মার্কিন দূতাবাস ও জাতিসংঘের বিবৃতি অযাচিত, অনাকাঙ্ক্ষিত : ইনু

প্রকাশিত: ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৮, ২০১৮

মার্কিন দূতাবাস ও জাতিসংঘের বিবৃতি অযাচিত, অনাকাঙ্ক্ষিত : ইনু

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুনিরাপদ সড়কের দাবিতে শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন নিয়ে বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস ও জাতিসংঘের বাংলাদেশের কার্যালয় থেকে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, সেটি অযাচিত ও অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তথ্যমন্ত্রী ইনু এসব কথা বলেন। এসময় ইনু বলেন, আন্দোলনে কর্তব্যরত সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে আজই চিঠি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া মার্কিন দূতাবাস ও জাতিসংঘের বাংলাদেশের কার্যালয় থেকে দেয়া বিবৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

হাসানুল হক ইনু বলেন, ধানমন্ডিতে যে সংঘর্ষ হয়েছে, এটা বাস্তব ঘটনা। কিন্তু আন্দোলন ও শিশুদের ওপর কোনো আক্রমণ হয়নি। ঢাকা শহরের দুই-তিন জায়গায় বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশ সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে মার্কিন দূতাবাস যে বক্তব্য দিয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। মার্কিন দূতাবাসের বিবৃতিতে শিশুদের আন্দোলনকে বর্বরোচিত হামলার মধ্য দিয়ে দমন করার যে কথা বলা হয়েছে, তেমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। মার্কিন দূতাবাস ঢাকা শহরের বাস্তব চিত্রের বাস্তব প্রতিফলন করেনি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই বিবৃতির মধ্য দিয়ে মার্কিন দূতাবাস বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শিষ্টাচারবহির্ভূত নাক গলানোর অপপ্রয়াস করেছে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের বাংলাদেশের প্রধানও এ ধরনের একটি বিবৃতি দিয়েছেন। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সঠিক বিবৃতি নয়। সরকারের পক্ষ থেকে তথ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি জাতিসংঘের এই বিবৃতিকে অনভিপ্রেত ও অযাচিত বলে মনে করেন। তিনি আশা করেন, তারা এ ধরনের বিবৃতি আর দেবেন না এবং বাংলাদেশের প্রকৃত ঘটনার ভিন্ন চিত্রায়ণ করবেন না। এ বিষয়ে সরকারের বক্তব্য লিখিতভাবে দুই দপ্তরে পাঠানো হবে বলেও জানান তথ্যমন্ত্রী।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের শেষের দিকে কিছু জায়গায় কর্তব্যরত সাংবাদিকদের ওপর যে হামলা হয়েছে, তা দুঃখজনক। হামলাকারীদের চিহ্নিত করার জন্য এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আজই চিঠি দেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মৌখিকভাবেও ইতিমধ্যে আশ্বাস দিয়েছেন যে তিনি পদক্ষেপ নেবেন।

এর আগে মার্কিন দূতাবাস ও জাতিসংঘের ঢাকাস্থ আবাসিক প্রতিনিধি পৃথক বিবৃতিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে সন্ত্রাসী হামলা ও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।

ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস বলছে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী চলমান ছাত্র আন্দোলনে সহিংস হামলা কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না।

রবিবার মার্কিন দূতাবাসের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতি থেকে এ কথা বলা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত সপ্তাহ থেকে সড়কে উন্নত যানবাহন ও নিরাপত্তার দাবিতে স্কুল-কলেজের ছাত্রদের নেতৃত্বে বাংলাদেশব্যাপী চলমান শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন এরই মধ্যেই সারা দেশের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

দূতাবাস বলে, ‘কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে সম্পত্তি বিনষ্ট করা, বিশেষ করে বাস ও অন্যান্য যানবাহন ধ্বংসের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ওই কর্মকাণ্ড আমরা গ্রহণযোগ্য মনে করি না। কিন্তু এসবের কোনো কিছুই নিরাপদ বাংলাদেশের লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করতে থাকা হাজার হাজার তরুণের ওপর নৃশংস হামলা ও হিংস্রতাকে সমর্থন করা যায় না।’

অন্যদিকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থী ও তরুণদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ।

রবিবার বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি মিয়া সেপ্পোর এক বিবৃতিতে সংস্থাটির এমন উদ্বেগের কথা জানানো হয়। বিবৃতিতে সংস্থাটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেও পোস্ট করা হয়।

এতে বলা হয়, ‘সড়ক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা শিক্ষার্থীদের বৈধ অধিকার। সহিংসতার হুমকি পাওয়া ছাড়াই তাদের মতামত দেওয়ার অধিকার রয়েছে। দুনিয়াজুড়ে আরও ভালো সড়ক নিরাপত্তার জন্য জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চালিয়েছে। বাংলাদেশে তরুণদের প্রাণহানির একটি বড় কারণ সড়ক দুর্ঘটনা।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ২০ হাজার মানুষ নিহত হন।

জাতিসংঘ বলছে, ‘রাজধানীতে গত কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কমবয়সীরা আহত হয়েছে। এটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক। বিক্ষোভের কারণে অনেক স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, শেখার সুযোগ থেকে শিশুদের বঞ্চিত করা হয়েছে।’

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সহিংসতার খবরগুলোতে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে তরুণদের উদ্বেগ যৌক্তিক। ঢাকার মতো একটি মেগা সিটিতে এর সমাধান প্রয়োজন। শিশু, কমবয়সী মেয়ে ও নারীসহ সবার নিরাপত্তার জন্য একটি কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত। যে কোনও ধরনের সহিংসতা এড়াতে শিশু-কিশোরসহ সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে জাতিসংঘ।

প্রসঙ্গত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকাস্থ দূতাবাসের বিবৃতির পর জাতিসংঘের এই বিবৃতি আসে।

গাড়িতে হামলার বিচার ও বার্নিকাটের নিরাপত্তা চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে
এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের গাড়িতে হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিচার চেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। হামলার পর পরই বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এছাড়া বার্নিকাটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে। রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো এক কূটনৈতিক পত্রে এ অনুরোধ জানায় যুক্তরাষ্ট্র।

এদিকে একই সময় সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের বাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটে। তবে দুই দিনেও ওই ঘটনায় কাউকে সনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। তবে পুলিশ বলছে, অপরাধীকে সনাক্তের চেষ্টায় তদন্ত চলছে।

এ ব্যাপারে বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, পুলিশ চাইলে অপরাধীদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পারবে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বার্নিকাটের গাড়িতে হামলার বিবরণ দিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশকে (ডিএমপি) দেয়া পত্রের একটি অনুলিপি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দিয়েছে মার্কিন দূতাবাস। এতে বলা হয়েছে, নাগরিক অধিকার সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের বাসায় নৈশভোজে অংশ নেন মার্শা বার্নিকাট।

নৈশভোজ শেষে ফেরার পথে মোটরসাইকেল আরোহীসহ একদল সশস্ত্র লোক তার গাড়িতে হামলা চালায়।

সোমবার রাতে মোহাম্মদপুর থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর বলেন, ওই ঘটনায় বদিউল আলম মজুমদার রবিবার যে জিডি করেছেন, এতে তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো অপরাধীকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, অপরাধী শনাক্ত হলে জিডিটি মামলায় রূপান্তর হবে। এদিকে সোমবার রাতে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, হামলার ঘটনার পর আমি মোহাম্মদপুর থানায় অভিযোগ করেছি। এরপর থেকে থানা পুলিশ আমার সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ করেনি। তিনি বলেন, আমি মনে করি পুলিশ চাইলে অপরাধীকে সনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারবে।

শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের বাসায় একটি নৈশভোজে অংশ নেয়া শেষে বের হওয়ার পর বার্নিকাটের গাড়িতে হামলা চালায় একদল সন্ত্রাসী। এরা বদিউল আলম মজুমদারের বাসায়ও হামলা-ভাঙচুর করে। হামলার পর বদিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, আমার বাসায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বার্নিকাটের উপস্থিতিতে একটি অনুষ্ঠান ছিল।

বাসা থেকে তিনি বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার গাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয়। এরপর আমার বাড়িতে হামলা করে দুর্বৃত্তরা। তারা বাড়ির দরজা-জানালা ভাঙচুর করেছে। বদিউল আলম মজুমদার রোববার মোহাম্মদপুর থানায় একটি অভিযোগ করেন।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট