পর্দা কেলেঙ্কারির কাছে বালিশকাণ্ড হেরে গেছে : ফখরুল

প্রকাশিত: ১:৫৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৯

পর্দা কেলেঙ্কারির কাছে বালিশকাণ্ড হেরে গেছে : ফখরুল

আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের অর্থনীতি ‘ফোকলা’ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল শুক্রবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের এম সাইফুর রহমান স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের ১০ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ২০০৯ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান সাইফুর রহমান।
মির্জা ফখরুল বলেন, আজকের (শুক্রবার) পত্রিকাতে আছে, অর্থমন্ত্রী বলেছেন হলমার্ককে আবার সুযোগ দেয়া হবে। অর্থাৎ লুটেরা অর্থনীতিকে আবার লুটেরার মধ্য দিয়ে নিয়ে আসা হবে। এদের চরিত্র হচ্ছে এরা লুটেরা। আমি আগেও বলেছিলাম এরা সব লুট করছে চারদিকে। এমনভাবে লুট করছে যে, দেশ ফোকলা একটা দেশে পরিণত হতে চলেছে, অর্থনীতি ফোকলা হতে চলেছে। মেগা প্রজেক্ট হচ্ছে মেগা চুরি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রজেক্ট করা হয়-এটা নাকি একটা আইডল অর্থনীতি। কিন্তু এটা অতি দ্রুত বিশ্বের কাছে প্রমাণিত হয়ে গেছে এটা হোলো ইকোনমি বা ফাঁপা অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
পর্দা কেলেঙ্কারির কাছে বালিশকান্ড হেরে গেছে বলে মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে  ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য একটি পর্দা কেনা হয়েছে। পর্দা কেলেঙ্কারির কাছে রূপপুরের বালিশকান্ড হেরে গেছে। ব্যাঙের ছাতার মতো ব্যাংক দিয়েছে সরকার। আজ সব ব্যাংক মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, সাইফুর রহমান  একজন দেশপ্রেমিক ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের আমলে আসা সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটের প্রজেক্ট বাতিল করে দিয়েছিলেন। সে কারণে মাইক্রো ইকোনমিক্স যেকোনো অর্থনীতিবিদকে জিজ্ঞাসা করলে দেখবেন তারা বলবেন, সাইফুর রহমান সাহেবের সময়ে সামষ্টিক অর্থনীতি ছিলো সবচেয়ে ভালো। ইচ্ছা করে নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য বা দলের লোকদেরে লাভবান করার জন্য সাইফুর রহমানরা দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেননি। এটা খুব বড় কথা- দেশ বিক্রি করে দেননি। আজকে সাইফুর রহমান সাহেবরা থাকলে এই রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হতো না, আজকে সাইফুর রহমান সাহেবরা থাকলে এই যে ব্যাঙের ছাতার মতো সমস্ত কিছু উঠে আসছে, রূপগঞ্জে আণবিক প্ল্যান্ট এভাবে  তৈরি হতো না। ৩৭ হাজার টাকা একটা পর্দার দাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফরিদপুরের হাসপাতালে এটা হয়েছে। বালিশ তো পর্দার কাছে হেরে গেছে। এই হচ্ছে অবস্থা। চতুর্দিকে শুধু লুট, লুটে নাও।
বিএনপির সময়ে ব্যাংকের অনুমতি না দেয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, খুব চাপ ছিলো নতুন ব্যাংক দেয়ার, লিজিং কোম্পানি দিতে হবে। তিনি (সাইফুর রহমান) শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেননি। আমাদের লোকেরাও বিক্ষুব্ধ উনি দেননি, অনেকে ব্যবসায়ী ছিলেন তারা বলেছেন যে, আমরা পাইনি। তিনি বলেছিলেন আমি এখানে লুটেরা অর্থনীতিতে পরিণত করতে পারি না। আজকে প্রমাণ হয়েছে এই যে ব্যাঙের ছাতার মতো ব্যাংক দিয়েছে, ব্যাংকগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।
সাবেক অর্থমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অর্থনীতির মোড় যারা ঘুরিয়েছিলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসকে যারা পাল্টিয়ে দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে সাইফুর রহমান অন্যতম। যে দেশটা তলাবিহীন ঝুড়ি বলা হতো, আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে যারা এখানে দুর্ভিক্ষ নিয়ে এসেছিলো, খাদ্য উৎপাদন একেবারে শেষ হয়ে গিয়েছিলো, মানুষের অভাব এমন পর্যায়ে গিয়েছিলো যে, পরনের ঠিকমতো কাপড়ও পেতো না। সেই অর্থনীতিকে পাল্টিয়ে দিয়ে আজকে যে সম্ভাবনাময় অর্থনীতি বাংলাদেশে তৈরি করেছে তার ভিত্তিটি করেছিলেন এই মানুষরা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে। এটাই বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে এই সরকার অবলীলায় অস্বীকার করতে চায়। এজ ইফ সব কিছু তারাই করেছে। আমার মনে আছে, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ওই সময়কার অর্থনীতি ও আওয়ামী লীগের নামও দিয়েছিলেন নিখিল বাংলাদেশ লুটপাট সমিতি। বাংলাদেশের চেহারাকে পাল্টিয়ে দেয়া, অর্থনীতিকে পাল্টিয়ে দেয়া তার ভিত্তি রচনা করেছেন সাইফুর রহমান সাহেব। তিনি যুগের প্রয়োজন, মানুষের প্রয়োজনে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন। এখানে ইচ্ছা করলেই চুরি-চামারি করা যেতো না, ইচ্ছা করলেই পুকুর চুরি করার সুযোগ পেতো না, ১০ হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট ৩০ হাজার কোটি টাকার করার সুযোগ ছিলো না। মির্জা ফখরুল দাবি করে বলেন, সাইফুর রহমান সাহেবের সময়ে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেবের সময়ে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে অর্থনীতি ছিলো দৃঢ় অর্থনীতি। তখন বলা হয়েছিলো ইমার্জিং টাইগার, এটা উঠে আসছে একটা বাঘের মতো। সাইফুর রহমান সাহেবরা সবসময় জন্মায় না, তারা ক্ষণজন্মা। জিয়াউর রহমানের এই কৃতিত্ব ছিলো তিনি গ্যালাক্সি অব জুয়েলস নিয়ে এসেছিলেন, তিনি কতগুলো উজ্জল নক্ষত্রকে তুলে নিয়ে এসেছিলেন যারা দেশটাকে ওই বটমলেস বাসকেট থেকে সমৃদ্ধির বাংলাদেশে নিয়ে গেছিলেন। আমি আমাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বলেছিলাম, বিদেশিরা এখনো মনে করে জিয়াউর রহমানের জন্ম না হতো, তিনি যদি বাংলাদেশের পলিটিক্সে না আসতেন তাহলে বাংলাদেশ একটা ফেইলড স্টেটে পরিণত হতো। চার দলীয় জোট সরকারের বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী ফখরুল বলেন, সাইফুর রহমান স্যার অত্যন্ত এফেকশন মানুষ ছিলেন, স্নেহ করতেন ভালোবাসতেন। আমি ওনার চেয়ে অনেক ছোট। আমার মনে আছে আমি যখন বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে গেলাম তখন খুব ক্রাইসিস দেখা দিলো-বিমানে পয়সা নেই এবং বিভিন্ন জায়গায় বিমানকে আটকিয়ে দিচ্ছে জ্বালানি তেল দেয় না। আড়াইশ কোটি টাকা তেলের দাম পাবে। ভয়ে কেউ সাইফুর রহমান সাহেবের কাছে যেতে চায় না, উনি গেলে তো প্রথমেই মাথা-টাথা ভেঙে দিতে পারেন রাগ করে। বিমানকে বলতেন যে, ওটা একটা লুটের জিনিস, ওটা বাদ দিয়ে দাও, ওটা নষ্ট হয়ে গেছে। আমি ও বিমানের এমডি ড. মোমেন সাহস করে গেলাম তার কাছে। গিয়ে বললাম স্যার এই অবস্থা। উনি খুব রাগ করে বলছেন, এটা বন্ধ করে দাও, কেনো রেখেছো এটা লোকসান যাচ্ছে। বললাম স্যার করবেন কি এখন তো আপনার সব কিছু বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঠিক আছে তোমরা আছো এজন্য দিচ্ছি কিন্তু টাকার যেন কোনো অপচয় না হয়। দেড়শ কোটি টাকা দিলেন আমরা বিমানকে উড়াতে সক্ষম হলাম। এভাবে তিনি জিনিসগুলো চালু রেখেছেন, কাজ করতে দিয়েছেন, নজর রেখেছেন।
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আজকে সরকার বড় বড় কথা বলে। সব কিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে। গণমাধ্যম তাদের নিয়ন্ত্রণে। সরকার কথা বলতে দেয় না, তারা চায় না সত্য প্রকাশ হোক। আজকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দি করে রেখেছে শুধু একটা মাত্র কারণে যে, উনি যদি বাইরে থাকেন তাহলে লুটপাট চলবে না, এভাবে মানুষের অধিকারকে বিনষ্ট করা যাবে না। ঠিকই উনি সমগ্র মানুষকে নিয়ে সেটাকে প্রতিহত করবেন। ইনশাল্লাহ এদেশের মানুষ দেশনেত্রীকে অবশ্যই মুক্ত করে আনবে, গণতন্ত্রকে মুক্ত করবে এবং তাদেরকে প্রতিহত করবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক অর্থমন্ত্রীর প্রশংসা করে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জাতীয় সম্পদ যাতে গুটিকয়েকের মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে না পারে যাতে করে জনগনের কাছে পৌছানো যায় অর্থাৎ সম্পদের  সুষম বন্টন করার জন্য সবসময়ে সাইফুর রহমানের সাহেব সংগ্রাম করতেন। আমরা তার জনিয়র সহকর্মী হিসেবে কাছে থেকে তা দেখেছি। আমি দেখেছি উনি কিভাবে ধনীদের থেকে সম্পদ এনে সাধারণ মানুষের কাছে বিতরণ করতেন- এটা চেষ্টা করতেন। আমাদের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সবচাইতে বেশি আয় করে যে ৫ জন এবং সবচাইতে নিম্ন আয়ের ৫ জন তাদের মধ্যে তুলনামূলক গড় করে এটাকে বৈষ্যমের সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমরা যখন ক্ষমতায় ছিলাম তখন সাইফুর রহমান সাহেবের সুষম্য বন্টনের পলিসির কারণে  বৈষম্য ছিলো গরিবের চেয়ে ধনীর গড় আয় ৩০ গুণ বেশি ছিলো।  আর সেই হিসাব এখন পরিসংখ্যান ব্যুরোই বলছে, যেখানে ৩০ গুণ ছিলো সেটা এখন বর্তমানে ১৪৩ গুণ বেশি হয়েছে। অর্থাৎ ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণে সাইফুর রহমান বেশি গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলেন, আমাদের সময়ে, সাইফুর রহমান সাহেবের সময় উন্নয়নের ব্যাপারে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন সবচাইতে বেশি হয়েছে, অর্থ সেখানে বেশি দিয়েছেন। আজকে ওই গ্রামীণ অবকাঠামো খুঁজে দেখেন সেই জায়গায় কোনো বরাদ্দ নাই। পদ্মাসেতুতে আছে, ফ্লাইওভারে আছে, মেট্রোরেলে আছে। বিদেশিরা কাজটা পাচ্ছে, তারা টাকা নিয়ে গেছে, মালামাল তাদের দেশের থেকে নিয়ে যাচ্ছে। আজকে সুষম বন্টন বন্ধ হয়ে গেছে। সাইফুর রহমান সাহেবকে ওই ভাবে আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে। সরকার ধনিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করছে বলেও কঠোর সমালোচনা করেন খন্দকার মোশাররফ।
বিএনপি নেতা কাইয়ুম চৌধুরী ও এজিএম শামসুল হকের পরিচালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও মরহুম  নেতার পুত্র সাবেক সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান প্রমুখ।

  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট