আন্দোলনকারী ২২ শিক্ষার্থী রিমান্ডে, পুলিশ বলছে এরা জঙ্গি গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য

প্রকাশিত: ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৮, ২০১৮

আন্দোলনকারী ২২ শিক্ষার্থী রিমান্ডে, পুলিশ বলছে এরা জঙ্গি গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য

পুলিশের পৃথক দুই মামলায় আন্দোলনকারী ২২ শিক্ষার্থীর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মহানগর হাকিম আবদুল্লাহ আল মাসুদ মঙ্গলবার এই আদেশ দেন।

তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়েছে। এরা সবাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এরা হলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ, সাউথইস্ট ও ব্র্যাকের ছাত্র। এর মধ্যে বাড্ডা থানা-পুলিশ ১৪ জন ছাত্রকে এবং ভাটারা থানা-পুলিশ ৮ জন ছাত্রকে আদালতে হাজির করে প্রত্যকের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে।

মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে আদালতের এজলাসে তোলা হলে স্বজনদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন ছাত্ররা। তাদের আইনজীবীরা আদালতের কাছে দাবি করেন, পুলিশ ধরে নিয়ে থানায় ফেলে নির্যাতন করেছে। ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার পথে কয়েজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

তবে বাড্ডা থানার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জুলহাস মিয়া রিমান্ড আবেদনে বলেন, সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আফতাব নগর মেইন গেটের রাস্তায় যান চলাচলে বাধা দেয়। লাঠিসোঁটা, ইটপাটকেল দিয়ে রাস্তার গাড়ি ভাঙচুর করে। পুলিশ বাধা দিলে পুলিশের ওপর আক্রমণ করে আসামিরা। এ ঘটনার ইন্ধনদাতা এবং অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।

পুলিশ আদালতকে জানিয়েছে, আসামিরা বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) গাড়ি ভাঙচুর করেছে। তারা বাড্ডা পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন ধরাতে গেলে পুলিশ টিয়ারশেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

বাড্ডার মামলায় গ্রেপ্তার ১৪ ছাত্র হলেন, রিসালাতুল ফেরদৌস, রেদোয়ান আহমেদ, রাশেদুল ইসলাম, বায়েজিদ, মুশফিকুর রহমান, ইফতেখার আহম্মেদ, রেজা রিফাত আখলাক, এএইচএম খালিদ রেজা, তারিকুল ইসলাম, নূর মোহাম্মাদ, সীমান্ত সরকার, ইকতিদার হোসেন, জাহিদুল হক ও হাসান। আর ভাটারা থানার মামলায় গ্রেপ্তার ছাত্ররা হলেন, আজিজুল করিম, মাসাদ মরতুজা বিন আহাদ, ফয়েজ আহম্মেদ আদনান, সাবের আহম্মেদ, মেহেদী হাসান, শিহাব শাহরিয়ার, সাখাওয়াত হোসেন ও আমিনুল এহসান।

বিকেলে আদালতে তাদের জামিন ও রিমান্ড শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতকে জানান, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেপ্তার করা ছাত্রদের পরীক্ষা চলছে। ৯ আগস্ট তাদের পরীক্ষা আছে। জামিন না পেলে তাদের শিক্ষা জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গ্রেপ্তার ছাত্র মাসাদ মরতুজা বিন আহাদ, ফয়েজ আহম্মেদ আদনান এবং আজিজুল হাকিমের আইনজীবীরা আদালতকে জানান, পুলিশ থানায় ফেলে এই ছাত্রদের বেধড়ক পিটিয়েছে। তবে এই তিনজনের ব্যাপারে পুলিশ আদালতকে প্রতিবেদন দিয়ে দাবি করছে, গ্রেপ্তার করার সময় ধস্তাধস্তির কারণে তারা সামান্য আহত হন। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

আসামিপক্ষের আইনজীবী এ কে এম মুহিউদ্দিন ফারুক আদালতকে বলেন, পুলিশ নিরপরাধ ছাত্রছাত্রীদের ধরে নিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়েছে। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিদওয়ান আহমেদের আইনজীবী কবির হোসেন আদালতকে বলেন, ‘পুলিশ ধরে নিয়ে থানায় ফেলে মেরে তার হাতের একটি আঙুল ভেঙে দিয়েছে। তৃতীয় পক্ষের যারা ষড়যন্ত্র করেছে তাদের পুলিশ গ্রেপ্তার না করে নিরীহ ছাত্রদের ধরে এনেছে।’

অন্যদিকে ভাটারা থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই হাসান মাসুদ রিমান্ড আবেদনে বলেন, আসামিরা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার অ্যাপোলো হাসপাতাল ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় লোহার রড, লোহার পাইপ ও ইট দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা করে। আসামিরা বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ঘটনাস্থলের আশপাশের দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাসার দরজা, জানালা ভাঙচুর করে। এদের সঙ্গী পলাতক আসামিরা জঙ্গি গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

এদিকে ফেইসবুকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের পর পুলিশে তুলে দিয়েছিল ছাত্রলীগ; দিনভর বিক্ষোভের পর প্রক্টরের সুপারিশে থানা থেকে ছাড়া পেয়েছেন তারা।

এই তিন শিক্ষার্থী হলেন গণিত বিভাগের তারিকুল ইসলাম, ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের সাদ্দাম হোসেন ও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের জোবাইদুল হক রনি।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে মঙ্গলবার সকালে এই তিনজনসহ ছয় শিক্ষার্থীকে ফজলুল হক হলে মারধর করা হয়। পরে এর মধ্যে তারিকুল, সাদ্দাম ও রনিকে পুলিশে তুলে দেন হল ছাত্রলীগের নেতারা।

মারধরের শিকার অন্য তিন শিক্ষার্থী হলেন তথ্য ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের মশিউর রহমান সাদিক, তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের ওমর ফারুক এবং প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের জাহিদ।

তিন শিক্ষার্থীর মুক্তির দাবিতে দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাষ্কর্য থেকে মিছিল নিয়ে প্রক্টর অফিসের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী, যার মধ্যে বাম ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও ছিলেন।

বিক্ষোভের এক পর্যায়ে প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রাব্বানী শাহবাগ থানা পুলিশের সঙ্গে কথা বলে আটক তিন ছাত্রের মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেন শিক্ষার্থীদের।

এরপর বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা শাহবাগ থানার সামনে অবস্থান নেন। এরপর ওই তিন শিক্ষার্থীকে মুক্তি দিলে শিক্ষার্থীরা তাদের ফুলের মালা পরিয়ে মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসে।

শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, আটককৃতদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

ফজলুল হক হল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার সিদ্দিক সিসিম সাংবাদিকদের বলেন, তাদেরকে পুলিশ কেন ছেড়ে দিয়েছে, তা পুলিশই ভালো বলতে পারবে৷ কিন্তু আমরা তাদের ফেইসবুক চ্যাটগ্রুপে গুজব ছড়ানোর প্রমাণ পেয়েছি।

প্রক্টর গোলাম রাব্বানী ডটকমকে বলেন, তাদের ল্যাপটপে গুজব ছড়ানোর প্রমাণও পাওয়া গেছে। তবে তারা যেহেতু আমাদেরই শিক্ষার্থী, তাই তাদের আরেকবার সু্যোগ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে প্রক্টরিয়াল টিমের কাজে বাধা দেওয়ায় এবং প্রক্টরিয়াল টিমের এক সদস্যকে হেনস্তা করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

ফিন্যান্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর আল ফারাবীকে বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রক্টর গোলাম রাব্বানী।

তিনি বলেন, ব্যবসায় অনুষদের ভেতর এই শিক্ষার্থী প্রক্টরিয়াল টিমের এক সদস্য ভিডিও করার সময় তাকে বাধা দিয়ে ফোন কেড়ে নেন এবং হেনস্তা করেন। প্রাথমিক তদন্তে তা প্রমাণ হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অনুমোদনক্রমে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

  •