ভারতে নির্যাতন বন্ধে ঢাকায় মুসলিমদের ঢল

প্রকাশিত: ৫:০১ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০১৯

ভারতে নির্যাতন বন্ধে ঢাকায় মুসলিমদের ঢল

সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের নির্যাতন বন্ধের প্রতিবাদে ঢাকার রাজপথে ঢল নেমেছে ইসলামী আন্দোলনের ব্যানারে বাংলাদেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের।

ভারতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর মিথ্যা অজুহাতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের জুলুম-নির্যাতন, খুন ও গরু-জবাইসহ ধর্মীয় বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে বাধা প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবাদস্বরূপ বাংলাদেশে অবস্থিত ঢাকার ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচির অংশ হিসেবেই এই বিপুল সংখ্যক মুসলিমদের ঢল নামে।

মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) সকাল ১০টায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ চত্বরে কুরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ক্রমেই ইসলামপন্থি নেতাকর্মীতে ভরে ওঠে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণ।

পরে বিক্ষোভ মিছিলটি বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের সামনে থেকে রাজধানীর নয়াপল্টন মোড় পর্যন্ত এলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কর্মীদের বাধা দেয় পুলিশ। এতে সেখানেই মিছিল শেষ করতে বাধ্য হয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে পুলিশের বাধার মুখে শেষ হয় এই বিক্ষোভ মিছিল।

ভারতে মুসলিম হত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিলের আগে এক সমাবেশে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দেন। এ সময় নানা স্লোগান দেন দলের কর্মীরা। এরপর সমাবেশ শেষে স্মারকলিপি প্রদানের উদ্দেশ্যে ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে দলটি।

ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম।

চরমোনাই পীর বলেন, ‘পুলিশ আমাদের যেতে দিচ্ছে না। তারা আমাদের অনুরোধ করেছে, যাতে আমরা এখানেই মিছিল শেষ করি। যাতায়াতের সুবিধার্থে তাই পল্টন মোড়েই মিছিল শেষ করেছি।’

তবে তাদের একটি প্রতিনিধিদল ভারতীয় দূতাবাসে স্মারকলিপি নিয়ে যাবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে আমরা ভারত সরকারকে অনুরোধ করব, যাতে করে মুসলিম হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করা হয়।

এ সময় ভারতে মুসলিম নির্যাতন বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়ে চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেন, ভারতে মুসলিম নির্যাতন বন্ধ না হলে সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের সঙ্গে নিয়ে আমরা অন্য চিন্তাভাবনা করব।

এ দিকে জনগণের দুর্ভোগের কারণে মিছিল আটকে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি জানিয়ে মতিঝিল জোনের এডিসি এস এম শিবলী নোমান বলেন, রাস্তায় মানুষের দুর্ভোগের কারণে মিছিলটি পল্টন মোড়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। এখন তারা রাস্তা ছেড়ে দিয়েছে।

এর আগে গত ৫ জুলাই ভারতে মুসলিম নিধন বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল এবং পরের ১১ জুলাই গোলটেবিল বৈঠক ও ১৩ জুলাই দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন শেষে দূতাবাস অভিমুখে গণমিছিল কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

প্রসঙ্গত, ভারতে সম্প্রতি গো-রক্ষার নামে মুসলিম নির্যাতন ও হত্যা, জোরপূর্বক জয় শ্রীরাম বলতে মুসলিমদের বাধ্য করা এবং না বললে অমানবিক নির্যাতন এমনকি হত্যার ঘটনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটিতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এসব ঘটনা মূলত ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এতে বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার মুখেও পড়েছে দেশটি।

ভারতে মুসলিমদের ওপর ক্রমবর্ধমান নিপীড়নের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্রিটেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লেখা এক চিঠিতে প্রভাবশালী এমপি জোনাথান অ্যাশওয়ার্থ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলে ভারতে মুসলিমদের ওপর চলমান বিদ্বেষ ও সহিংস আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। নির্যাতন-নিপীড়নে সেখানে প্রচণ্ড উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

ধর্মীয় উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে হত্যাকাণ্ড, হামলা-আক্রমণ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বৈষম্য-অসম, ঘরবাড়ি ভাংচুর, ব্যক্তির ধর্মবিশ্বাস ও প্রার্থনায় বাধা প্রদান প্রভৃতি ঘটনার সুস্পষ্ট রিপোর্ট রয়েছে।

কিন্তু এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে ভারত সরকার। মুসলিমদের ওপর সহিংস আক্রমণের ঘটনায় সাড়া দিতে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অ্যাশওয়ার্থ। খবর দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের।

২০১৪ সালে কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির ক্ষমতায় আসার পরই মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন বৃদ্ধি পায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন বলছে, গত ৩ বছরে গোরক্ষার নামে ১২ রাজ্যে হত্যা করা হয় ৪৪ জনকে। যার ৩৬ জনই মুসলমান। চলতি বছর বড় জয়ের মধ্যদিয়ে ফের সরকার গঠন করে মোদির দল। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই কয়েকটি ভয়াবহ মুসলিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত মাসে ভারতের ঝাড়খন্ড প্রদেশে এক মুসলিম যুবককে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করে দেশটির উগ্রপন্থী হিন্দুরা।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা-সংক্রান্ত রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়, ২০১৮ সালেও ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষত মুসলমানদের ওপরে হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হিংসাত্মক আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে।

  •