ভোটার ছাড়াই ভোট দেয়া যাবে ইভিএমে : সুজন

জাতীয়

সুজনের সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা : ফলাফলেও কারচুপির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে ॥ প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনে কমিশন নিষ্ক্রিয়

ইভিএমের মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফলে কারচুপির যথেষ্ট সুযোগ আছে বলে অভিযোগ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি বলেন, ইভিএমে নির্বাচন কমিশনের দেয়া ফলাফল যাচাই বাছাইয়ের কোনো সুযোগ থাকে না। এছাড়া প্রার্থীদের আচরণ বিধি লঙ্ঘনের বিষয়েও কমিশন নিষ্ক্রিয়। গত নির্বাচনের মতই ২৫ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি ছাড়াই সেই ভোটগুলো নির্বাচনি কর্মকর্তারা দিয়ে দেয়ার সুযোগ এবারও থাকলে ভোটার ছাড়াই ভোট দেয়ার ক্ষেত্র তৈরি হবে বলেও মনে করে সুজন। গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে মেয়র প্রার্থীদের তথ্য উপস্থাপন নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে সুজনের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ করা হয়। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০২০-এ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের তথ্যের বিশ্লেষণ উপস্থাপন এবং অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বানে সুজনে এর সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত  হয়।  সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন সুজন স¤পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সুজন ঢাকা মহানগর কমিটির সহ-সভাপতি ক্যামেলিয়া চৌধুরী ও নাজিমউদ্দিন, সুজন কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য শফিউদ্দিন আহমেদ।
লিখিত বক্তব্য সুজনেরু কেন্দ্রীয় সমন্বকারী দিলীপ কুমার সরকার বলেন, মনোনয়নপত্র বাছাই, প্রার্থিতা বাতিল, আপিলে ফেরত পাওয়া ও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর ঢাকা উত্তরে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে ৬ জন, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ২৫২ জন এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৭৭ জন; তিনটি পদে সর্বমোট ৩৩৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উল্লেখ্য, জাতীয় পার্টির প্রার্থী জি এম কামরুল ইসলাম ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকার ভোটার না হওয়ায় তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। সংরক্ষিত আসনের ৭৭ জন নারী প্রার্থী ছাড়াও ঢাকা উত্তরে ৬ জন নারী প্রার্থী সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই ৬ জনের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ১ জন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সমর্থিত ২ জন। ঢাকা দক্ষিণে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে ৭ জন, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৩২৫ জন এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৮২ জন; তিনটি পদে সর্বমোট ৪১৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সংরক্ষিত আসনের ৮২ জন নারী প্রার্থী ছাড়াও ঢাকা দক্ষিণে ৯ জন নারী প্রার্থী সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই ৯ জনের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ১ জন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সমর্থিত ২ জন।
তিনি আরো বলেন, দুই সিটি মিলিয়ে মেয়র পদে ১৩ জন, ১২৯টি ওয়ার্ডে সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৫৭৭ জন এবং ৪৩টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ১৫৯ জন; তিনটি পদে সর্বমোট ৭৪৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উল্লেখ্য, ১৩ জন মেয়র প্রার্থীই রাজনৈতিক দল থেকে মনোনীত; স্বতন্ত্র কেউ নেই। দুটি সিটি কর্পোরেশনের সকল পদেই ২০১৫ সালের তুলনায় প্রার্থী সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। ঢাকা উত্তরে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে ৬ জন, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ২৫২ জন এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৭৭ জন; তিনটি পদে সর্বমোট ৩৩৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ২০১৫ সালের নির্বাচনে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৬, ২৭৭ ও ৮৯ এবং সর্বমোট ৩৮২ জন। একইভাবে ঢাকা উত্তরে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে ৭ জন, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৩২৫ জন এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৮২ জন; তিনটি পদে সর্বমোট ৪১৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ২০১৫ সালের নির্বাচনে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২০, ৩৮৭ ও ৯৫ এবং সর্বমোট ৫০২ জন।
প্রার্থীদের শিক্ষাগত স¤পর্কে তিনি বলেন, ঢাকা উত্তরের ৬ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৫ জনই (৮৩.৩৩%) উচ্চশিক্ষিত। এদের মধ্যে ২ জনের (৩৩.৩৩%) শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর ও ৩ জনের (৫০%) স্নাতক। তবে ১ জন (১৬.৬৭%) প্রার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। ঢাকা উত্তরের ৫৪টি ওয়ার্ডের ২৪৮ জন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে অধিকাংশ প্রার্থীর (১৫৬ জন বা ৬২.৯০%) শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা তার নিচে। শুধুমাত্র এসএসসির নিচেই ১২৩ জন (৪৯.৬০%)। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ৫৬ জন (২২.৫৮%)।  ঢাকা দক্ষিণের ৭ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৩ জন (৪২.৮৬%) উচ্চশিক্ষিত। এদের মধ্যে ২ জনের (২৮.৫৭%) শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর ও ১ জনের (১৪.২৯%) স্নাতক। তবে ৩ জন (৪২.৮৬%) প্রার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই।
প্রার্থীদের পেশা স¤পর্কে বলেন, ঢাকা উত্তরের ৬ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৩ জন (অর্ধেক-৫০%) ব্যবসায়ী। ২৪৮ জন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীর চার পঞ্চমাংশেরও অধিকের (২০৩ জন বা ৮১.৮৫%) পেশা ব্যবসা। ৯ জন (৩.৬৩%) তাদের পেশার কথা উল্লেখ করেননি। ঢাকা উত্তরের  সর্বমোট ৩৩১ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৪১ জনের (৭২.৮১%) পেশা ব্যবসা। ঢাকা দক্ষিণের ৭ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৪ জনই (৫৭.১৪%) ব্যবসায়ী। ঢাকা দক্ষিণের ৩২০ জন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীর চার পঞ্চমাংশেরও অধিকের (২৬৪ জন বা ৮২.৫%) পেশা ব্যবসা। ঢাকা দক্ষিণের সর্বমোট ৪০৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩০১ জনের (৭৩.৫৯%) পেশা ব্যবসা।
প্রার্থীদের মামলা স¤পর্কে তিনি বলেন, ঢাকা উত্তরের ৬ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে শুধুমাত্র বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী আহাম্মদ সাজেদুল হকের বিরুদ্ধে অতীতে একটি মামলা ছিল, যা থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। আর কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে কখনও মামলা দায়ের হয়নি। ঢাকা উত্তরের ২৪৮ জন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে ৮৮ জনের (৩৫.৪৮%) বিরুদ্ধে বর্তমানে, ৪৪ জনের (১৭.৭৪%) বিরুদ্ধে অতীতে এবং ২০ জনের (৮.০৬%) উভয় সময়ে মামলা আছে বা ছিল।
প্রার্থীদের আয় স¤পর্কে বলেন, ঢাকা উত্তরের ৬ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে বছরে ৫ লক্ষ টাকার নিচে আয় করেন ২ জন (৩৩.৩৩%), ৫ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা আয় করেন ১ জন (১৬.৬৭%) এবং কোটি টাকা অধিক আয় করেন ২ জন (৩৩.৩৩%)। প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের প্রার্থী শাহীন খানের পেশা ব্যবস্যা হলেও তিনি কোনো আয় দেখাননি। ঢাকা দক্ষিণের ৭ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ২ জনের (২৮.৫৭%) বিরুদ্ধে বর্তমানে ৩ জনের (৪২.৮৬%) বিরুদ্ধে অতীতে এবং ১ জনের (১৪.২৯%) উভয় সময়ে মামলা আছে বা ছিল। ৩০২ ধারায় ১ জনের (১৪.২৯%) বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা আছে। ঢাকা দক্ষিণের ৭ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে বছরে ৫ লক্ষ টাকার নিচে আয় করেন ২ জন (২৮.৫৭%), ৫ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা আয় করেন ১ জন (১৪.২৯%), ৫০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা আয় করেন ১ জন (১৪.২৯%) এবং কোটি টাকার অধিক আয় করেন ১ জন (১৪.২৯%)। দক্ষিণের মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে বছরে সর্বোচ্চ ৯ কোটি ৮১ লক্ষ ৩৮ হাজার ৪৬ টাকা আয় করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস।
সুজন স¤পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বহু লড়াই-সংগ্রামের পর নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তথ্য পাওয়ার অধিকার এখন আইনের বিধি বিধানে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনি ম্যানুয়ালে প্রার্থীদের হলফনামায় প্রদান করা তথ্যগুলো প্রকাশের কথা সুপষ্টভাবে উল্লেখ আছে। তা সত্ত্বেও এবার নির্বাচন কমিশন তথ্য নিয়ে একটা তুঘলকি কান্ড করেছে। অতীতে আমরা সবসময় এই তথ্যগুলো পেয়েছি। কিন্তু এবার আমরা তথ্য পাচ্ছি না। শেষ পর্যন্ত আমরা কমিশনকে উকিল নোটিশও দিয়েছি। নোটিশের সময়সীমা পার হয়ে গেলেও কোনো জবাব আমরা এখনো পাইনি। মানুষ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তথ্য পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রার্থীদের স¤পর্কে যথাযথ তথ্য নাগরিকদের ক্ষমতায়িত করে ফলে ভোটাররা জেনে শুনে বুঝে ভোট দিতে পারে। তথ্য পাওয়া জনগণের নাগরিক অধিকার। কিন্তু আমাদের নির্বাচন কমিশন তথ্য দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা পালন করছে না। আমরা এর নিন্দা জানাই। একইসাথে আমরা বহুদিন ধরে বলে আসছি এই তথ্যগুলোর যাচাই বাছাই করা দরকার। কারণ ভুল তথ্য নাগরিকদের বিভ্রান্ত করতে পারে, তাদের ভুল সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করতে পারে।
তিনি আরো বলেন, আজকে উপস্থাপিত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে প্রার্থীদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বেশি, তার মানে আমাদের  রাজনীতি ব্যবসায়ীদের করায়ত্ত হয়ে যাচ্ছে। আরেকটি জিনিস হল প্রার্থীদের মানের অবনতি ঘটছে, কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে স্বল্প  আয়ের প্রার্থীর সংখ্যা কমছে; একইসাথে শিক্ষাগত যোগ্যতা কম এমন প্রার্থীর সংখ্যাও বাড়ছে। আরেকটা বিষয় হল দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন হলে প্রার্থীর সংখ্যাও কমে যায়। প্রার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া নাগরিকদের জন্য ইতিবাচক নয় কারণ বেশি প্রার্থী থাকলে যোগ্য প্রার্থী বেশি থাকার সম্ভাবনা থাকে। যদিও এই নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে হচ্ছে কিনা আমরা নিশ্চিত নই। কারণ মেয়র পদে দলীয় ভিত্তিতে হওয়ার কথা থাকলেও কাউন্সিলর পদে দলীয় ভিত্তিতে হওয়ার কথা নয়; কিন্তু দলীয় সমর্থন দেয়া হয়েছে আইন কানুন বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করে।
সুজন ঢাকা মহানগর কমিটির সহ-সভাপতি নিজাম উদ্দিন বলেন, এবার সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু নাগরিকদের ইভিএম ব্যবহারের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই তাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল।
সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, হলফনামায় দেয়া তথ্যের সঠিকতা যাচাই করা নির্বাচন কমিশনের কর্তব্য। তথ্য যদি যাচাই না করা হয় তাহলে এই তথ্য নেয়ার কোনো অর্থ হয় না। এজন্য কমিশন যাতে তথ্য যাচাই করে এজন্য সবাইকে জোর দিতে হবে।

Leave a Reply