সিলেটের চার উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী

প্রকাশিত: ৪:১৭ অপরাহ্ণ, জুন ১৫, ২০১৮

সিলেটের চার উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী

গত ৪দিনের বৃস্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের কারণে সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ ও জৈন্তাপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। রাস্তা-ঘাট পানির নিচে নিমজ্জিত হওয়ায় এসব এলাকার উপজেলা সদরের সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এই অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ। বন্ধ রয়েছে স্বাভাবিক কাজকর্ম। বিশেষ করে শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছেন ।

কানাইঘাট উপজেলায় সুরমা ও লোভা নদীর দু’তীরের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে কানাইঘাট পৌর শহরে ঢুকে পড়েছে পানি। বাজারের প্রায় সবক’টি দোকান পানিতে ডুবে যাওয়ায় মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পৌর কাউন্সিলর বিলাল আহমদ ও শরিফুল হক জানান, বন্যার পানিতে কানাইঘাট বাজারসহ পৌরসভার অধিকাংশ জায়গা তলিয়ে গেছে।

লক্ষীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়নের অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী জানান, তার গ্রাম উত্তর লক্ষ্মীপ্রসাদের সব ঘর-বাড়ি পানির নীচে রয়েছে। তিনি স্বপরিবারে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। একই অবস্থা লক্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের সতিপুর, বাজেখেল, সাউদগ্রাম, কান্দলা, উজান ফৌদ, মেছা, ভাটিপাড়াপৈতসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে।

সাতবাঁক ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ পলাশ জানান, তার ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রাম বানের পানিতে তলিয়ে গেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া সুলতানা জানান, সুরমা ও লোভা নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কানাইঘাটের অধিকাংশ জায়গা ও সড়ক ডুবে গেছে। ১ ও ২নং ইউনিয়নের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গোয়াইনঘাট উপজেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া সারী এবং পিয়াইন নদীর পানি উপচে পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের আসামপাড়া হাওর, সাঙ্কিভাঙ্গা হাওর, বাউরভাগ হাওর, জাফলং চা-বাগান, আলীরগাও ইউনিয়নের নাইন্দা হাওর, তীতকুল্লি হাওর, বুধিগাঁও, কাকুনাখাই, খলা, সতিপুর হুদপুর, উজুহাত, পাঁচসেউতি, খলাগ্রাম, নয়াখেল, খাষ মৌজা, ফলেরগ্রাম, লাফনাউট, খমপুর, আলীরগ্রামসহ অধিকাংশ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।

এছাড়া ডৌবাড়ী, পশ্চিম জাফলং, লেঙ্গুড়া, তোয়াকুল, রস্তমপুর, নন্দিরগাঁও ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এদিকে দেশের বৃহত্তম বিছনাকান্দি ও জাফলং পাথর কোয়ারী দুটি বন্ধ থাকায় লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। এতে করে এবারের ঈদ আনন্দ বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে।

এদিকে সারী-গোয়াইনঘাট সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি উঠায় উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ঘরমুখো মানুষ কষ্ঠ করে পায়ে হেটে বাড়ীতে ফিরছেন। যাত্রীবাহী কোন যান বাহন চলাচল করতে পারছেনা। মালবাহী দু’একটি বাহন ঝুঁকি নিয়ে পানির মধ্যে চলাচল করছে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বিজিৎ কুমার পাল জানান বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি সার্বক্ষনিক খোঁজ নিচ্ছি, এখন পানি কমতে শুরু করেছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় ত্রান সামগ্রী হাতে পৌছেছে, আজ থেকে বিতরণ করব। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম চৌধুরী জানান বন্যা কবলিত বিভিন্ন এলাকা পরির্দশন করেছি এবং প্রয়োজনীয় ত্রান সামগ্রীর জন্য কর্তৃপক্ষ বরাবরে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।

জৈন্তাপুর উপজেলা নিজপাট ইউনিয়নের মাহুতহাটি, দর্জীহাটি, মেঘলী, বন্দরহাটি, লামাপাড়া, ময়নাহাটি, মোরগাহাটি, জাঙ্গালহাটি, মজুমদারপাড়া, নয়াবাড়ী, হর্নি, বাইরাখেল, গোয়াবাড়ী, তিলকৈপাড়া, বড়খেল, ফুলবাড়ী, ডিবিরহাওর, ঘিলাতৈল, মাস্তিং, হেলিরাই। জৈন্তাপুর ইউনিয়নের মুক্তাপুর, বিরাইমারা, বিরাইমারা হাওর, লামনীগ্রাম, কাটাখাল, খারুবিল, চাতলারপাড়, ডুলটিরপাড়, ১নং লক্ষীপুর, ২নং লক্ষীপুর, আমবাড়ী, ঝিঙ্গাবাড়ী, কাঠালবাড়ী, নলজুরী হাওর। চারিকাটা ইউনিয়নের বালিদাঁড়া, লালাখাল, লালাখালগ্রান্ট, রামপ্রসাদ, থুবাং, বাউরভাগ উত্তর, বাউরভাগ দক্ষিণ, পুঞ্জী সহ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

এদিকে সারীনদী, বড়গাং নদী এবং নয়া গাং নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে সারী নদীর পানি বিপদসীমার .৫৯ সেন্টিমিটার উপরদিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানান সারী-গোয়াইন বেড়ীবাঁধ প্রকল্পের দায়িত্বরত কর্মকর্তা মোঃ আলা উদ্দিন। তিনি আরও বলেন বৃষ্টি থামলে পানি কমে যাবে।

জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ জয়নাল আবেদীন ও জৈন্তাপুর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী অফিসার মুনতাসির হাসান পলাশ বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
এদিকে, জকিগঞ্জে সুরমা ও কুশিয়ারা ডাইকের উপর দিয়ে প্রবল বেগে পানি ঢুকে অনেক বাড়িঘর ও ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বন্যায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়ন গুলো হচ্ছে বারহাল, বারঠাকুরী, বীরশ্রী, মানিকপুর, কাজলশাহ, খলাছড়া ও জকিগঞ্জ সদর।
বারহাল ইউপির চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ চৌধুরী জানান, তার ইউনিয়নের সবকটি সুরমা ও কুশিয়ারা ডাইকের পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রায় ৩০টি গ্রামের ৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ক্ষেতের উঠতি ফসল ও অনেক মাছের খামার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। উপজেলার বৃহত্তর হাট শাহগলী বাজারের অর্ধাংশ এখন পানির নিচে। এছাড়া সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের অনেক স্থানে পানি ছুঁইছুঁই করছে।
এদিকে বারঠাকুরী ইউপির চেয়ারম্যান মহসিন মোর্তজা চৌধুরী টিপু জানান, তার ইউনিয়নের সুরমা ও কুশিয়ারা ডাইকের বিভিন্ন স্থান দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় তার এলাকার প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ফসলি জমি ও ভিটামাটিতে পানি উঠায় মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
জকিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল আহমদ তাপাদার বিভিন্ন বন্যা-কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে জানান, বন্যা মারাত্নক আকার ধারন করেছে। বিভিন্ন ডাইকের উপর দিয়ে পানি ঢুকে বিস্তীর্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী রয়েছে। তিনি জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্ঠি আকর্ষন করেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিজন কুমার সিংহ জানান, গত কয়েকদিনের অবিরাম বর্ষন ও পাহাড়ি ঢলে জকিগঞ্জের কয়েকটি ইউনিয়নে বন্যা দেখা দিয়েছে। তবে তিনি এ ব্যাপারে বিহিত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সিলেটের জেলা প্রশাসককে অবহিত করেছেন বলে জানান।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট