ফেনীর অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান আর নেই

প্রকাশিত: ১১:৪৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০১৯

ফেনীর অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান আর নেই

পাঁচদিন একটানা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে চলে গেলেন ফেনীর আগুনে দগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (১৮)। বুধবার (১০ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৯টার সময় তার মৃত্যু হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রের আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন।

প্রসঙ্গত, ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতর ওই ছাত্রীর (১৮) গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যাচেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। গত শনিবার সকালে সোনাগাজী পৌর এলাকার ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। ওই ছাত্রী ওই মাদ্রাসা থেকেই আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।

পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত কক্ষ থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে কয়েকজন বোরকাপরা নারী পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরা।

তারা জানান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে দায়ের করা মামলা তুলে না নেয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ তথ্য ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় পুলিশকেও জানিয়েছেন ওই শিক্ষার্থী। তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় এদিন বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ১০২ নম্বর কক্ষে ভর্তি করা হয়।

পরে তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়।তাকে লাইফসাপোর্ট দেয়া হয়েছে। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করতে মঙ্গলবার তার অস্ত্রোপচারও হয়।অস্ত্রোপচারের পরও তাকে নিয়ে শঙ্কা কাটেনি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করেন ওই ছাত্রীর মা। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৭ মার্চ সকাল ১০টার দিকে অধ্যক্ষ তার অফিসের পিয়ন নূরুল আমিনের মাধ্যমে ছাত্রীকে ডেকে নেন।

পরীক্ষার আধাঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই ছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন অধ্যক্ষ। পরে পরিবারের দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হন অধ্যক্ষ। সেই মামলা তুলে না নেওয়ায় অধ্যক্ষের লোকজন ওই ছাত্রীর গায়ে আগুন দিয়েছে।

যেভাবে পোড়ানো হয় নুসরাতকে

নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান গণমাধ্যমের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন।

নোমান বলেন, ৬ এপ্রিল ছিল আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষা। সকালে বোনকে নিয়ে পরীক্ষার হলে বসিয়ে দেওয়ার জন্য মাদ্রাসায় ঢোকার সময় মাদ্রাসার অফিস সহকারী মোস্তফা তাঁকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেন। নুসরাত পরীক্ষার হলে বসলে সাড়ে ৯টার দিকে অধ্যক্ষের পক্ষের কয়েকজন ছাত্রী নুসরাতকে ডেকে ছাদে নিয়ে যায় এবং মামলা উঠিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ দেয়। নুসরাত তাতে রাজি না হওয়ায় তাঁর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন নিয়ে নুসরাত নিচে দৌড়ে এলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠান।

অধ্যক্ষের কক্ষে যা ঘটেছিল

নুসরাতের মাদ্রাসায় দশম শ্রেণিতে পড়ে ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান। দগ্ধ বোনের বরাত দিয়ে সে জানায়, গত ২৭ মার্চ দুপুর পৌনে ১২টার দিকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা তাঁর পিয়ন নুরুল আমিনকে দিয়ে নুসরাতকে অধ্যক্ষের রুমে ডেকে নেন। নুসরাত তখন আরো তিন-চারজন বান্ধবীকে নিয়ে অধ্যক্ষের রুমে ঢুকতে চাইলে শুধু তাঁকে ঢুকতে দেন পিয়ন। এরপর দরজা আটকে অধ্যক্ষ বিভিন্ন প্রলোভন দেখান। ১ এপ্রিল আলিম পরীক্ষার আধা ঘণ্টা আগে তাঁকে প্রশ্ন দেওয়া হবে, যদি তিনি অধ্যক্ষের কুপ্রস্তাবে রাজি হন। এরপর অধ্যক্ষ নুসরাতের শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর নুসরাত দৌড়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে বাইরে গিয়ে অচেতন হয়ে পড়ে যান।

এরপর মাদ্রাসায় থাকা ছোট ভাই রায়হানকে খবর দেওয়া হলে সে বোনের কাছে যায়। এরপর অধ্যক্ষ তাকে জানান, তার বোন অসুস্থ। অসুস্থ থাকার কারণে অধ্যক্ষের কাছে এসেছিল ছুটির আবেদন করতে। এখানে এসে আবার সে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

সেখান থেকে নুসরাতকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর কিছুটা সুস্থ হলে স্বজনদের জানান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ তাঁর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেছিলেন। এরপরে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বজনরা মাদ্রাসায় গিয়ে অধ্যক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তবে তিনি ওই অভিযোগ অস্বীকার করেন। এরপর মাদ্রাসা অধ্যক্ষ উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতাকে ফোন দেন। আওয়ামী লীগের নেতা পুলিশসহ মাদ্রাসায় যান। তবে মাদ্রাসায় গিয়ে সব ছাত্রছাত্রীর মাধ্যমে সত্য ঘটনা জানতে পেরে পুলিশ অধ্যক্ষকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এরপর নুসরাতের মা বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় পরের দিন তাঁকে আদালত পাঠানো হয়। আদালত তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠান। আজ আদালত তাঁর সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রায়হান আরো জানায়, ৬ এপ্রিল সকালে মাদ্রাসায় গেলে এক ছাত্রী তাঁর বোন নুসরাতকে বলে যে তাঁর বান্ধবী নিশাতকে কারা যেন ছাদে মারধর করছে। পরে নুসরাত মাদ্রাসার তৃতীয় তলার ছাদে গেলে সেখানে বোরকাপরা ও হাতে মোজা লাগানো চার ছাত্রী তাঁকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেয়। বলে, মামলা তুলে না নিলে তাঁকে মেরে ফেলা হবে। এরপর নুসরাত মামলা তুলে নেওয়ার কথা প্রত্যাখ্যান করে তাঁর শ্লীলতাহানির চেষ্টার বিচার দাবি করেন। পরে ওই চারজন তাঁর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর তারা পালিয়ে যায়।

  •