বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থা গুরুতর

প্রকাশিত: ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৯, ২০১৮

বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থা গুরুতর

কারাগারে সাক্ষাৎ শেষে মির্জা ফখরুল ॥ বাঁ হাত শক্ত হয়ে যাচ্ছে, পা থেকে শুরু করে শরীরের বাঁ দিকে তাঁর ব্যথা বেড়ে গেছে ॥ দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। গণতন্ত্র মুক্তির আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান

গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে নেতা-কর্মীদের ‘আন্দোলন চালিয়ে যেতে’ বলেছেন কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল শনিবার বিকালে পুরনো ঢাকার নাজিম উদ্দিন সড়কে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বেরিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একথা জানান। বিকাল ৩টা ৫০ মিনিটে মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও নজরুল ইসলাম খান প্রধান ফটক দিয়ে কারাগারে প্রবেশ করেন। সাক্ষাৎ শেষে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন বিকাল ৫টা ৫ মিনিট। : মির্জা ফখরুল বলেন, উনি (খালেদা জিয়া) দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। দেশবাসী যেন তার সুস্থতার জন্য দোয়া করেন এবং অবিলম্বে এই যে একটা দুঃসময় চলছে জাতির জন্যে, দেশের জন্যে, এই দুঃসময়ের যেন অবসান ঘটে। নেতা-কর্মীদের তিনি (খালেদা জিয়া) সাহসের সঙ্গে আন্দোলন করে যেতে বলেছেন গণতন্ত্রের মুক্তির জন্যে। মির্জা ফখরুল বলেন, কারাগারে মেডিকেল বোর্ডের ডাক্তাররা দেশনেত্রীকে যেসব ওষুধপত্র দিয়েছেন সেগুলো কোনো কাজ করছে না। ওইগুলো তার রোগের বা যন্ত্রণা যে লাঘব করা- সেই কাজ করছে না। যেটা তার প্রয়োজন তা হলো পরিবেশটা পরিবর্তন করা। এই পরিবেশে সুস্থ লোক কোনোদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে কিন্তু অসুস্থ লোক সুস্থ হতে পারে না। বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আজকে আমরা তাকে যা দেখেছি তাতে আমরাও অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছি। তার শরীর আসলেও খারাপ ও স্বাস্থ্য খারাপ। তিনি যে বর্ণনা দিয়েছেন তার বাম হাত আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে যাচ্ছে। এটা স্টিভ হচ্ছে। ওজনও বেড়ে গেছে বাম হাতের। বাম পা থেকে শুরু করে গোটা বাম দিকে পেছনে পর্যন্ত সেই ব্যথা বেড়ে গেছে। সাধারণভাবে হাঁটা চলা করা তার জন্য মুশকিল হয়ে পড়েছে। আর্থারাইটিসের যে সমস্যাটা, সেই সমস্যাটা হচ্ছে যে, সেটা আস্তে আস্তে নিউরো প্রবলেমের সৃষ্টি হয়। আমরা দুপুরে বলেছি, ডাক্তার সাহেবরা বলেছেন যে, এটা স্টিভ হয়ে যায়। এতে প্যারালাইসিসের দিকে চলে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, তার ডান চোখটা লাল হয়ে আছে। এটা বেড়ে গেলে তার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। : তিনি বলেন, আমরা এখনো বলছি, সরকারের আর বিলম্ব না করে অবিলম্বে তিনি যে ইউনাইটেড হাসপাতালে যেতে চেয়েছেন, সেই হাসপাতালে রেখে তাকে বিশেষভাবে চিকিৎসা দেয়া প্রয়োজন। এটা সরকারের দায়িত্ব। এর কোনো রকম যদি ব্যত্যয় ঘটে বা তার কোনো রকম শারীরিক ক্ষতি সাধিত হয় তার দায়-দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে। কারাগারের সামনে বক্তব্য দেবার সময় দলের চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব আবদুস সাত্তার ও প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান উপস্থিত ছিলেন। : গত ১৯ এপ্রিল এই তিন নেতা সাক্ষাতের জন্য অনুমতি নিয়ে সাক্ষাতের জন্য আসলেও অসুস্থতার কারণে সাক্ষাৎ পাননি মির্জা ফখরুলসহ এই তিন নেতা। সর্বশেষ গত ৬ এপ্রিল একাই মির্জা ফখরুল একা কারাগারে বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করেন। এর পরদিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তাকে এক্সরে পরীক্ষার জন্য নেয়া হয়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদন্ড দেয় আদালত। সাজার রায়ের পর থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নাজিম উদ্দিন রোডের কারাগারে রাখা হয়েছে। সেখানে তিনিই এখন একমাত্র বন্দি। : এদিকে গতকাল শনিবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দফতরে কারা কর্তৃপক্ষের ফাইল আটকিয়ে থাকায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুরুতর অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসায় বিলম্ব ঘটানো হচ্ছে। সরকারকে জোরের সঙ্গে বলব, অবিলম্বে দেশনেত্রীকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। অন্যথায় সকল দায়-দায়িত্ব এই সরকারকে বহন করতে হবে এবং তার জন্য দেশের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন। আমরা আশা করবো, যে রিকমেনডেশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কারা কর্তৃপক্ষ থেকে করা হয়েছে তা অবিলম্বে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। : গতকাল শনিবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা করেছেন এমন তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও তাদের মতামত তুলে ধরেন। : বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে সরকার বিলম্ব করলে তার (খালেদা জিয়া) স্বাস্থ্যহানি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা যতদূর শুনেছি কারা কর্তৃপক্ষ অন্যান্য চিকিৎসকদের সাথে পরামর্শ করে তাকে (খালেদা জিয়া) একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করার জন্য রিকমেন্ড করেছেন। আমরা শুনেছি যে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই ফাইল পড়ে আছে। এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং এই সিদ্ধান্তহীনতার কারণে প্রতিদিন দেশনেত্রীর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। আপনারা শুনেছেন শ্রদ্ধেয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে বিলম্ব হলে তার (খালেদা জিয়া) স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। আমরা আবারো বলছি, সরকারের বোধোদয় হবে। অবিলম্বে একদিনও দেরি না করে তারা (সরকার) দেশনেত্রীকে তার পছন্দসই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠাবেন। : তিনি বলেন, ১/১১ সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জেলে থাকাকালে চোখের সমস্যার জন্য অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে তার পছন্দের স্কয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়েছিলো। পরে বিদেশেও তাকে পাঠানো হয়েছিলো। নরমাল একজন স্বাভাবিক কারাবন্দিরও সম্পূর্ণ অধিকার আছে তার সবচেয়ে উন্নতমানের চিকিৎসা পাওয়া। এটা সরকারের দায়িত্ব সেই চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং এ ব্যাপারে কোনো আপোস করা যাবে না। অথচ তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে চিকিৎসা না দিয়ে তার অবস্থার অবনতি ঘটানো হচ্ছে। এই অনৈতিক অনির্বাচিত সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অসুস্থ রাখা যাতে তাকে রাজনীতি ও নির্বাচনের বাইরে রাখা যায়। এর পেছনে একটা হীন নীলনকশা আছে। : বিএনপি মহাসচিব বলেন, ইতিমধ্যে দেশনেত্রীকে কারাগারে দেখে আসা অধ্যাপক মালিহা রশিদ ও এম আলী বলেছেন যে, ইমিডিয়েটলি ট্রান্সফার বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা। নামও লিখে দিয়েছে ইউনাটেড হসপিটাল। আমরা আবারো দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে দেশনেত্রীকে ইউনাইটেড অথবা এ্যাপেলো হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। : গত ২২ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাথে আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আলোচনা হয়েছে যে, যেখানে ওনার (খালেদা জিয়া) ভালো চিকিৎসা সেখানে তার চিকিৎসা হবে। ওই সময়ে আইজি প্রিজনও উপস্থিত ছিলেন। আজকে ২৮ এপ্রিল। এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ৭৩ বছর বয়েসী একজন মানুষ গুরুতর অসুস্থ। তার চোখের যে সমস্যা আপনারা শুনেছেন একদিন বিলম্ব হলে তার মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। চিকিৎসার একদিনের বিলম্বে তিনি পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন, চোখের দৃষ্টি শক্তি হারাতে পারেন। এরকম যখন অবস্থা সেখানে সরকারের অবহেলা কিংবা সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব কোনো মানবিক আচরণ হতে পারে না। এটা সম্ভবত অপ রাজনৈতিক আচরণ। : কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান অবস্থা কথা তুলে ধরে নিউরো মিডিসিনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক সৈয়দ ওয়াহিদুর রহমান বলেন, এখন ওনার বেশি সমস্যা ঘাড়ের সমস্যা। চিকিৎসার ভাষায় বলা হয় সার্ভাইক্যাল স্পন্ডলাইসিস। ডান হাত উনি যতটুকু শক্তি পাচ্ছে, বাম পাতে ততটুকু পাচ্ছে না। ফলে সবসময় ব্যথা করছে। এছাড়া হাতের আঙ্গুলগুলোতে রিউমারাইটিস আর্থারাইটিস আছে, আঙ্গুলগুলো ফোলা ফোলা, ব্যথা রয়েছে। ওনার কোমড়ের হাড়গুলো ক্ষয় হয়ে স্পাইনাল কর্ডগুলো চাপা পড়ে গেছে। ফলে তিনি এখন হাঁটতে পারছেন না। এসব সমস্যায় শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে, প্যারালাইসিস হতে পারে, প্রস্রাব-পায়খানা নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হতে পারে এবং হাত-পা অবশ হয়ে যেতে পারে। তার এখন সুচিকিৎসা দরকার, তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার, তার ফিজিও থেরাপি দরকার এবং যথাযথ চিকিৎসার পরিবেশ দরকার। কারাগারে সে পরিবেশ নেই। সেখানে তিনি থাকলে ধীরে ধীরে তার অবস্থার অবনতি হবে। : অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সিরাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ওনার (খালেদা জিয়া) চিকিৎসার জন্য ওয়েল ভেন্টিলেটেড এনভারোমেন্ট একটা কক্ষ ও পরিবেশ দরকার। ওই স্যাঁতসেঁঁতে পুরনো কক্ষে থাকলে তার সমস্যাগুলো আরো বাড়তে থাকবে। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ছাড়া কারাগারে তাকে যদি রেখে দেয়া হয় তাহলে উনি কর্মক্ষমতা হারাতে পারেন। হয়ত তার জীবনী শক্তি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। : চক্ষু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ম্যাডাম চোখের নানা সমস্যায় ভুগছেন। তার চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে। এখন ওনার যে অবস্থা উনি যদি চিকিৎসা না পান। একবার যদি কর্ণিয়া ডাই হয়ে যায় তাহলে ওনার এই কর্ণিয়াকে ১৫ বছরেও ভালো করা যাবে না। যে কোনো সময়ে উনি অন্ধ হয়ে যেতে পারেন। : সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, শামসুজ্জামান দুদু, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক, আবদুস সালাম, আতাউর রহমান ঢালী, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ, শহিদুল ইসলাম বাবুল, সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু, মো. মুনির হোসেন, বেলাল আহমেদ প্রমুখ।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট