কুষ্টিয়ার আকাশে ‘আকাশগঙ্গা’

প্রকাশিত: ১০:৩০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০২০

কুষ্টিয়ার আকাশে ‘আকাশগঙ্গা’

কুষ্টিয়ার খোকসার আকাশে হঠাৎ ভেসে ওঠে নান্দনিক আকাশগঙ্গা। ইংরেজিকে যাকে বলে মিল্কিওয়ে। শুক্রবার (১৭ জুলাই) দিবাগত সাড়ে ১২ টার দিকে কুষ্টিয়ার খোকসার একতারপুর গ্রামে পৃথিবীর নিজস্ব এ ছায়াপথ দেখতে পান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুকুল আহমেদ রনি।

কুষ্টিয়ার খোকসার এই শিক্ষার্থী আকাশে আকাশগঙ্গা দেখামাত্রই ক্যামেরাবন্দী করেন। তিনি বলেন, যে ছবিটি দেখছেন সেটা গত ১৭ জুলাই কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা থেকে তোলা হয়েছে। আমরা পৃথিবীতে বাস করি, যেটা কিনা সৌরজগতে একটা ছোট গ্রহ, যেই পৃথিবীর আয়তন প্রায় ৫১,০১,০০,৫০০ বর্গ কিলোমিটার। কি মনে হচ্ছে? অনেক বড় তাইনা! না আসলে তেমনটা নয়! আমরা যদি মহাবিশ্বের সাপেক্ষে চিন্তা করি তাহলে আমাদের এই পৃথিবীর এই বিশাল আয়তনও একটা ধূলিকণার সমানও নয়। শুনতে হাস্যকর লাগছ হয়তো, কিন্তু অবাক হবেন জেনে এটাই সত্যি।

রনি বলেন, মহাবিশ্বের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি সম্পর্কে একদম সহজ এবং প্রাঞ্জল ভাষায় কিছু তথ্য জানানোর জন্য। মনে হতে পারে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি কী? তা জানার আগে আমাদের আগে জানতে হবে গ্যালাক্সি কী! গ্যালাক্সি (বাংলায় ছায়াপথ বলে) হচ্ছে গ্যাস, ধুলা, কোটি কোটি নক্ষত্র ও তাদের অন্তর্গত গ্রহ, গ্রহাণু, অজানা বস্তু (ডার্ক ম্যাটার) এসবের একটি সমন্বয়, যা মহাকর্ষ বলের কারণে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত কিংবা আবদ্ধ থাকে।

ব্যাখা দিতে গিয়ে মেধাবী এই শিক্ষার্থী বলেন, গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা সুবিশাল কোনো ভরকেন্দ্রকে ঘিরে এরা প্রদক্ষিণ করতে থাকে। একটি গ্যালাক্সিতে এর আকার ও গঠন অনুযায়ী কয়েকশত কোটি থেকে কয়েক লাখ কোটি নক্ষত্র থাকতে পারে।

তিনি বলেন, গ্যালাক্সি শব্দের উৎপত্তি গ্রীক শব্দ গ্যালাক্সিয়াস থেকে। বাংলায় এর অনুবাদ করলে দাঁড়ায় দুধের মতো। গ্রিক পুরাণ (মাইথোলজি) অনুযায়ী দেবরাজ জিউস তাঁর সদ্যজাত পুত্র হেরাক্লিসকে হারকিউলিস নামে বেশি পরিচিত।

তাঁর জন্ম হয়েছিল এক মানব নারীর গর্ভে) স্বর্গে এনে তাঁর ঘুমন্ত স্ত্রী হেরার স্তন্যপান করাতে চাইছিল, কিন্তু হেরাক্লিস দুধ খেতে খেতে হেরার ঘুম ভেঙে যায় আর সে দেখে অচেনা এক ছেলে তাঁর স্তন্যপান করছে! সে তখন ছেলেটাকে দূরে ঠেলে সরিয়ে দেয় আর তখন কিছু দুধ নিচে পড়ে যায়। তখন জন্ম হয় আমাদের ছায়াপথ এর, যাকে এখন আমরা “মিল্কিওয়ে” বলি।

রনি বলেন, আর আকাশে একে দেখতে এজন্যেই সাদাটে লাগে! পূর্বে গ্যালাক্সি বলতে কেবল আমাদের এই মিল্কিওয়েটিকেই বোঝানো হতো, কারণ তখন বাইরের কোন গ্যালাক্সির খোঁজ জানা ছিল না মানুষের। কিন্তু এখন গ্যালাক্সি হচ্ছে সাধারণ নাম। আলাদা আলাদা গ্যালাক্সির আলাদা আলাদা নাম দেওয়া হয়েছে।

এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, এ গেল মিল্কিওয়ে নামকরণের এর প্রচলিত কাহিনী। তার আগে আর একটা কথা বলি- মিল্কিওয়েকে বাংলায় বলা হয় আকাশগঙ্গা। তার মানে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি এর বাংলা করলে দাঁড়ায় আকাশগঙ্গা ছায়াপথ। আচ্ছা এই আকাশগঙ্গা কী খালি চোখে দেখা যায়? হ্যাঁ অবশ্যই দেখা!

তিনি বলেন, শরতের মেঘমুক্ত আকাশে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে তাকালে দিগন্তরেখা থেকে উপরের দিকে তীর্যক ভাবে একটা বলয় দৃশ্যমান হয়; সেটিই আমাদের মিল্কিওয়ে। যার আকৃতি সর্পিলাকার থালার ন্যায়। আপনি যদি শহরে থাকেন তাহলে খালি চোখে আপনি মিল্কিওয়ে দেখতে পারবেন না কারণ শহরে অনেক লাইট সোর্স থাকার কারণে দেখা যায় না! গ্রামীণ নিরিবিলি অঞ্চলে আপনি খালি চোখে আকাশগঙ্গা দেখতে পারবেন।

মুকুল আহমেদ রনি বলেন, এখন জানা যাক আমাদের মিল্কিওয়েতে কী কী আছে। আমাদের আকাশগঙ্গার আয়তন কত তাহলে? আমরা যে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে বাস করছি তার ব্যাস ৯০০০০ আলোকবর্ষ (আলো এক বৎসরে যে পরিমাণ পথ চলে তাকে আলোকবর্ষ বলে)। আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে ৩০০০০০ কিলোমিটর। তাহলে বুঝতেই পারছেন কতটা বিশাল এই ছায়াপথ।

আচ্ছা আলোকবর্ষ বিষয়টা একটু সোজা করে বলি, পৃথিবী থেকে এই মুহূর্তে চাদের দুরুত্ব ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯০০ মাইল। এখন আপনাকে যদি এমন এক রকেটে চরে পাঠানো হয় চাঁদে যার গতি এক আলোকবর্ষ। তাহলে আপনি ২ সেকেন্ডে একবার চাঁদে যেতে পারবেন আবার ফিরে আসতে পারবেন এবং আবারও চাঁদে যেতে পারবেন। এবার আবার উপরের সাংখ্যিক মানের সাথে তুলনা করুন। এইসব ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলে মাথা ঘুরে যাবার উপক্রম হয়। মনে হয় এই মহাবিশ্বের কত ক্ষুদ্র সত্ত্বা আমরা এই মানুষ।

তিনি বলেন, আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথে আনুমানিক নক্ষত্রের সংখ্যা ১৫০ থেকে ২৫০ বিলিয়ন । সেইখানে একটি মাত্র নক্ষত্র আমাদের সূর্য  এবং সৌরজগতের একটা ছোট্ট একটা গ্রহ আমাদের পৃথিবী। এখন নিশ্চয় অনুমান করতে পারছেন আমাদের পৃথিবী কত ছোট!

শুরুতে কেনো ধূলিকণার থেকেও ছোট বলেছিলাম।  আচ্ছা এবার আমাদের সূর্যকে মিল্কিওয়ের সাপেক্ষে তুলনা করি, আমাদের মিল্কিওয়েতে যে বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র আছের তার তুলনায় আমাদের সূর্য অনেক ছোট! এমন কী নক্ষত্রে আমাদের এই ছায়াপথে আছে যার তুলনায় সূর্য একদম সরিষা দানার মতো! যে সূর্য কিনা আবার পৃথিবীর থেকে তেরো লাখ গুণ বড়।

তারমানে এখন চিন্তা করুন তো আপনি কোথায় আছেন! আপনি এই মহাবিশ্বের কতটুকু অংশ জুড়ে বিচরণ করছেন। তাহলে কী এই মহাবিশ্বে আমাদের মত উন্নত জীব আছে? আছে হয়তো! সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে জেনে রাখুন থাকার সম্ভাবনা কিন্তু খুবই প্রবল।


  •