সীমাহীন ত্যাগের মাধ্যমে মহানবি ( সাঃ-) শান্তির ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন

প্রকাশিত: ৬:২৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২১

সীমাহীন ত্যাগের মাধ্যমে মহানবি ( সাঃ-) শান্তির ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন

মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার


আজ বুধবার (২০ অক্টোবর) পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। এদিন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর জন্ম ও ওফাত দিবস। জন্ম-ওফাতের স্মৃতিময় দিন আজ ১২ রবিউল আউয়াল। এক হাজার ৪৫১ বছর আগের এই দিনে সৌদি আরবের মক্কা নগরে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) জন্ম নেন। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের একই দিনে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

বাংলাদেশে দিনটি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) নামে পরিচিত। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের পরিবেশে দিবসটি পালন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

সারাবিশ্বের মুসলমানরা এই দিনকে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) হিসেবে পালন করেন। এর আগে করোনা পরিস্থিতির কারণে সেভাবে পালন করা হয়নি। কিন্তু এবার করোনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে তাই সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন আলোকসজ্জ্বায় বর্ণিল করা হয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দল জশনে জুলুস বের করবে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।

বাণীতে তারা বলেন, মহান আল্লাহ আমাদের প্রিয়নবি হজরত মুহাম্মদকে (সা.) এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন শান্তি, মুক্তি, প্রগতি ও সামগ্রিক কল্যাণের জন্য ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ তথা সারা জাহানের রহমত হিসেবে। নবি করিমকে (সা.) বিশ্ববাসীর রহমত হিসেবে আখ্যায়িত করে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতরূপে পাঠিয়েছি’ (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭)। মুহাম্মদ (সা.) এসেছিলেন তওহিদের মহান বাণী নিয়ে। সব ধরনের কুসংস্কার, অন্যায়, অবিচার, পাপাচার ও দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে মানবসত্তার চিরমুক্তির বার্তা বহন করে এনেছিলেন তিনি। বিশ্ববাসীকে তিনি মুক্তি ও শান্তির পথে আসার আহ্বান জানিয়ে অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়েছিলেন ও সত্যের আলো জ্বালিয়েছেন। তিনি বিশ্ব-ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, ন্যায় ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠন ও মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করে বিশ্বে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিয়েছিলেন।

মহানবির জন্মের সময় ও এর আগে গোটা আরব অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। তারা আল্লাহকে ভুলে নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। আরবের সর্বত্র দেখা দিয়েছিল অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা। এ যুগকে বলা হতো আইয়ামে জাহেলিয়াত। তখন মানুষ হানাহানি ও কাটাকাটিতে লিপ্ত ছিল ও মূর্তিপূজা করতো। এই অন্ধকার যুগ থেকে মানবকুলের মুক্তিসহ তাদের আলোর পথ দেখাতে মহান আল্লাহ রসুলুল্লাহকে (সা.) পাঠান এই পৃথিবীতে।


হজরত ইবনে সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যখন তাঁর জন্ম হয়েছিল তখন আমার শরীর থেকে এক জ্যোতি বের হয়েছিল; যাতে শামদেশের অট্টালিকাসমূহ আলোকিত হয়েছিল। ইমাম আহমাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ইরবায বিন সারিয়া কর্তৃক অনুরূপ একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। (মুখতাসারুস সিরাহ)

জগৎ আলো করে প্রিয় নবির শুভাগমনে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনাও ঘটেছিল। যা ছিল নবুওয়তের পূর্বাভাস। তা ছিল-

> তাঁর শুভ জন্মের মুহূর্তে কিসরার প্রাসাদের চৌদ্দটি সৌধচূড়া ভেঙ্গে পড়ে;

> প্রাচীন পারসিক ধর্ম যাজকমন্ডলীর উপাসনাগারগুলোতে যুগ যুগ ধরে প্রজ্জ্বলিত হয়ে আসা অগ্নিকুণ্ডগুলো নিভে যায়;

> বাহিরা পাদ্রীদের সরগম গীর্জাগুলো নিস্তেজ ও নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। ইমাম বায়হাকি, তাবারি ও অন্যান্যরা তা উল্লেখ করেন।

আলেম-ওলামা এবং ঐতিহাসিকদের মতে ঈদে মিলাদুন্নবী

বিশ্ববিখ্যাত সীরাত গ্রন্থসমূহের মধ্যে ‘আত-তানবির ফি মাওলিদিল বাশির আন নাযির’; ইবনে সাদ : আত-তাবাকাতুল কুবরা; ইবনে কাসির : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া; ইবনে ইসহাক : সীরাতে ইবনে হিশাম; কাস্তালানিসহ ঐতিহাসিক সীরাত গ্রন্থের তথ্য ও বিবৃতি থেকে যা জানা যায়; তাহলো-

১. ২য় হিজরির ঐতিহাসিক মুহাদ্দিস আবু মাশার নাজিহ এর মতে, তিনি রবিউল আউয়াল মাসের ২ তারিখ (প্রথম সোমবার) পৃথিবীতে শুভাগমন করেন।

২. হজরত ইবনে আব্বাস এবং যুবাইর ইবনে মুতইম রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সাহাবাদ্বয় বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসের ৮ তারিখ জন্মগ্রহণ করেন। মুহাম্মদ ইবনে যুবাইর ইবনে মুতইম, আল্লামা কাস্তালানি ও যারকানির বর্ণনার এ মতটি অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ গ্রহণ করেছেন। মিলাদের ওপর প্রথম গ্রন্থ রচনাকারী আল্লামা আবুল খাত্তাব ইবনে দেহিয়া (৬৩৩হি.) তার রচিত ‘আত-তানবির ফি মাওলিদিল বাশির আন নাজির’ গ্রন্থেও এ মতটিকে গ্রহণ করেছেন।

৩. তারিখে খুযরি ও রাহমাতুল্লিল আলামীন গ্রন্থদ্বয়ে ৯ রবিউল আউয়াল (ফিলের বছর) সোমবার দিন-রাতের মহাসন্ধিক্ষণে সুবহে সাদেকের সময় জন্মগ্রহণ করেন।

৪. হজরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর পৌত্র মুহাম্মদ ইবনে আলি আল বাকের (১১৪হি.) ও মুহাদ্দিস আমির ইবনে শারাহিল আশ-শাবি (১০৪হি.) বর্ণনায় তিনি ১০ রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেন।

৫. হিজরি ২য় শতাব্দির প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক-এর (১৫১হি.) বণনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ শুভাগমন করেন।

উল্লেখ্য, ইবনে ইসহাক রচিত সীরাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের সব বিষয়গুলো সাধারণত সনদসহ বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ তথ্যটির কোনো সনদ তিনি উল্লেখ করেননি।

৬. হিজরি ৩য় শতকের ঐতিহাসিক যুবাইর ইবনে বাক্কার (২৫৬হি.)-এর মতে, তিনি রমজান মাসে জন্ম গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, যেহেতু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৪০ বৎসর বয়সে রমজান মাসে নবুয়্যতপ্রাপ্ত হন, সেহেতু তিনি অবশ্যই রমজান মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন।

৭. কারো কারো মতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, মহররম, সফর, রবিউস সানি, রজব মাসে জন্ম গ্রহণ করেছেন মর্মে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন।

সর্বোপরি উপমহাদেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমান রবিউল আউয়াল মাস এবং ১২ তারিখকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মমাস ও দিন হিসেবে জানে এবং সর্বাধিক সনদে রচিত রাসুলের জীবনীগ্রন্থ প্রণেতা ইবনে ইসহাক রবিউল আউয়াল মাস এবং ১২ তারিখকে ঈদে মিলাদুন্নবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন, সে হিসেবে এ উপমহাদেশের অধিকাংশ মুমিন মুসলমান ১২ রবিউল আউয়ালকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম তারিখ হিসেবে জানেন।

প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম তারিখ ও মাস নিয়ে মতভেদ থাকলেও তিনি সোমবার সুবহে সাদেকে জন্ম গ্রহণ করেছেন এটি চিরন্তন সত্য। এ ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও বিশ্লেষকদের মতে তিনি রবিউল আউয়াল মাসে জন্ম গ্রহণ করেছেন মর্মে তাদের মতামত তুলে ধরেন।

সুতরাং রবিউল আউয়াল মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য এক মহান মাস। এ মাসের একটি দিন প্রিয় নবির জন্ম উৎসবে আনন্দ নয় বরং মাসজুড়ে প্রিয় নবির আদর্শে নিজেদের রঙিন করে বছরজুড়ে সুন্নাতের আলোকে জীবন পরিচালনার উৎস হোক পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী।

ঈদে মিলাদুন্নবীর মাস, তারিখ নিয়ে যতই মতভেদ থাকুক না কেন; প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শুভাগমন থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত পুরো জীবন হোক মুসলিম উম্মাহর জন্য আদর্শ।

আল্লাহ তাআলা বিশ্ব মানবতার সব ধর্ম বর্ণ গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার জন্য প্রিয় নবির আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর পুরোপুরি অনুসরণ, অনুকরণ এবং বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অটুট বন্ধ বজায় রাখার তাওফিক দান করুন। প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে রহমত দিয়ে ঢেকে দিন। আমিন।


লেখকঃ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও প্রকাশকঃ বাংলা পোস্ট বিডি নিউজ | প্রাবন্ধিক ও, | সদস্য ডিইউজে |


 

  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট