পদত্যাগেই সন্তুষ্ট নয়, শোভন-রাব্বানীর বিচারও চায় বঞ্চিতরা

প্রকাশিত: ৩:৩২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৯

পদত্যাগেই সন্তুষ্ট নয়, শোভন-রাব্বানীর বিচারও চায় বঞ্চিতরা

চাঁদাবাজিসহ বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সদ্য পদ হারানো বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বিচার দাবি করেছেন ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতরা।

শনিবার সব গুঞ্জনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে দুর্নীতির দায়ে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ দিন সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে পদত্যাগ পত্র তুলে দেন ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা। বেশ কয়েকটি বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে আগে থেকেই সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন শোভন ও রাব্বানী।

শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, নানা বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদক রাব্বানীকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন সংগঠনটির অভিভাবক ও আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারই প্রেক্ষিতে তারা পদত্যাগ করেছেন।

এ দিকে ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদক রাব্বানীর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্য। তারা ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এর আগে নাহিয়ান খান জয় সংগঠনের এক নম্বর সহসভাপতি হিসেবে ছিলেন এবং লেখক ভট্টাচার্য এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

অন্য দিকে শোভন-রাব্বানীর পদত্যাগ ঘোষণার পর পরই গরম হয়ে উঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। দলে দলে টিএসসিতে ভিড় করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও ছুটে আসেন বিভিন্ন এলাকার নেতাকর্মী। এ সময় মিছিলে মিছিলে পুরো ক্যাম্পাসে শোভন-রাব্বানীর বিচার চেয়ে স্লোগান দেন ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতরা।

পদবঞ্চিতদের দাবি, যে অভিযোগের ভিত্তিতে শোভন-রাব্বানীকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে তার তদন্ত করে বিচার করতে হবে। শুধু পদ থেকে সরিয়ে দেওয়াই তাদের একমাত্র শাস্তি হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তারা।

এর ঘণ্টা দুয়েক পরে টিএসসি হয়ে শোভন-রাব্বানীকে বহনকারী গাড়ি এলিফেন্ট রোডের দিকে যাওয়ার সময় তাদের পক্ষেও স্লোগান দেন কিছু শিক্ষার্থী। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

পরে শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে দায়িত্ব পাওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসির) ডাচে আলাদা আলাদা মোটরসাইকেলে করে আসেন ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়।

নতুন দায়িত্ব পাওয়ার ঘোষণার পর পরই নাহিয়ান জয় ও লেখক ভট্টাচার্যকে মিছিল আর স্লোগানে স্বাগত জানানো হয়। পদবঞ্চিতদের প্রত্যাশা, শোভন-রাব্বানী যেভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে, তার থেকে বেরিয়ে এসে সংগঠনকে ভালোভাবে গুছিয়ে নেবেন জয় ও লেখক।

পদবঞ্চিতরা বলেন, ‘শোভন-রাব্বানীর কাছে অনুরোধ ছিল সংগঠনকে বিতর্ক মুক্ত করুন। যোগ্যদের পদায়ন করুন। পদবঞ্চিতদের কথা ভাবুন। উনারা কখনই আমাদের কথা কানে নেননি। আশা করছি, নতুন নেতৃত্ব অবশ্যই এ বিষয়ে নজর দেবেন। অপরাধ বা অন্যায় করে কেউ পার পাবে না, প্রধানমন্ত্রী সে বার্তাই আমাদের দিয়েছেন।’

তবে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বর্তমান কমিটির পদে থাকা নেতারা। তারা বলেন, ‘শোভন-রাব্বানীকে নিয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। পজেটিভ বা নেগেটিভ কোনোটাই না।’

উপস্থিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শোভনের সামনেই ‘জয় ভাইয়ের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’ বলে স্লোগান দিতে থাকে। একপর্যায়ে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে শোভন বলেন, শোনো, অতিরঞ্জিত হয় এমন কিছু করবা না। যেটা আমাদের কষ্ট দেয়, শেখ হাসিনাকে কষ্ট দেয়। ঠিক আছে, সবাই ভালো থাকবে। এ সময় সবাইকে উদ্দেশ করে শোভন বললেন, ভালো থেকো। এরপর বিদায় নিয়ে চলে যান।

যে অভিযোগে পদ হারালেন শোভন-রাব্বানী

গত ৮ আগস্ট ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উপাচার্যের বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপাচার্যের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান মহাপরিকল্পনার ৪-৬ শতাংশ টাকা চাঁদা দাবি করেন বলে পরবর্তীতে উপাচার্যের পক্ষ থেকে অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংবাদ প্রকাশ হয়।

খবরে বলা হয়, উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার পেয়েছে- এমন কোম্পানির কাছ থেকে ভিসিকে টাকার ব্যবস্থা করে দিতে বলেন শোভন ও রাব্বানী। কিন্তু ভিসি তাতে রাজি না হওয়ায় তার সঙ্গে দুই নেতা শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ করেন।

এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শোভন-রাব্বানীর ওপর প্রচণ্ড বিরক্ত হয়েছেন বলেও জানা যায়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের পদ থেকে দুই শীর্ষ নেতাকে পদচ্যুত করতে পারেন বলেও সংবাদ প্রকাশ হয়।

এর প্রেক্ষিতে গোলাম রাব্বানী চাঁদা দাবির বিষয়টি অস্বীকার করে গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে বলেন, ঈদুল আজহার আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এ খবর জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং এরই প্রেক্ষিতে উপাচার্য আমাদের স্মরণ করেন। আমরা দেখা করে আমাদের অজ্ঞাতসারে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে টাকা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলায় তিনি বিব্রতবোধ করেন।

তবে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গোলাম রাব্বানীর এমন বক্তব্যকে ‘অসত্য‘ ও ‘মিথ্যা’ দাবি করে এর প্রতিবাদ জানিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শাখা ছাত্রলীগ থেকে পৃথক বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।

ওই বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শাখা ছাত্রলীগ বলেছে, জাবি ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়ার যে দাবি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী করেছেন, তা অসত্য। এছাড়া ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশেই উপাচার্য ড. ফারজানা ইসলামের সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ।

সর্বশেষ আজ (১৪ সেপ্টেম্বর) সাভারের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম বলেন, বহুদিন পর ভালো একটি গল্প পড়লাম। আমার আর কিছু বলার নেই। একেবারেই বানোয়াট গল্প। টাকা-পয়সা সংক্রান্ত কোনো কথা তাদের সঙ্গে আমার হয়নি।

তিনি আরও বলেন, তারা (ছাত্রলীগ) তাদের মতো করে কাজ করে। কোথায় কাজ করে, কী কমিশন পায়, কী পায় না পায় সেগুলো জানতে চাওয়াতে আমি তাদের বলেছি, আমার সঙ্গে টাকা পয়সা নিয়ে কোনো আলাপ তোমরা করবে না। তোমরা যেটা করতে চাও তা তোমরা নিজেদের মতো করো, তোমাদের মতো চলো। আমার সঙ্গে এগুলো করো না। এটুকুই ছোট কথা। আর তারা একটা গল্প বানিয়েছে।

অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, আমার বিশ্বাস দেশের প্রধান জানেন, তারা গল্প বানিয়েছে, নাকি আমি বানিয়েছি। আর তদন্ত করলে, যে কোনো ধরনের অনুসন্ধান করলে আপনারাও জানতে পারবেন যে, এ ধরনের কিছু হয়েছে কি না। আমার আর এর বেশি কিছু বলার নেই।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও চাঁদাবাজির অভিযোগ

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাব্বানীর বিরুদ্ধে শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ জয়নুল আবেদিন রাসেল। একই সঙ্গে তিনি বিস্ফোরক বক্তব্যও ছুড়ে দেন শোভন-রাব্বানীর উদ্দেশে।

স্ট্যাটাসে রাব্বানীকে উদ্দেশ করে রাসেল বলেন, “জনাব রাব্বানী সাহেব, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি স্থগিত করে আমাকে আর তরিকুলকে ডেকে নিয়ে মাসে কত টাকা করে যেন চেয়েছিলেন কমিটি ঠিক করে দেওয়ার জন্য? আর জগন্নাথের নতুন ক্যাম্পাসে বালু ভরাটের কাজের জন্য যে ঠিকাদারটা পাঠিয়েছিলেন তার নাম মনে আছে? বালু ভরাট ঘনফুট কত টাকা করে যেন বলেছিলেন? আপনি ভুলে গেলেও আমি ভুলি নাই। সেগুলো প্রমাণসহ দেওয়া হয়েছে। আমাদের কমিটি ভেঙে যে মজাটা নিয়েছিলেন সেই মজাটা এখন আমি পাচ্ছি। আমরা বারবার বলার পরও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে না দিয়েই আমাদের কমিটি বিলুপ্ত করলেন। এখন তো মনে হচ্ছে আপনারাও আর কোনো ইউনিট কমিটি দিতে পারবেন না। আপনাদের এত ক্ষমতা তাহলে ফেব্রুয়ারিতে জগন্নাথের কমিটি বিলুপ্ত করে এখনো কমিটি দিতে পারলেন না কেন? নাকি পোলাপাইনগুলোকে পিছনে পিছনে ঘুরিয়ে প্রটোকল নেওয়ার ধান্দা।

  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট