে ব্যর্থ হয়েছি৷’’

প্রেক্ষাগৃহে মুক্তিযুদ্ধনির্ভর ছবির প্রদর্শনীতে দর্শক উপস্থিতি কম থাকে৷ তৌকীর আহমেদ যেমন দর্শকদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ছবির ব্যাপারে আগ্রহ কম দেখেছেন, “আমার প্রথম ছবি ‘জয়যাত্রা’ নিয়ে শুরুতে কিন্তু তেমন সাড়া পাইনি৷ ইউটিউবে বা টিভিতে যখন ফ্রি পেয়েছে, দর্শক তখন দেখেছে৷ কিন্তু সিনেমা হলে এসে সেভাবে দেখেনি৷ আমার মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের কাজগুলোকে দর্শকদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে৷ তাদেরও এ ধরনের কাজ দেখার জন্য রুচি তৈরি করা এবং দেখে নির্মাতাদের সহযোগিতা করা দরকার৷’’

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সর্বোচ্চ ১৯টি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছে৷ ফরিদুর রেজা সাগর মনে করেন, ‘‘মুক্তিযুদ্ধের ছবি তৈরির জন্য মেধা, গবেষণা ও অর্থকড়ির ব্যাপার রয়েছে, কারণ, সেই সময়কে তুলে ধরতে হয় এতে৷ মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে পর্দায় আনতে যে পরিমাণ গবেষণা, চেষ্টা, মেধা, দক্ষতা ও পরিশ্রম দরকার, সাধারণ ছবির ক্ষেত্রে ততটা অনেক সময় না-ও লাগতে পারে৷ সেজন্য মেধা তো বটেই, মুক্তিযুদ্ধের ছবি তৈরির জন্য থাকতে হবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা৷’’

(( চলমান_ চিত্রে- পরিশিষ্ট:-))


লেখক:-: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও প্রকাশক বাংলা পোস্ট |√| বিশেষ প্রতিবেদক দৈনিক নয়াদেশ |√| __ ও প্রকাশক বাংলাদেশ জ্ঞান সৃজনশীল প্রকাশনা |√|