সালথায় গভীর রাতে পরিস্থিতি শান্ত, পুলিশের গুলিতে নিহত হাফেজের দাফন সম্পন্ন

প্রকাশিত: ১:৪৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৬, ২০২১

সালথায় গভীর রাতে পরিস্থিতি শান্ত, পুলিশের গুলিতে নিহত হাফেজের দাফন সম্পন্ন

ফরিদপুরের সালথায় পুলিশের গুলি ও টিয়ার সেল বর্ষণের পর গভীর রাতে পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশের গুলিতে একজন হাফেজ নিহত হয়েছেন। ওই মাদরাসাছাত্র নিহতের সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামান জানিয়েছেন, হামলার সময় র‌্যাব ও পুলিশের আটজন সদস্য আহত হয়েছেন। ঘটনার সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করতে সিআইডির ক্রামই টিম কাজ শুরু করেছে। এছাড়া হামলার ঘটনায় অংশ নিয়েও অনেকে গুলিবিদ্ধ ও আহত হয়েছেন যাদের পরিচয় জানা যায়নি।

এদিকে, সোমবার সন্ধ্যা হতে সারারাতের তাণ্ডবের পর মঙ্গলবার সকালে সালথা উপজেলা সদরে যেয়ে দেখা গেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ভবনের বিভিন্ন সরকারি অফিস ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে উপজেলা ত্রাণের গুদাম ও কৃষি অফিস।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবন ও উপজেলা চেয়ারম্যানের বাসভবনেও ভাংচুর করা হয়েছে। দুটি বিলাসবহুল সরকারি ও দুটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সাতটি মোটরসাইকেল ভাংচুর করা হয়েছে। দুটি মোটরসাইকেল হামলাকারীরা নিয়ে গেছে।
হামলার সময় নিহত ওই মাদরাসাছাত্রের নাম হাফেজ মো: জুবায়ের হোসেন (২২)। তিনি সালথা উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের রামকান্তপুর গ্রামের আশরাফ আলী মোল্যার বড় ছেলে। মাদারিপুর জেলার শিবচরের একটি মাদরাসা হতে হাফেজি সম্পন্ন করে হাফেজ জুবায়ের সেখানে চার জামাতে পড়াশুনা করছে। তারা তিন ভাই ও এক বোন।
স্থানীয়রা জানান, আশরাফ আলী মোল্যা ক্ষেতে কৃষি কাজ ও মাদরাসা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেন। গতকাল রাতে জুবায়েরের মৃত্যুর পর মঙ্গলবার সকালে বাড়ির প্রাঙ্গণে হাফেজ জুবায়েরের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানেই তাকে দাফন করা হয়।
সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলা সদরের থানা কার্যালয়, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স, এসি ল্যান্ডের অফিস, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও সরকারি বাসভবন, উপজেলা চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবনে হামলা হয়েছে। এরমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ভবনে অবস্থিত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে হামলা হয়েছে বেশি। পুরো ভবনের নিচতলার অধিকাংশ দরজা জানালা ও আসবাব ভাংচুর করা হয়েছে। কাগজপত্র ও মালামাল তছনছ করা হয়েছে। এসিল্যান্ড অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়ায় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র বিনষ্ট হয়েছে। পাশের মুক্তযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অস্থায়ী কার্যালয়ের জানালা ও সাইনবোর্ড ভাংচুর করা হয়েছে। পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। হামলার শিকার ওই সব স্থানে পুলিশ মোতায়ন রয়েছে। সদরের দোকানপাট অধিকাংশ বন্ধ রয়েছে। এদিকে, এ ঘটনার সময় হামলার সাথে জড়িত কতজন আহত হয়েছেন তা নিদিষ্ট করে জানা যায়নি।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মঙ্গলবার সকালে সালথা থানা কার্যালয় চত্বরে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, গতকাল যে ঘটনা ঘটেছে পুরো ঘটনাটি নিয়ন্ত্রণে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করেছি। যেই ধ্বংসযজ্ঞ তারা চালিয়েছে সেসব আলামত সংগ্রহ করেছে সিআইডির ক্রাইম টিম। মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধরার চেষ্টায় জড়িতদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। হামলায় পুলিশ ও র‌্যাবের আটজন আহত হয়েছেন। তারা বিভিন্নভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন। সংঘর্ষে জড়িতদের মধ্যে একজন মারা গেছেন এবং চারজন আহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, ঘটনার পরে বিভিন্ন ধরনের গুজব প্রচার করা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণীপেশার লোক এবং পলিটিকাল মতাদর্শের লোক জড় হয়েছে। আমরা বিষয়টি যাচাইবাছাই করে তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নেয়া হচ্ছে। পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনতে পর্যাপ্ত সংখ্যক গুলিবর্ষণ করতে হয়েছে। থানা পুলিশ ৫৫২ রাউন্ড রাবার বুলেট, টিয়ার সেল ব্যবহার করেছি। লেট বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছে। সর্বোপরি আমরা শেষ মুহূর্তে চায়না রাইফেল ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছি।

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসিব সরকার এ ব্যাপারে বলেন, সম্প্রতি তিনি করোনা আক্রান্ত। ঘটনার সময় তিনি সরকারি বাসভবনে ছিলেন না। তিনি বলেন, ফেসবুক ও স্থানীয় বিভিন্ন লোকজন গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, পুলিশ এবং প্রশাসন ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করছে। তারা একজন হুজুরকে ধরে নিয়ে গেছে। তারা পুলিশ এবং উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে দিতে উপজেলা অফিসের দিকে আসতে থাকে।
তিনি বলেন, ঘটনাটি জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করলে ফরিদপুর ছাড়াও আশপাশের জেলা হতে পুলিশ ফোর্স আসে। কিন্তু উত্তেজিত জনতার সংখ্যা এত বেশি ছিল যে এই স্বল্পসংখ্যক ফোর্স দিয়ে তাদের ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে তারা উপজেলা অফিস চত্বরে প্রবেশ করে উপজেলা কৃষি অফিসের সমস্ত কিছু তারা ভাংচুর করেছে। আমাদের ল্যাপটপ চুরি করেছে। এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার যে গোডাউন রয়েছে সেটিও তারা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। তারা আমার বাসভবনের দিকে অগ্রসর হলে আমার নিরাপত্তায় যে আনসার রয়েছে তারা গুলি করে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা তাদের উপেক্ষা করে হামলা করে। বাসায় আমার পরিবার ছিল। তারা অতর্কিতভাবে আমার বাসভবনে হামলা চালায়। এখানে গ্যারেজে ইউএনও এবং এসি ল্যান্ডের সরকারি গাড়ি ছিল সে দুটিও জ্বালিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, একপর্যায়ে তারা বাসভবনের সমস্ত কিছু ভাংচুর করে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরমধ্যে উপজেলা ভূমি অফিসের নথিপত্র রেকর্ড সবকিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে বিনষ্ট করেছে। সবচাইতে দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে, উপজেলা চত্বরে যে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে যে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল রয়েছে সেগুলো তারা তাণ্ডবলীলা চালিয়ে ভেঙ্গে ফেলেছে। তারা যে ধরনের স্লোগান ব্যবহার করেছে এ থেকে বোঝা যায়, লকডাউন মূল কারণ নয়। মূল কারণ হচ্ছে, এখানে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এবং ধর্মান্ধ গোষ্ঠী তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করার জন্য এ হামলা করেছে।
এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পাশে এসিল্যান্ড মারুফা সুলতানা হিরামনি বসে ছিলেন। তার কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কিছু বলতে অপারগতা জানান।
এদিকে, ফুকরা বাজার ও সালথার স্থানীয়দের মাঝে এ ঘটনায় বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এসব সম্পত্তি জনগণের টাকায় এমন কথাও বলছেন তারা। পাশাপাশি সরকারি দু’জন কর্মকর্তা জনগণের সাথে জনবান্ধব আচরণ করতেও ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ তাদের।


 

  •