মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপলব্ধী ও রক্তে ফোটা গোলাপ

প্রকাশিত: ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩, ২০২১

মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপলব্ধী ও রক্তে ফোটা গোলাপ


মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার


এক লক্ষ্যহীন ব্যয়বহুল যুদ্ধ শেষকরে “বীরদর্পে” পলায়নের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে বলেছেন, আফগানিস্থান থেকে সৈন্য ফেরত নেয়ার মধ্য দিয়ে তিনি অঙ্গীকারপূর্ণ করেছেন এবং নতুনকরে আর কোন দেশের সাথে বড় কোন যুদ্ধে জড়াবেন না। তার এই উক্তি বা বোধোদয়কে নানাভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। প্রথমত . আফগানিস্থান থেকে সৈন্য ফেরত না নেয়ার কোন বিকল্প কি তার কাছে ছিল? কথাটা একারণে যে সাম্প্রতিক মার্কিন অর্থনীতির পরিস্থিতি যদি বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে দেশটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে ।করোনা,অকারণ যুদ্ধব্যয় দেশটির অর্থনীতিকে কার্যত নাজুক করে দিয়েছে। বিগত প্রেসিডেন্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় মার্কিন সাহায্য বন্ধ করে দেয়ার পর বর্তমান প্রেসিডেন্ট তা চালু করেনি। অর্থাৎ এই অর্থ খরচ করার সামর্থ তারা হারিয়ে ফেলেছে।সাধারণত সাম্রাজ্যবাদ কোন দেশে যুদ্ধ পরিচালনা বা আগ্রাসন পরিচালনা করে তার অর্থনৈতিক সুবিধালাভের জন্য ।এ্যাডাম স্মীতের ভাষায় নয়া সাম্রাজ্য স্থাপনের নিমিত্তে।অাফগান যুদ্ধ থেকে সে রকম অনেক প্রাপ্তির আশায় হয়ত তারা বুক বেধেছিল বাস্তবে সে পরিস্থিতিই তারা তৈরি করতে পারেনি। সুতরাং“গণতন্ত্র রফতানীর“ নামে যে মওকা লুটতে চেয়েছিল সেটি হয়নি প্রবল প্রতিরোধের কারণে ।অন্যদিকে যে দেশের জনগণ এখন প্রচন্ড সংকটের মুখে রয়েছে তাদের অর্থ খরচ করে নিজ দেশের সৈনিকদের লাশের সংখ্যা বাড়ার মতঝুঁকি বাইডেন কেন অন্য কেউ নিত বলে মনে করার কোন কারণ নেই । এছাড়াও ভিন্ন বাস্তবতা হচ্ছে ,শুধু এ অঞ্চলে নয় বিভিন্ন দেশে যেভাবে মার্কিন বিরোধী জোট একাট্টা হচ্ছে তাতে কেবলমাত্র ইহুদী লবীর উপর ভরসা করে অজনপ্রিয় যুদ্ধে জড়াবার বা ঝুঁকি নেয়াকে সংগত কারণেই অর্থহীন মনে হয়ে থাকতে পারে। সে বিবেচনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে বাস্তবতার বিবরণ দিয়েছেন তাকে বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় নতুন প্রেক্ষাপটে দেখাই বাঞ্চনীয়। বলা যায় একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গঠনের উপযোগী বাস্তবতার দিকে এগুচ্ছে।

মূলত একথাই সত্যি যে সাম্রাজ্যবাদ একবার হাত গুটালে আর তার সম্প্রসারণ প্রায় অসম্ভব। এর কারণ বহুবিধ। সবচেয়ে বড় কথা প্রতিটি পরাজয় বাপশ্চাদাপসরণের মধ্যে এমন কিছু দুর্গন্ধযুক্ত ‍বিষয় লুকিয়ে তাকে যা অন্যদের সতর্ক করে ।এই ধরুন আফগানিস্থানের কথা। সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে সব মার্কিনীদের নিয়ে আসা যায়নি। যাদের আনা যায়নি তারা কারা? তারা হচ্ছে মূলত সেখানে যেসব বেসামরিক মার্কিন নাগরিক কাজ করেছে তারা। যারা মার্কিনীদের সহায়তা করেছে তারাও পড়ে রয়েছে।এমনটি ঘটেছিল ভিয়েতনামে এবং অন্য দেশগুলোতেও। সাধারণভাবে এমনটাই ঘটে।যখন পালাবার সময় হয় তখন “চাচা আপন প্রাণ বাঁচা” ভাব।আসলে এটি একটি নিদারুন সত্যকে প্রতিভাত করে যে একদিকে দালালদের কোন অভিভাবক নেই তারা ছিন্নমূল ।অন্যদিকে দখলদাররা যে আসলে দায়িত্বহীন সে কথাই প্রতীয়মাণ হয়। এই নির্মম সত্য মূলত দেশে দেশে দালাল সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরিকরে। যদিও একথা অস্বীকার করা যাবেনা ভোগবাদের মোহে বা বারতি পাবার আসায় সব সময়ই কিছু অপাংতেয় ক্ষমতা এবং তার আশপাশে ঘুর ঘুর করে । সে যাই হোক,একথাই সত্যি যে দুনিয়াজোড়া সাম্রাজ্যবাদের দিন শেষ অথবা শেষের পথে।এর মূলে রয়েছে প্রতিরোধ।মানুষের কাছে পরিষ্কার যে তন্ত্রমন্ত্র রফতানী যোগ্য পণ্য নয় এবং এসব কথা আসলে উদ্দেশ্য প্রসূত । খৈ ছিটালে কাকের অভাব হয়না এ প্রবাদ এখন মিলিয়ে যাচ্ছে । সময়ের পরিবর্তনে মানুষের অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন এসেছে আসতে শুরু করেছে । মানুষের মেধা মনণেও নানা পরিবর্তন স্থান করে নিচ্ছে।আসলে গদবাধা বুলি বমন বুদ্ধীজৈবিকতা পরজীবি প্রবণতার দেয়াল ভাংগতে শুরু করেছে । মানুষ তার মুক্তির দূত হিসেবে পরাশক্তিকে ভাবতে ভুলতে শুরু করেছে । এর অন্যতম কারণ তাদের রুচি বোধ। এটা বোধহয় অনেকটা নিশ্চিতকরেই বলা যায় পরাশক্তি তাদের লালসা বাসনা পূরণ করতেই পোষ্য পালন করে। এদিক ওদিক হলেই ছুড়ে ফেলে দেয় । বস্তুত এই ছুড়ে ফেলে দেয়ারা একবারে হারিয়ে যায় তাবোধহয় নয় । তারাও অভিজ্ঞতা কাজে লাগায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‍নতুনকরে যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ার যে ঘোষণা দিয়েছেন এই ঘোষণাকে কার্যত তার একার মনেকরার কোন কারণ নেই বরং এই ঘোষণায় তার সব মিত্র না থাকলেও প্রধান প্রধান মিত্রের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যাবে না ।

বস্তুত একটি আগ্রাসন মুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলা না গেলে বাসযোগ্য করার কোন উপায় নেই । এই আগ্রাসন কেবলমাত্র রাজনৈতিক অর্থনৈতিক নয় বরং সকল প্রকার সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মুক্ত থাকাও জরুরি ।প্রতিটি দেশের জনগণের চিন্তা চেতনা ভাবনা সংস্কৃতি আলাদা ।তাদেরকে তাদের মত থাকতে দেয়াই যৌক্তিক । অন্যদেশের বানিয়ে দেয়ার কিছুনেই । দীর্ঘ লড়াই করে আফগানীরা সম্ভবত একটি বার্তা বিশ্বকে দিতে সক্ষম হয়েছে যে লড়াই দীর্ঘ হতে পারে তবে বিজয়ের কোন বিকল্প নেই,। বিজয় ঐক্যবদ্ধতারই ।আর সেকারণেই যে আফগানীদের সেদিনও ভারতীয়রা শত্রু বিবেচনা করে পাকিস্থানের সাথে বৈঠক বন্ধ করেছিল এখন তারা নিজেরাই নিজ উদ্যোগে আফগানীদের সাথে বৈঠক করছে । একই বলে ঠেলার নাম বাবাজি । আফগান নেতাদের সাথে বৈঠকে ভারতীয়রা কাশ্মীর প্রসঙ্গে অালোচনা করেছে। সেনিয়ে মন্তব্য না করলেও এটি বুঝতে হবে যে, এই আলোচনার মাধ্যমে তারা মেনে নিয়েছে যে কাশ্মীরের সমস্যার যৌক্তিকতা রয়েছে । আসলে আত্মত্যাগের লড়াই রক্ত কখনো বৃথা যায় না যেতে পারে না । অন্ততঃ মার্কিন প্রেডিডেন্টের যুদ্ধ বিরোধী বক্তব্য সেই সত্যকেই উচ্চকিত করেছে-যুদ্ধ নয় শান্তিই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করতে পারে। আসলে এ হচ্ছে রক্তে ফোটা গোলাপ।

তালেবানের আফগানিস্তান বিজয় ও জো বাইডেন
[১] মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তালেবানদের বিজয়ের জন্য আফগান জনগণকে দায়ী করে বলেছেন, আমরা তাদের প্রতিটি সুযোগ দিয়েছি। আমরা তাদের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করার স্পৃহা জাগাতে পারিনি। কিন্তু আফগান দেশের পতনের জন্য নাগরিকদের দোষারোপ করা ভুল এবং অনৈতিক। বরং তালেবানের আফগানিস্তান বিজয় দেশটির প্রভাবশালীদের সম্মিলিত দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ফল।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র সামরিক কর্মী এবং আফগান রাজনীতিবিদদের। দ্য গার্ডিয়ান, ইনকিলাব।

[২] আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি ১৬ মিলিয়ন ডলার চুরি করে নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ এনেছেন তার একজন রাষ্ট্রদূত। আফগান বাহিনী ও নাগরিকরা তালেবানের মতো আরেকটি সরকারের জন্য যুদ্ধ করতে রাজি ছিল না, যারা তাদের ঠকিয়ে ও শোষণ করে লাগাতারভাবে চুরি, চাঁদাবাজি এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং দেশটিকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। ফলে, তালেবানরা যখন দেশটির রাজধানী কাবুলে প্রবেশ করে, তখন তারা প্রায় কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি।

[৩] আফগানিস্তানে দুর্নীতি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং নিজস্ব নাগরিকদের মধ্যে একটি খোলা বই। ২০২০ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল আফগানিস্তানকে বিশ্বের শীর্ষ ২০ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় স্থান দিয়েছে। মার্কিন সরকারী তহবিল যুদ্ধবাজ এবং অপরাধ সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যাওয়ার ঘটনাগুলি নৈমত্তিক খবরে পরিণত হয়েছিল। জুলাইতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন দাবি করেছিলেন যে, আফগান সেনাবাহিনীর ৩ লাখ সৈন্য রয়েছে। কিন্তু পেন্টাগন জানত যে, সংখ্যাটি বহুগুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। আফগান সামরিক কমান্ডাররা এভাবেই অন্তর্ভূক্তি দেখিয়ে সৈন্যদের জন্য বরাদ্দ করা অতিরিক্ত অর্থ নিজেদের পকেটে ভরতেন। জানুয়ারিতে প্রকাশিত ওয়েস্ট পয়েন্ট এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, আফগান সরকারের প্রকৃত সৈন্য ছিল মাত্র ৯৬ হাজার। এবং কাবুল পতনের সময় এই সৈন্যরা বেতন তো দূরের কথা, এমনকি খাবারও পায়নি বলে জানা গেছে।

[৪] শুধু আফগান সামরিক বাহিনীর অস্তিত্ব শুধুই কাগুজে ছিল তা নয়, মার্কিন সামরিক ঠিকাদারদের মাধ্যমে পেন্টাগন অসাবধানতাবশত তালেবানদেরও অর্থায়ন করেছিল। দ্য নেশনের ২০০৯ সালের একটি প্রতিবেদনে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছিল যে, আফগানিস্তানে পেন্টাগনের লজিস্টিক্স চুক্তির ১০ থেকে ২০ শতাংশ অর্থ তালেবানদের কাছে গিয়েছে।

[৫] তাই আফগানিস্তানের পতনের ব্যর্থতা দায়ভার সাধারণ আফগান নাগরিকদের উপর নেই। আফগানিস্তানের পতন ঘটেছিল কারণ দেশটি থেকে যথাসম্ভব লুটপাট করে নিয়ে আমেরিকান এবং আফগান প্রভাবশালীরা আফগান জনগণকে পিছনে ফেলে পালিয়ে গেছেন।


লেখকঃ নির্বাহী সম্পাদক দৈনিক আপন আলো | সাবেক কাউন্সিলর : বিএফইউজে-বাংলাদেশ | সদস্য ডিইউজে |


  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট