রায়হানের পা উঁচু করে ধরেন হারুন, নির্যাতন করেন আকবর ও টিটু

প্রকাশিত: ১:১৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২০

রায়হানের পা উঁচু করে ধরেন হারুন, নির্যাতন করেন আকবর ও টিটু

সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিহত রায়হানের উপর অমানবিক নির্যাতনের তথ্য দিলেন এক কনেস্টবল। সাইদুর নামের ওই কনেস্টবল আদালতকে বলেন, ‘ওইদিন কনেস্টবল হারুন রায়হানের পা উঁচু করে ধরে রাখেন আর এসআই আকবর ও কনস্টেবল টিটু তার পায়ের পাতা এবং পায়ে আঘাত করেন।’

গত ১৯ অক্টোবর সাইদুর, শামিম ও দেলোয়ার নামের তিন কনেস্টবলকে ওই রাতে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষী দিতে সিলেটের অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিয়াদুর রহমানের আদালতে হাজির করা হলে সাইদুর আদালতকে এমন তথ্য জানান।

সাইদুর আদালতকে আরও জানান, ‘এ সময় এএসআই আশেক এলাহী আকবরকে বলেন, রায়হান পুলিশের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে তার পায়ে মারেন। পায়ে মারলে সমস্যা নেই। তখন আকবর আমাকে ধমক দিয়ে সেন্ট্রি পোস্টে পাঠিয়ে দেন। এরপর বেশ কয়েকবার রায়হানের চিৎকার শুনতে পাই। ভোর ৪টায় কনস্টেবল দেলোয়ারকে আমি ডিউটি বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাই। সাইদুর আদালতকে বলেন, পরদিন দুপুর সাড়ে ১২টায় বন্দরবাজার ফাঁড়ির মুন্সি কনস্টেবল আমিনুল ডিসি স্যারের (এসএমপির উপকমিশনার উত্তর আজবাহার আলী শেখ) কথা বলে ফাঁড়িতে ডাকেন।’

আসার পর আকবর স্যার (আকবর) বলেন, ‘সিনিয়র স্যাররা এলে বলবি, ফাঁড়িতে কোনো লোক এনে নির্যাতন করা হয় নাই। সে (রায়হান) কাস্টঘর থেকে গণপিটুনি খেয়ে ধরা পড়েছে। তাকে সরাসরি ওসমানী হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।’ আমি যা বলছি তাই বলবি। আমার বুকে হাত দিয়ে আকবর স্যার হুমকি দিয়ে আরও বলেন, ‘সত্য কথা বললে বুকে গুলি করব, পিঠ দিয়ে বের হবে।’

এদিকে সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হান নিহতের ঘটনার ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো লাপাত্তা মূল অভিযুক্ত বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সদ্য বহিস্কৃত ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া। তবে এ ঘটনায় আকবরকে প্রশাসন এখনো খোঁজে বের করতে না পারলেও হারুনুর রশীদ ও টিটু চন্দ্র দাস নামের দুই কনেস্টবলকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এর আগে রোববার (১১ অক্টোবর) ভোরে পুলিশের নির্যাতনে রায়হান উদ্দিন (৩৩) নামে এক যুবক নিহত হওয়ার অভিযোগ তুলেন তার স্বজনরা। নিহত ওই যুবক সিলেটের আখালিয়ার নেহারিপাড়ার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে।

পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ছিনতাইকালে গণপিটুনিতে মারা গেছেন রায়হান। তবে নিহতের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, পুলিশ ধরে নিয়ে নির্যাতন করে রায়হানকে হত্যা করেছে।

পরিবারের অভিযোগে ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠিত করেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ। তদন্তে নেমে পুলিশ হেফাজতে রায়হান উদ্দিনের মৃত্যু ও নির্যাতনের প্রাথমিক সত্যতাও পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

এরপর বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ। অন্য তিনজন হলেন, কনস্টেবল হারুনুর রশীদ, কনস্টেবল তৌওহিদ মিয়া, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস।

একই সাথে তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রত্যাহারকৃত পুলিশ সদস্যরা হল, এএসআই আশেক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী, কনস্টেবল সজিব হোসেন।

অপরদিকে পরবর্তিতে আকবরকে পালাতে সহায়তা করা ও তথ্য গায়েব করার অপরাধে ফাঁড়ির টু-আইসি হাসান উদ্দিনকে বহিস্কার করে সিলেটের পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়।

এদিকে ঘটনার পর ১৩ অক্টোবর থেকে লাপাত্তা হয়ে যান বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া। এরপর থেকে এখনও লাপাত্তা রয়েছেন ঘটনার মুল অভিযুক্ত এ পুলিশ কর্মকর্তা।

এ ঘটনায় রোববার (১১ অক্টোবর) দিবাগত রাতে নিহত রায়হানের স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাত কয়েকজন আসামি করে কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে পিবিআই।

চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) থেকে তদন্ত শুরু করে পিবিআই। সেদিন তদন্ত দল বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ি, কাষ্টঘর ও রায়হানের পরিবারের সাথে কথা বলে।

আর ১৫ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে রায়হানের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ফের ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। এরপর ময়নাতদন্ত শেষে বিকেলে আবারও রায়হানের মৃতদেহ দাফন করা হয়।


  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট