একজন মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর প্রয়ান! লাখো মানুষের কান্নার ঢল, মানুষের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ : সৈয়দ হক

প্রকাশিত: ৬:১৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৩, ২০২১

একজন মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর প্রয়ান! লাখো মানুষের কান্নার ঢল, মানুষের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ : সৈয়দ হক

সৈয়দ হক ( তাহমীম ) : তাঁর সাথে পরিচয়টা মনে হয় ৯১ সালে । এরশাদ ক্ষমতা থেকে পড়ে গেছেন দেশে একটা ইলেকশন হবে সেই সময়টায় । লন্ডন থেকে তিনি দেশে চলে এসেছেন সেটেল্ড হবেন বলে । দলে টিকেট চান দক্ষিণ সুরমা – ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকায় । দলে জায়গা পাচ্ছেন না । সেই সময়টা । দলের নমিনেশন বোর্ডে তখন আব্দুস সামাদ আজাদ , জিল্লুর রহমান , আমীর হোসেন আমু সহ সব জাঁদরেল নেতারা । নমিনেশন বোর্ডে সামাদ আজাদ তাঁকে প্রশ্ন করেন ( শুনা কথা ) সিলেটে তো জানি এক সামাদ । ফেঞ্চুগঞ্জে আবার আপনি নতুন সামাদ । সে নির্বাচনে তিনি নমিনেশন পান নি । নৌকার প্রতীক পান গোল্ড কাপ আতিক। তিনি স্বতন্ত্র দাঁড়ান । ৯১ তে দল আর নৌকা হেরে যায় জাতীয়ভাবে । তাঁর আসনে জিতেন জাতীয় পার্টির মুকিত খান । তবে তিনি হাল ছাড়েন নি । ইচ্ছা করলেই জার্সি বদল করতে পারতেন । করেন নি । বলেছেন ছাত্রলীগ করে এসেছি দল করলে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামীলীগ করবো । তখন সামাদ আজাদ সাহেবের সাথে আমাদের পারিবারিক সখ্যতা । সামাদ আজাদ বিরোধী দলীয় উপনেতা হওয়ার দিন আমরা সবাই তখন ঢাকায় । ক্যাপিট্যাল হোটেলে উঠেছি । সকালে তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি প্রয়াত আ ন ম শফিকুল হক , বর্তমান মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাশুক উদ্দিন আহমেদ ও এবং তাঁর ভায়রা প্রয়াত সুয়েব আহমেদ চৌধুরী ( বীর মুক্তিযোদ্ধা ) আমার রুমে এসে বললেন , আমরা মাহমুদ উস সামাদ সাহেবের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এ যাচ্ছি । দুপুরে খাওয়ার দাওয়াত । তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছেন । মতিঝিল বলাকার পাশে গ্রাউন্ড ফ্লোরে তিনি তখন ফ্রাগ্নেস মানে সেন্ট এর ইম্পোট করেন । সেখানে তিনি আমাদের হাজি আর কাচ্চি বিরিয়ানি খাওয়ান । আমার পড়া শুনার খবর নিলেন । নিজে বিজনেস এর উপর অনার্স করেছেন পরে ফেলোশিপ নিয়েছেন সেটি বললেন । লেখাপড়া পড়া শেষ করে দেশে তিনি রাজনীতি করতে এসেছেন শুনে একটু আশ্চর্য ও কৌতহল ফিল করছিলাম । এর পরে রাজনীতিতে তাঁকে অনেক কাঠখড় পুড়াতে হয়েছে । জেলা কমিটি তারে নেয় না বলে থানা কমিটি হয়ে আসো । থানা কমিটি বলে ইউনিয়ন কমিটি হয়ে আসো । তারপরও তিনি হাল ছাড়েন না ।যেখানে তিনি নির্বাচন করতে চান সেটা কঠিন জায়গা ।শহরের মানুষ বলে ঔটা ” হপার ” । এরপর ঢাকায় কেন্দ্রীয় ভাবে গড়ে তুলেন শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদ । ঢাকায় রমনা ভবনের সামনে পার্টি অফিসের যাওয়া আসা করেন । আর সঙ্গে তাঁর বিশাল নিশান পেট্রোল গাড়ীটি বিখ্যাত হয়ে উঠে । চিন্তা করুন ৯১ , ৯৬ , ২০০১ এ তিনি স্বল্প ভোটে পরাজিত হয়েছেন । হাল ছাড়েননি । দল ছাড়েন নি । প্রতিটা মিছিল মিটিং এ উপস্থিত । দলের বিভিন্ন প্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন । দলের বিভিন্ন দুঃসময়ে কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ খবর নিতেন । আমাদের প্রয়াত প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা আ ন ম শফিক ভাই অনেক দিন অসুস্থ ছিলেন বিছানায় । ঢাকায় নেত্রীর সাথে দেখা করতে গেলে নেত্রী শফিক ভাই কে বলেন আপনার ব্যাপারে কয়েস কে বলে দিয়েছি । চেন্নাই যাওয়ার জন্য রেডি হন । আর এটাই আমাদের এম পি কয়েছ । আমি তাঁর এই রূপান্তর টা দেখেছি । আশ্চর্য হই ।এর ই মধ্যে তিনি এমপি হয়েছেন কয়েকবার । দূর প্রবাস থেকে দেখি । এলাকায় প্রচুর কাজ করিয়েছেন । আবার বিভিন্ন বিতর্কে তিনি পত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন এটা সত্যি । এমনি একটা বিতর্ক হলো জাফর ইকবাল স্যারকে তিনি পিটাতে চেয়েছেন । বিশেষ করে সে সময় ফেসবুক কয়দিন গরম থাকে এই ইস্যুতে। তবে সিলেটে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নাকি সেসময় রেজুলেসন পাঁশ করে জাফর ইকবাল স্যার এর বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকাণ্ড নিয়ে ঝাড়ু মিছিল দেয় । আমি খুব জোরালো ভাষায় এর প্রতিবাদে ফেসবুকে কলম ধরি । মাহমুদুস সামাদ সাহেব ছাড়াও যারা সিলেটের আওয়ামী লীগের যারা নেতৃত্বে ছিলেন তারা আমার বক্তব্যে সেসময় আহত হয়েছেন বুঝতে পারি । এই লেখার পরবর্তীতে তিনি আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। তিনি ওইভাবে বলেননি যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে । আরেকটা কথা এখানে বলে নেয়া ভাল যে তিনি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট মেম্বার ছিলেন। এমপি হিসেবে তিনি সিলেটকে রিপ্রেজেন্ট করেন । সিলেটী ছাত্র ছাত্রী ভর্তির ব্যাপারে তাঁর একটা কঠোর অবস্থান ছিল । দ্বন্দ্বটা সেখানেই । যে কোন এমপি বা সিলেট অঞ্চলের কেউ দায়িত্বশীল থাকলে তাঁর অঞ্চলের ছাত্রছাত্রী ভর্তির ব্যাপারে ভূমিকা তিনি রাখতেই পারেন । সিলেট বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাহিরে নয় । আর সিলেটে একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পিছনে সিলেটী মানুষের পূর্ব পুরুষদের আন্দোলন সংগ্রাম এর দীর্ঘ ইতিহাসও আমাদের ভুললে চলবে না ।

যাই হোক এই করোনার সময় তিনি প্রমাণ করেছেন তিনি কত পাবলিক সান্নিধ্য এ চলে এসেছেন । তাঁর বিশাল পুকুরের মাছ তুলে মানুষ দের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন । লক ডাউন বাংলাদেশে প্রথম শুরু হলে অন্য এমপিরা যখন ভয়ে ঘর থেকে বের হন না । হননি তখন তিনি বাড়ি বাড়ি গেছেন । বিরামহীন ভাবে । আজ একজন বললেন , মধ্যপ্রাচ্যে করোনায় তাঁর এলাকার অনেকের চাকুরী চলে যায় । বাড়ি বাড়ি হাহাকার পড়ে । এই হাহাকার যাতে তাঁর এলাকায় না হয় তাঁর একটি লিস্ট করে দান বা মাসিক একটি ভাতা পাঠিয়ে দিয়েছেন মানুষের বাড়ি বাড়ি । আমার কাছে তাঁর এই রূপান্তর গুলি স্টোরি টেলারের মতো বলতে ইচ্ছে করে । হজ্ব বিষয় সংসদীয় কমিটির প্রধান হিসেবে ধর্ম মন্ত্রীর পাশে বসে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মক্কায় সিলেটী মানুষের খোঁজ খবর নিতেন বলে জানিয়েছেন আমার বন্ধু মাওলানা সোয়েব । তিনি যে জন মানুষের নেতায় পরিণত হয়েছেন তাঁর জানাজায় লাখো মানুষের আহাজারি , তা মানুষের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ । মানুষ ভালবাসতে পারে তা মাঝে মাঝে প্রকাশিত হয় ।


কপি রাইটঃ সৈয়দ হক ( তাহমীম ) / ফেবু পোষ্ট / লেখক নব্বই দশকের সাবেক ছাত্র নেতা , লেখক , আইনজীবি/ লেসটার সায়ার / যুক্তরাজ্য ।


  •