সুশাসনের অভাবে এমন নৃশংসতা বেড়েছে

প্রকাশিত: ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৯, ২০১৯

সুশাসনের অভাবে এমন নৃশংসতা বেড়েছে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে দিনদুপুরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে প্রতিপক্ষকে হত্যা, মাদ্রাসা ছাত্রীকে দল বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, সেনা সদস্য ও তার মাকে হত্যাসহ চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেই চলছে। প্রায় প্রতিদিনই পিলে চমকানো এসব ঘটনার পর বলা হচ্ছে, সুশাসনের অভাবেই এমন নৃশংস ঘটনা ঘটছে। নৃশংস ঘটনা ঘটার সময় সারি সারি দর্শক দাঁড়িয়ে থেকেছে। ভুক্তভোগীর স্ত্রী চিৎকার করে সাহায্য চাইলেও কেউ এগিয়ে আসেনি রক্ষায়। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।
এদিকে সুশাসনের অভাবে দেশে নৃশংসতা বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। উল্লেখ্য, রাজধানী ঢাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে বিশ্বজিতের মতো এবার বরগুনায় নৃশংসভাবে খুন হলো রিফাত (২৫)। স্ত্রীকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ যুবককে কুপিয়ে হত্যার সময় স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি বারবার বাধা দিতে গিয়েও স্বামীকে হায়েনাদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। রিফাতকে হত্যার সময় সড়কে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে এ ধরনের হত্যাকান্ড কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না রিফাতের পরিবার। রিফাত হত্যার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এ হত্যাকান্ডের একটি ভিডিওতে রিফাতকে এলোপাতাড়ি কোপাতে দেখা গেছে কয়েকজন যুবককে। এসময় স্বামীকে বাঁচাতে স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি দুই যুবককে বারবার প্রতিহতের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। কিন্তু তার পাশেই দাঁড়িয়ে অন্যরা এ দৃশ্য দেখলেও কেউ এগিয়ে আসেননি।
রিফাত হত্যার ঘটনার দিন বুধবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বিউটি আক্তার (৪০) নামে সংরক্ষিত নারী ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার পশ্চিমগাঁও এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত বিউটি আক্তারের বাড়ি রূপগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমগাঁও এলাকায়। তিনি কায়েতপাড়া ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নারী ইউপি সদস্য ছিলেন।
এলাকাবাসী ও পুলিশ জানায়, বুধবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে বিউটি আক্তার উপজেলার চনপাড়া এলাকা থেকে পশ্চিমগাঁও এলাকার দিকে হাঁটতে বের হন। তিনি কুট্টি পশ্চিমগাঁও এলাকায় পৌঁছালে একদল দুর্বৃত্ত তার ওপর হামলা চালিয়ে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দিলে লাশ উদ্ধার করা হয়। রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বিউটির মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন আছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। কী কারণে কে বা কারা তাকে হত্যা করেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুষ্টিয়ার খোকসায় মডেল টাউন এলাকার সাবিনা ইয়াসমিন (৪৮) নামে নারীকে তার নিজ বাড়িতে ঢুকে খুন করেছে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানায়, স্বামী পরিত্যক্তা সাবিনা ইয়াসমিনের তিন সন্তান রয়েছে। তারা সবাই ঢাকায় থাকেন। বুধবার রাত থেকে তার সন্তানরা মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তারা হামিদা খাতুন নামের এক প্রতিবেশীকে জানান। ওই প্রতিবেশী রাত সাড়ে ১০টায় বাড়িতে গিয়ে দেখতে পান বারান্দায় মৃতদেহ পড়ে আছে। তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে ঘরের বারান্দায় কাঁথা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল। পরিবারের দেওয়া খবর পেয়ে সেখানে খোকসা থানা পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। গতকাল শুক্রবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠানো হয়। সাবিনার ছেলে বাঁধন দাবি করেন, তার মা টাকা দাদন দিতেন। টাকা নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে এ খুনের ঘটনা ঘটতে পারে। বুধবার রাত থেকে তারা ফোনে মা কে না পেয়ে তার নিকট হামিদাকে দিয়ে মায়ের সন্ধানের চেষ্টা করে। পরে তার মাধ্যমে মায়ের খুনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
এর আগে গত এপ্রিলে মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলার সূত্র ধরে ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল সে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যায়। এ হত্যাকান্ড ঘটনোর প্রমাণ মেলে এবং এ ভয়ংকর অপরাধের কথা স্বীকার করে স্থানীয় সরকারি দলের নেতারা। ২০১৬ সালের ৫ জুন নগরীর জিইসি মোড়ে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে মিতুকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নগরীর পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত করলেও পরে নগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে মামলার তদন্তভার ন্যস্ত করা হয়। মিতু হত্যার বিচারের দাবিতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন ও মা শাহেদা মোশাররফ। দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়ার দাবি জানান তারা।
সাগর সরওয়ার এবং মেহেরুন রুনি এই সাংবাদিক দম্পতিকে ঢাকায় পশ্চিম রাজাবাজার এলাকায় তাদের বাসায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। ঘটনার সময় ওই বাসায় থাকা তাদের একমাত্র শিশু সন্তান মাহি সরওয়ার মেঘ বেঁচে যায়। এ ঘটনায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ২৪ ঘন্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেফতারের সময়সীমা বেঁধে দিলেও তা বাস্তবে রূপ পায়নি আজও। হত্যাকান্ডের পর সাত বছরে তদন্তে অগ্রগতি নেই। এমন পরিস্থিতিতে সান্ত¡না পাওয়ার পথও খুঁজে পাচ্ছে না সাংবাদিক দম্পতির বিপর্যস্ত পরিবার দুটো। মেহেরুন রুনির ভাই নওশের রোমান বলছিলেন, তাদের মাঝে একদিকে রয়েছে শূন্যতা, অন্যদিকে হতাশা তৈরি হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৬৬ বার সময় নিয়েও আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি দতন্ত কর্মকর্তারা।২০১৬ সালের মার্চ মাসে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে খুন হন ১৯ বছর বয়সী কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী তনু।  তনুর বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে চাকরিরত ছিলেন। ২০ মার্চ তনুর মৃতদেহ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে পাওয়া যায়। প্রাইভেট টিউটরের কাছে এক বাসায় পড়তে গিয়ে তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন তিনি। কুমিল্লা শহরের কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে তনুর বাবা ইয়ার হোসেন একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ মামলাটি গোয়েন্দাদের কাছে হস্তান্তর করে। ২০১৬ সালের পহেলা এপ্রিল মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তরিত করা হয়। ৪ এপ্রিল প্রকাশিত ময়নাতদন্তে বলা হয়, তনুকে ধর্ষণ কিংবা হত্যার কোন আলামত পাওয়া যায়নি। উক্ত ময়নাতদন্তে বিতর্কের সৃষ্টি করলে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত পুনরায় ময়নাতদন্তের রায় দেন। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে তনুর মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। কুমিল্লার মির্জাপুরে তনুর লাশ দাফন করা হয়। সমাজে এসব ঘটনা নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেছেন, সুশাসন ও ন্যায়বিচার নেই বলে দেশে সামাজিক অপরাধের ঘটনা ঘটছে। কোনো হত্যার বিচার নেই, কারণ বিচারব্যবস্থা বলতে কিছু নেই। তিনি বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাতকে যেভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে এ ঘটনা ঘটেছে (রিফাত হত্যা) সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষ পর্যন্ত এগিয়ে আসেনি। সমাজের সব মূল্যবোধ হারিয়ে গেছে, আজ নৈতিকতা কোথায়।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের মওলানা আকরাম খাঁ হলে নাগরিক অধিকার আন্দোলন ফোরাম আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান একথা বলেন। সেলিমা রহমান বলেন, আজ সমাজের এ অবস্থা কেন। নৈতিকতা কোথায়। সমাজে যে মূল্যবোধ ছিল সেই মূল্যবোধ আজ কোথায় হারিয়ে গেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের নামে, মেগা মেগা প্রজেক্টে দুর্নীতি করে সমস্ত মূল্যবোধ হারিয়ে রাষ্ট্র যখন অনৈতিক কাজে লিপ্ত, তখন সাধারণ মানুষও বিবেকবোধ হারিয়ে ফেলেছে। তিনি বলেন, আজ মানুষের বাকস্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, জনগণের অধিকার নেই। সংবাদমাধ্যমকর্মী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী থেকে সাধারণ জনগণ সবাই আতঙ্কগ্রস্ত। কেউ কথা বলার সাহস পায় না। সবাই বলে কথা বললে ধরে কারাগারে নিয়ে যাবে। আজ সবাই নির্যাতিত হচ্ছে। সবাইকে কারাগারে বন্দি করা হচ্ছে। জনগণের প্রতি চরম অবজ্ঞার কারণে আজ দেশের এই অবস্থা। আপনারা দেখেছেন দেশের দুর্নীতি আজ কোন পর্যায়ে চলে গেছে। দুর্নীতিবাজ ডিআইজি মিজান ও দুদক কর্মকর্তা একে অপরকে দুর্নীতিবাজ বলছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সংসদে অসত্য ভাষণ দিয়েছেন। রূপপুরের বালিশকান্ড নিয়ে বিএনপির ওপর দোষ চাপানোর জন্য এমন কথা কি প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বেগম খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, আমি অবিলম্বে তার মুক্তি দাবি করছি। ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি ন্যায়বিচার এবং বেগম খালেদা জিয়া’ শীর্ষক এ মতবিনিয়ময় সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের উপদেষ্টা হাজি মো. মাসুক মিয়া। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সভাপতি মাওলানা শাহ মো. নেসারুল হক, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, মো. ফরিদ উদ্দিন প্রমুখ।

  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট