দেশে হচ্ছেটা কি

প্রকাশিত: ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ, মে ২, ২০২০

দেশে হচ্ছেটা কি

মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল : বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের বিপদ কি কমছে, না বাড়ছে? কিছুই তো বুঝে উঠতে পারছি না। লকডাউন শিথিল হয়ে যাচ্ছে। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো খুলে দেয়া হচ্ছে। হাটবাজার নিত্যপণ্যের দোকান রেস্টুরেন্ট খোলা রাখবার সময়ও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। রাজপথে যানবাহন মানুষের চলাচল বেড়ে গেছে। সবকিছুতেই শিথিলতা চোখে পড়ার মতো।
আজ দেখলাম দোকান মালিক সমিতি ১ মে থেকে দোকানপাট শপিংমল খোলার দাবি তুলছে। পরিস্হিতি কি এ রকমই?

অথচ প্রতিদিনই বাড়ছে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা। মৃত্যুর মিছিলও লম্বা হচ্ছে দিনকে দিন। রোজার মাসে মসজিদে তারাবির নামাজে ১২ জনের বেশি জড়ো না হওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শুক্রবারের জুমার নামাজ আর মসজিদে ওয়াক্তের নামাজের বেলায়ও একইরকম নির্দেশনা। জানাজার নামাজেও লোকসমাগম করা যাবে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জানাজায় বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে লক্ষ মানুষের উপস্হিতির কারণে থানার ওসি ও এএসপিকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। সরকারি অফিস আদালত এখনো বন্ধ রয়েছে। সীমিত পরিসরে দেশের নিম্ন আদালত খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েও শেষপর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। সরকারি ছুটি আগামী ৬ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী বলছেন প্রয়োজনে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। তাহলে দেশে হচ্ছেটা কি? মহাদুর্যোগের এই সময়ে এত সিদ্ধান্তহীনতা কেন? ইতোপূর্বে স্বাস্হ্য বিভাগের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ সারা দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা দিয়েছেন, ওই ঘোষণা তো এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। গোটা দেশকে যথাসময়ে লকডাউন করা না হলেও পর্যায়ক্রমে সারা দেশই ঘোষণা দিয়ে লকডাউন করা হয়েছে। এখন সরকারিভাবে ঘোষিত লকডাউন কোথাও শিথিল করা হয়েছে এমন খবর আমাদের জানা নেই । তা হলে কিসের ভিত্তিতে কোন বিবেচনায় কাদের স্বার্থে এ সব হচ্ছে?

তবে কি ইউরোপ আমেরিকার তুলনায় আমাদের দেশে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কম হওয়ায় আমরা অবলীলায় এ ধরণের সিদ্ধান্ত নিতে পারছি? আমরা কি মনে করছি, পৃথিবীর অনেক দেশ থেকেই আমরা ভালো আছি। কিভাবে বলি, ২৪ ঘন্টায় যেখানে সর্বসাকুল্যে হাজার চারেকের বেশি টেস্ট করা যাচ্ছে না সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা কমই হবে, বেশি হবে কি করে? একবারের জন্যও কি আমরা ভেবে দেখেছি বাংলাদেশে করোনা পরিস্হিতির যদি সত্যি সত্যি ভয়াবহতম অবনতি ঘটে, তখন আমরা সামাল দিব কিভাবে, যেখানে চোখের সামনে ইউরোপ আমেরিকার বেসামাল অসহায় দশা আমরা এখনো দেখছি। স্হানীয়ভাবে যথেস্ট টেস্ট হচ্ছে না এখনো বেশিরভাগ এলাকায়। আবার অনেকে টেস্টে যেতেও চায় না। পরিবারকে বিব্রতকর পরিস্হিতি থেকে বাঁচাতে সামাজিক বয়কটের ভয়ে অনেকেই বাড়িতে বসেই সর্দি-জ্বরের চিকিৎসা নিচ্ছেন। পরিণতিতে অবশ্য বিপদটাই বাড়ছে। করোনার উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই সারাদেশে মৃত্যুবরণ করছেন অনেকেই। এদের সংখ্যাটা করোনায় সরকারি হিসেবে মৃত্যুর ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।

তাছাড়া দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর কারোরই ভরসা নেই। এই ভঙ্গুর স্বাস্হ্য ব্যবস্হার মধ্যেই চিকিৎসক স্বাস্হকর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে চিকিৎসা সেবা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন । কয়েক শ’ ডাক্তার নার্স স্বাস্হ্যকর্মী ইতোমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, কোয়ারেন্টাইনে গেছেন হাজারের সংখ্যায় । সরকারি বেসরকারি অনেক হাসপাতাল পুরোপুরি অথবা আংশিক লকডাউনে চলে গেছে। করোনা মোকাবিলায় যারা ফ্রন্ট লাইনে লড়বেন তাদের সুরক্ষা দিতে সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধের শামিল । সময়মতো এন-৯৫ মাস্ক আর পিপিই পৌঁছে দিতে না পারায় সরকার আর দায়িত্বরতরা ডাক্তার চিকিৎসাকর্মীদের কতটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে তা সহজেই অনুমেয়।

অন্যদিকে, হাসপাতালগুলোও বেহাল অবস্হা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। করোনা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবেন তো ২৪ ঘন্টায়ও ডাক্তার নার্স কাছে মিলবে না। কী করুণ দশা আমাদের । রোগীর কাছে ভিড়ে ডাক্তার আক্রান্ত হচ্ছে, অন্যদিকে ডাক্তারকে কাছে না পেয়ে রোগী মারা যাচ্ছে । হাসপাতালের আইসিইউ থেকে জীবিত ফেরত আসবেন- এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন এমন সংখ্যা কম।

এরই মধ্যে প্রতিদিনই আমরা সরকারের ভেতরে-বাইরে অস্থিরতা লক্ষ্য করছি । সকাল-বিকাল সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হচ্ছে।যথেষ্ট সংখ্যায় টেস্ট না হওয়ার কারণে বুঝতেই পারছি না আমরা কোথায় আছি। বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হা কেবল টেস্টের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এলেও আমরা এত দিন পেরিয়ে গেলেও টেস্টের সংখ্যা বাড়াতে পারছি না। না বাড়াতে চাচ্ছি না, কে জানে? আস্হাহীনতা আর বিশ্বাসের সঙ্কট যেখানে চরমে। প্রতিদিনের সীমিত টেস্টেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সরকারি পরিসংখ্যান থেকে দেশে করোনা পরিস্হিতির ন্যূনতম ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা মোটেই বলা যাবে না। বরং নেতিবাচক পরিবর্তনের ধারাটাই দিনে দিনে প্রবল হচ্ছে । লক্ষণ দেখে সবাই বলছে সামনের দিনগুলো বিশেষ করে মে মাসটা আমাদের জন্য সর্বোচ্চ ঝুঁকির। সুস্হভাবে বেঁচে থাকার জন্য আর একটু কষ্ট করে ধৈর্য ধরে সামনের সময়টা দেশজুড়ে কঠোরভাবে লকডাউন মেনে চলতে পারলে বড় ক্ষতির হাত থেকে নিজেরা নিরাপদ থাকতে পারতাম। যেন জীবিকার কাছে জীবন হেরে গেল। এই পরিস্হিতিতে রাষ্ট্রের প্রতিপালন এবং নাগরিকের জীবন জীবিকার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায় স্বীকার না করে নানামুখী চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করে সরকারের গৃহীত সাম্প্রতিক সিদ্বান্তগুলো দেশকে কোন ভয়াবহ পরিণতিতে ঠেলে দিবে, তা কেবল ভবিতব্যই বলবে।


লেখক : ‘৯০-এর কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা, সহ-সম্পাদক, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটি

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট