কুষ্টিয়ায় মাহমুদুরের ওপর ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা

প্রকাশিত: ২:১৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০১৮

কুষ্টিয়া আদালত প্রাঙ্গণে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ। দুপুর একটা থেকে বিকাল পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে রাখে। সে সময় ফেসবুক লাইভে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে বারবার আহবান জানান তিনি। মাহমুদুর রহমানের অবরুদ্ধের খবর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন দেশের মানুষ। বিভিন্ন মিডিয়ায় তার অবরুদ্ধের খবর ছড়িয়ে পড়লেও এসপি ও ওসি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। গতকাল বিকাল সাড়ে চারটায় আদালত থেকে বের হলে আদালত প্রাঙ্গণেই এই হামলার শিকার হন তিনি। পরে তিনি মহিলা আইনজীবী সমিতির অ্যাডভোকেট সামস তামিম মুক্তির চেম্বারে আশ্রয় নিলে ছাত্রলীগ সেখানেও হামলা চালায়। গতকাল সকালে মাহমুদুর রহমান কুষ্টিয়া আদালতে যান ৫০০ ধারার মানহানি মামলায় জামিন নিতে। হাজির হওয়ার পর আদালত জামিনও মঞ্জুর করেন। পরে পুলিশি প্রটেকশনে ঢাকার পথে রওনার নির্দেশ দেন আদালত। রওনা হবার আগেই আদালত এলাকায় জমায়েত হয় সরকার দলীয় স্থানীয় কর্মী-সমর্থকরা। তারা মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দিতে থাকে সেøাগান। হামলার আশংকায় মাহমুদুর রহমান কুষ্টিয়া সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট এমএম মোর্শেদের অনুমতি নিয়ে তার আদালতে আশ্রয় নেন। কিন্তু তার পরেও কুষ্টিয়ায় আদালত এলাকায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীদের হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি। আদালতে মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে ছিলেন কুষ্টিয়া বারের সিনিয়র আইনজীবী প্রিন্সিপাল আমিরুল ইসলাম, বিএফইউজে মহাসচিব এম আব্দুল্লাহ, কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীসহ অনেকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তার ওপর ব্যাপকভাবে ইট-পাথর নিক্ষেপ করা হয়। এতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। তার মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। হামলার আগে মাহমুদুর রহমান আদালত কক্ষ থেকে ফেসবুক লাইভে নিজের নিরাপত্তা দাবি করেন। এ সময় ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমানকে সহায়তা করার জন্য ওসিকে ফোন দিলেও ওসি কোনো সহায়তা করেননি। তিনি নিজেও নিরাপত্তার জন্য ওসির সহযোগিতা চান। কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দেননি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনি অ্যাম্বুলেন্সেযোগে যশোরের পথে রয়েছেন। সেখান থেকে বিমানযোগে তিনি ঢাকায় ফিরবেন। : হামলার আগে ফেসবুক লাইভে যা বললেন মাহমুদুর রহমান : ছাত্রলীগের হামলার আগে অবরুদ্ধ অবস্থায় কুষ্টিয়া আদালত ভবনে এক ফেসবুক লাইভে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, পুরো আদালতপাড়া জুড়ে ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা মহড়া দিচ্ছে। তাদের দাবি কি সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। একটাই বুঝছি তারা আমাকে এখান থেকে বের হতে দিতে রাজি না। মাহমুদুর রহমান বলেন, আমি এই অভিজ্ঞতায় আশ্চর্য হইনি। বাংলাদেশে গণমানুষের কোনো অধিকার নেই, সংবাদপত্রের কোনো স্বাধীনতা নেই। সেটার সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ আমরা আজ কুষ্টিয়াতে পেলাম। এরকম দৃশ্য মনে হয় কুষ্টিয়াতে আজ পর্যন্ত কেউ দেখেনি। কারণ এখানে আমাদের যে আইনজীবী আছেন তারা প্রত্যেকেই বললেন, এটা তাদের জন্য একটা নতুন অভিজ্ঞতা। আমি এখানে এসেছিলাম একটা মানহানি মামলায় হাজিরা দিতে। আপনারা জানেন যে, মানহানি মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে জামিন দিতে হয়। এটাই আইন। এই আইন ভেঙে আমার জামিন বাতিল করার কোনো সুযোগ নেই। তাই ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আমাকে জামিন দিয়েছেন। কিন্তু জামিন দেয়ার পর থেকে তারা আমাকে বের হতে দিচ্ছে না। এর পেছনের সকল ইন্ধন হচ্ছে এখানকার ওসি এবং এসপির। তাদের ইন্ধনে এই কাজ হচ্ছে। কারণ ওসি-এসপি তারা দেখেও না দেখার ভান করছে। এমনকি আমাদের সামনে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ওসিকে ডাকলেন। ওসি সামান্য সৌজন্য দেখাতেও আসেননি। বরং তিনি বলে দিলেন, আসতে পারবেন না। বাংলাদেশ আজ কোন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আপনারা বুঝতে পারছেন এই দেশের জনগণ যদি লড়াই করে সরকারকে প্রতিহত না করে, তাহলে মানুষের মুক্তি আসবে না। আপনার জানেন আমি পাঁচ বছর জেলে ছিলাম। আমার নামে ১২৫টি মামলা। আমি ৩৮ দিন পুলিশের রিমান্ডে ছিলাম। সেই রিমান্ডে আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। আল্লাহ আমার হায়াত এখনও রেখেছেন তাই আমি বেঁচে আছি। যতদিন বাঁচব ততদিন ন্যায়ের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আমি লড়াই করে যাব। : আহত মাহমুদুর রহমানকে নিয়ে আসা হচ্ছে ইউনাইটেড হাসপাতালে : কুষ্টিয়ায় আদালত ভবনে ছাত্রলীগের হামলায় রক্তাক্ত মাহমুদুর রহমান ঢাকার পথে রওনা হয়েছেন। তিনি কুষ্টিয়া থেকে সড়কপথে অ্যাম্বুলেন্সযোগে যশোর পৌঁছেছেন। সেখান থেকে বিমানযোগে ঢাকায় ফিরবেন। বিমানবন্দর থেকে মাহমুদুর রহমানকে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হবে ইউনাইটেড হাসপাতালে। সেখানেই চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। : মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলায় বিএনপির নিন্দা : কুষ্টিয়ায় আদালত প্রাঙ্গণে আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এই রাষ্ট্রযন্ত্র সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখন রাষ্ট্র নেই, এটা অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এখানে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ করছে না। আজকে পুলিশ চলছে আওয়ামী লীগের নির্দেশে এবং দুঃখজনকভাবে বিচারাঙ্গনকেও তারা প্রায় দখল করে ফেলেছে। আমরা আপনাদের মাধ্যমে দেশের জনগণের কাছে এই কথাটা পৌঁছাতে চাই যে, এদেশে গণতন্ত্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠান নষ্ট হয়ে গেছে, রাষ্ট্রযন্ত্র আওয়ামী লীগের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, তারা সেখানে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ পাননি। কোনো গাড়ি পর্যন্ত তাদেরকে দেয়া হয়নি। সরকারের দায়িত্ব ছিলো সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ হেফাজতে তাকে হাসপাতালে পাঠানো ও তারপর তাকে ঢাকায় আসার ব্যবস্থা করা। দুঃখজনকভাবে শুধু নয় আমরা ক্ষোভের সাথে লক্ষ্য করেছি যে, তারা (সরকার) এই ব্যবস্থা তো করেনইনি উপরন্তু যেন মাহমুদুর রহমান সাহেবের ওপর এই আক্রমণটা করে তার ব্যবস্থা তারা করেছেন। আমরা নিন্দা ও ধিক্কার জানাচ্ছি। আমরা অবিলম্ব যারা কুষ্টিয়ায় এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি। : বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নিন্দা : মাহমুদুর রহমানের ওপ হামলার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। : জামায়াতে ইসলামীর নিন্দা : কুষ্টিয়ার আদালতে একটি মানহানির মামলায় হাজিরা দিয়ে আদালত থেকে বের হয়ে আসার সময় আদালত চত্বরে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা মাহমুদুর রহমানের ওপর আক্রমণ চালানোর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারী জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল প্রদত্ত এক বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় বলেন, অবিলম্বে পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে মাহমুদুর রহমানকে তার ঢাকার বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ প্রদানের জন্য আদালতের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সাথে সাথে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের দুর্বৃত্তদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের দাবি জানাচ্ছি। : লেবার পার্টির নিন্দা : কুষ্টিয়ায় আমারদেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর আদলত চত্বরে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের পরিকল্পিত হামলায় রক্তাক্ত করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডাঃ মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার ফরিদ উদ্দিন। : মাহমুদুর রহমানকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধরের ঘটনায় বিএফইউজে ও ডিইউজে উদ্বেগ : বিএফইউজে সভাপতি রুহুল আমীন গাজী, মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, ডিইউজের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ শহীদুল ইসলাম এক বিবৃতিতে দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার সফরসঙ্গীসহ কুষ্টিয়ায় ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্তৃক মারধর করে রক্তাক্ত করা এবং তার গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান এবং অবিলম্বে মাহমুদুর রহমান ও তার সফর সঙ্গীদের নিরাপদে ঢাকায় ফেরার ব্যবস্থা করার দাবি জানান। একই সাথে বিবৃতিতে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে বিএফইউজে-ডিইউজে আজ সোমবার সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। : ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাবের) নিন্দা: দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ওপর কুষ্টিয়ায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। গতকাল এক বিবৃতিতে ড্যাব কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের পক্ষে সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ এ কে এম আজিজুল হক ও মহাসচিব অধ্যাপক ডাঃ এজেডএম জাহিদ হোসেন তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। আমরা উক্ত ঘটনার সুষ্ঠু বিচারবিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি এবং সেই সঙ্গে দোষী ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। : শতনাগরিকের নিন্দা : আমারদেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন শতনাগরিক কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ, কবি আবদুল হাই শিকদার। তারা অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

  •