গ্যাসের জন্য বিদ্যুতের খরচ বাড়ছে ১৮০০ কোটি টাকা

প্রকাশিত: ২:৪০ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৮, ২০১৯

গ্যাসের জন্য বিদ্যুতের খরচ বাড়ছে ১৮০০ কোটি টাকা

আলী মামুদ : গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিদ্যুতের মূল্যও বাড়বেÑ যার ফলে জীবনযাত্রার সর্বক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়বে। কারণ গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালাতে খরচ বছরে বাড়বে প্রায় ১৮ শ’ কোটি টাকা। (১৭.৭৫ বিলিয়ন টাকা)। বর্তমানে দেশে ১৩২ টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ দেয়া হয় যার অর্ধেকই গ্যাসভিত্তিক। তবে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিজনিত মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এখন পর্যন্ত কোনো চিন্তা-ভাবনা শুরু করেনি বলে এর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানান। পিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ বিদেশে রয়েছেন বলে তার ভাষ্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ এ বিষয়ে পর্যালোচনা করছে বলে জানা যায়। গ্যাসের বদলে কয়লার ব্যবহার জায়েজ করার সুযোগ নেবে সরকার।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অধিকাংশ এখনো গ্যাসভিত্তিক হলেও এর বিকল্প সোর্সসমূহ কাজে লাগানো যায়নি। সৌর বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎসহ পরিবেশ সুহৃদ বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দেয়া হয়। কিন্তু তা এখনো অবাস্তবায়িত। পিডিবি সূত্রেই জানা যায় এ পর্যন্ত মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় রিনায়েবল বিদ্যুৎ। বর্তমান সরকার গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কয়লা ব্যবহারের বিষয়ে অতিউৎসাহী। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের খুবই কাছাকাছি রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ দ্রুতবেগে চলছে। এতে সালফারের পরিমাণ বেশি নিম্নমানের কয়লা ব্যবহারের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা সরবরাহ ঠিকাদার বাছাইয়ের কাজ চলছে।
এদিকে গত ১ জুলাই থেকে গ্যাসের মূল্য কার্যকর হয়েছে। সূত্র মতে, গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে গত ৩০ জুনে বিল দাঁড়ায় ৯৭.৫২ মিলিয়ন টাকা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটারি কমিশন (বিইআরসি)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ গত বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ছিল ১৪০ বিলিয়ন টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে ডুয়েল-ফুয়েল (গ্যাস ও ডিজেল) বিদ্যুৎ কোম্পানির বৃদ্ধি পায় ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণেও।
একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে জলবিদ্যুৎ (কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ) দিয়েই বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। জলবিদ্যুৎ নিশ্চয়ই ছিল পরিবেশ সুহৃদ। স্বাধীনতা-উত্তরকালে জলবিদ্যুতের উন্নয়ন ঘটেনি। বরং ‘ফসিল-ফুয়েলে’র ব্যবহার বাড়তে থাকে। সোলার পাওয়র নিয়ে অনেক সভা-সমাবেশ হয়েছে, কিন্তু তার উৎপাদন খুবই কম। পিডিবি এ ব্যাপরে উদাসীন বলেই মনে হয়। পিডিবির মতিঝিল ভবনের ছাদেও একটি বেসরকারি পাওয়ার কোম্পানির সোলার স্থাপনা লক্ষ্য করা যায়। পিডিবির একটি মহল কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের জন্য যতখানি উৎসাহী সোলার পাওয়ারের বিষয়ে ততটা আগ্রহী নয়। অথচ পরিবেশসম্মত সোলার পাওয়ারের জন্য বাংলাদেশ একটি উপযুক্ত স্থান বটে। গত এক দশকে সোলার পাওয়ারের অগ্রগতি তেমন নেই। এমন কি গত ১০ বছরে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানেরও সাফল্য নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এমন মন্তব্যও করেছেন।
সরকারের এক হিসাবে জানা যায়, দেশের ১২৪ টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন মতা ১৭৪৩ মেগাওয়াট। এর সঙ্গে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট অর্থাৎ যা শিল্পকারখানার নিজস্ব ব্যবস্থায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ তা থেকে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়াও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পাওয়া যাচ্ছে ২৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। সে হিসাবে মোট উৎপাদন মতা ২০,১৩৩ মেগাওয়াট। যদিও সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গড়ে প্রায় সাড়ে ১১,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সরবরাহ করতে পারে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়ে বর্তমান সরকার ২০১৬ সালে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। তাতে ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ল্য স্থির করা হয়েছে। কিন্তু এই পরিকল্পনা থেকে এখনো অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মিডিয়াকে বলছেন, এই সফলতার পেছনে সরকারকে নির্ভর করতে হয়েছে আমদানিকৃত তরল জ্বালানি নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর, যার খরচ অনেক বেশি।
‘বড় ধরনের যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র মূলত যেগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সেগুলো সব পিছিয়ে আছে। যত জ্বালানি আছে তার মধ্যে কয়লাই সবচেয়ে সাশ্রয়ী জ্বালানি। সেই সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবহারে ব্যর্থ হওয়ায় আমাদেরকে তেলের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হচ্ছে।
খরচ বেশি হওয়ায় তরল জ্বালানি নির্ভর এই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ব্যবস্থা বলে মনে করেন না।

  •