‘আমাদেরকে ফের সুযোগ দিন, ইনশা আল্লাহ এই বাংলাদেশ আর পিছিয়ে থাকবে না’

প্রকাশিত: ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৩০, ২০১৮

‘আমাদেরকে ফের সুযোগ দিন, ইনশা আল্লাহ এই বাংলাদেশ আর পিছিয়ে থাকবে না’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দেশবাসীকে অনুরোধ করব যে আপনারা আমাদের ভোট দিন। আবার সেবা করার সুযোগ দিন। ইনশা আল্লাহ এই বাংলাদেশ আর পিছিয়ে থাকবে না।’

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং দেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে আরো কিছুটা সময় প্রয়োজন। এ কারণে আগামী নির্বাচনে আবারও নৌকায় ভোট দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

আবারও ক্ষমতায় এলে দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত করে উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী।

সোমবার রাতে দশম জাতীয় সংসদের সমাপনী ভাষণে এসব কথা বলেন শেখ হাসিনা।

দশম জাতীয় সংসদের ৪১০ কার্যদিবসে মোট ১৯৩টি রেকর্ডসংখ্যক আইন পাস হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু আইন পাসেই নয়, এবারের সংসদে অশালীন কোনো ভাষা ব্যবহার হয়নি। তাই সংসদ সম্পর্কে মানুষের বিরূপ ধারণা দূর হয়েছে। গণতন্ত্রের ভিত মজবুত হয়েছে।’

সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরে আগামীতে আবারও সরকার গঠনের সুযোগ চান প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই যে মেগাপ্রজেক্টগুলো আমরা নিয়েছি, বড় বড় প্রজেক্টগুলো আমরা নিয়েছি, এই যে বাংলাদেশের মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চাই, আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তোলার যে পদক্ষেপগুলো আমরা নিয়েছি সেগুলো সমাপ্ত করার জন্য আরো কিছু সময় আমাদের প্রয়োজন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘গত ১০ বছরে তরুণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর আগামী গড়তে যে পরিশ্রম করেছেন, সুফল আসতে শুরু করেছে।’

আগামীতে ক্ষমতায় গেলে দেশকে দারিদ্র্য ও দুর্নীতিমুক্ত করার পাশাপাশি যেসব উন্নয়ন করা হবে সে পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন সংসদনেত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা থেকে অতিদ্রুত যেন চট্টগ্রাম যাওয়া যায়, ঢাকা থেকে অতিদ্রুত দিনাজপুর আমরা চলে যাব। আমরা দক্ষিণে চলে যেতে পারব। দ্রুতগতির রেল আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারব। ঢাকা থেকে খুলনা দ্রুতগতিতে আমরা চলে যেতে পারব। সেভাবে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। সব নদী ড্রেজিং করে নৌপথ সচল করা পরিকল্পনা আছে। ব্যবসা বাণিজ্য যাতে বৃদ্ধি পায়। কারণ সমগ্র বাংলাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে। দেশি –বিদেশি বিনিয়োগ হবে। ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল যখন গড়ে উঠবে কর্মসংস্থানের কোনো অভাব হবে না।’

সংসদের সুন্দর পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকেও ধন্যবাদ জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আবার আসিব ফিরে, ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়। আবার আসিব ফিরে এই সংসদে।’

আগামীর পথ রচনায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে স্পিকারের আহ্বান
দশম জাতীয় সংসদের ২৩তম অধিবেশন সোমবার শেষ হয়েছে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের অধিবেশন সমাপ্তি সম্পর্কিত ঘোষণা পাঠের মাধ্যমে অধিবেশন সোমবার শেষ হয়।

এর মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত দশম জাতীয় সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনেরও সমাপ্ত হলো। দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। সে থেকে এ পর্যন্ত এ সংসদের মোট ২৩টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ ২৩টি অধিবেশনে মোট ৪১০টি কার্যদিবস অতিবাহিত হয়েছে। এসব অধিবেশনে সর্বোচ্চ ১৯৩টি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই আইনে পরিণত হয়ে কার্যকর হয়েছে।

এর আগে আজ সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমাপনী ভাষণ দেন। এছাড়া বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খানন মেনন এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ ও জাতীয় পার্টির রুস্তম আলী ফরাজী সমাপনী বক্তব্য দেন।

দশম জাতীয় সংসদের সমাপনী অধিবেশনে স্পিকার সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রেখে আলোয় উদ্ভাসিত সমৃদ্ধ আগামীর পথ রচনার মধ্য দিয়ে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, দশম জাতীয় সংসদ সফলভাবে পূর্ণ মেয়াদ পূরণ করায় এক অনন্য সোপান রচনা করেছে। এ সংসদে সরকারি ও বিরোধীদল সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এতে সংসদীয় গণতন্ত্র সুদৃঢ় হয়েছে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সুনিশ্চিত হয়েছে।

তিনি বলেন, সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিক-নির্দেশনা, পরামর্শ দশম জাতীয় সংসদ সাফল্যের সাথে পূর্ণ মেয়াদ পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে সংসদ কার্যকর ভূমিকা রাখতেও সক্ষম হয়েছে। এ জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক অভিবাদন জানান।

শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, বিরোধীদলের নেতা হিসেবে বেগম রওশন এরশাদ এ সংসদকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সংসদ বর্জন করার মতো কোন ঘটনা জাতি প্রত্যক্ষ করেনি। বরং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করে সংসদকে কার্যকর করতে সহায়তা করেছেন।

তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্র নিশ্চিতকরণের মধ্যদিয়ে দেশকে উন্নয়নের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্ব সভায় আত্মমর্যাদাশীল আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়োজন একটি কার্যকর সংসদ। পর পর দু’বার জাতীয় সংসদ মেয়াদ পূর্তি গণতন্ত্রকে সুসংহত করেছে। গণতন্ত্রের নিরবচ্ছিন্ন চর্চার মধ্যদিয়ে কেবলমাত্র কাঙ্খিত উন্নয়ন সম্ভব। গণতন্ত্রকে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আগামী দিনেও প্রতিটি সংসদকে মেয়াদ পূর্তির মধ্যদিয়ে এগিয়ে চলতে হবে।

তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করতে হলে সংবিধানের মূলনীতি ও মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে হবে। গণতন্ত্রে মতপার্থক্য, মতদ্বৈততা বা ভিন্নমত থাকতে পারে, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্য ও বৈশিষ্ট্য।

মতপার্থক্য নিরসনে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা ও বিতর্ক চলমান থাকবে। কিন্তু সংবিধানের মূলনীতি মূল্যবোধ ও আদর্শসহ মৌলিক বিষয়গুলোকে ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের আলোকে জাতীয় সংসদকে সমুন্নত রাখতে হবে।

স্পিকার বলেন, সংবিধানের আলোকে জাতীয় সংসদের মর্যাদা অক্ষুণœ রাখা, স্বাধীনতার চেতনা সমুন্নত রাখা। দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত, শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, দেশের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তুলতে হবে। সাথে সাথে আইনের শাসনকে সমুন্নত রেখে গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে উন্নয়নের কাঙ্খিত লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সকলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য ও সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে।

স্পিকার সংসদের ২৩তম অধিবেশন পরিচালনায় সহযোগিতা করায় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সংসদ উপনেতা, চিফ হুইপসহ হুইপগণ, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, সকল সংসদ সদস্য, ডেপুটি স্পিকার ও সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, মিডিয়া কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান।

দশম জাতীয় সংসদের ২৩তম অধিবেশন ২১ অক্টোবর শুরু হয়। মোট ৮টি কার্যদিবসের এ অধিবেশনে ১৯টি সরকারি বিল পাস হয়। এর মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল, ২০১৮, সড়ক পরিবহন বিল, ২০১৮সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল রয়েছে।।

আইন প্রণয়ন সম্পর্কিত কাজ সম্পাদনের পাশাপাশি কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধিতে ১৫৪টি নোটিশ পাওয়া যায়। নোটিশগুলো থেকে ৩টি গৃহীত নোটিশের মধ্যে ১টি আলোচিত হয়। এছাড়া ৭১ (ক) বিধিতে দুই মিনিটের আলোচিত নোটিশের সংখ্যা ছিল ৪৫টি।

এছাড়া এ অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবিক ও উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদানে ‘ইন্টার প্রেস সার্ভিস নিউজ এজেন্সি, ইউএন থেকে ‘হিউম্যানিটেরিয়ান এ্যাওয়ার্ড’ এবং গ্লোবাল হোপ কোয়ালিশন থেকে ‘স্পেশাল ডিস্টিংকশন এ্যাওয়ার্ড ফর লিডারশিপ’ সম্মাননা দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে ধন্যবাদ জানানো হয়।

দশম জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালীর বিধির ১৪৭ বিধি অনুযায়ী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে ১৬টি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়।

এ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য সর্বমোট ৫৯টি প্রশ্ন পাওয়া যায়। তার মধ্যে তিনি ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দেন। মন্ত্রীদের জন্য আনা ৯২৪টি প্রশ্নের মধ্যে ৫৯২টি প্রশ্নের জবাব দেন।

সমাপনী ভাষণের পর স্পিকার দশম জাতীয় সংসদের ২৩তম অধিবেশন সমাপ্তি সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠ করেন।- বাসস