‘হিটলারের কৌশল’ ব্যবহার করছে মায়ানমার : পররাষ্ট্র সচিব

প্রকাশিত: ৯:৫৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৭, ২০১৮

‘হিটলারের কৌশল’ ব্যবহার করছে মায়ানমার : পররাষ্ট্র সচিব

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঠেকাতে মায়ানমার হিটলারের মতো প্রচারণা কৌশল ব্যবহার করছে; মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক।

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের স্কুল অব ইকোনোমিকসের দক্ষিণ এশিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি বলেছেন, মায়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চায় না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে মায়ানমারের আচরণকে নাৎসী বাহিনীর আচরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি।

এই সংকট আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। গত বছরের ২৫ আগস্ট নিরাপত্তা চৌকিতে আরসার হামলাকে মায়ানমারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানের কারণ বলা হলেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিতে এবং তাদের ফেরার সমস্ত পথ বন্ধ করতে আরসার হামলার আগে থেকেই পরিকল্পিত সেনা-অভিযান শুরু হয়েছিল।

তারও আগে পরিচালিত হয়েছিল সেনা-প্রচারণা। গত মাসে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের এক পর্যবেক্ষণে জানায়, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক প্রচারণা সেখানকার সমাজকে বিদ্বেষী করে তুলেছে। ওই সামরিক প্রচারণাকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন হিটলারের প্রচারণা কৌশলের সঙ্গে তুলনা করেছেন পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একটি যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাকে ব্যবহার করে যুদ্ধরত পক্ষগুলো। জার্মানির একনায়ক হিটলারের বেশিরভাগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাই তৈরি হত ‘মিনিস্ট্রি অব পাবলিক এনলাইটেনমেন্ট এন্ড প্রোপাগান্ডা’ থেকে। জোসেফ গোয়েবলস এই মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্বে ছিলেন। নাৎসীরা তাদের ক্ষমতায় থাকাকালীন সময় ব্রিটিশদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা কৌশল ব্যবহার করেছিল।

যুক্তরাজ্য সফরে গিয়ে লন্ডনের ‘দ্য রোহিঙ্গা হিউম্যানিটারিয়ান ক্রাইসিস: বাংলাদেশ রেসপন্স’ শীষক সেমিনারে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, মনে হচ্ছে নিজেদের দেশ থেকে সব রোহিঙ্গাকে বের করে দিতে চায় মায়ানমার কর্তৃপক্ষ। আর তা অর্জন করতে তার সব ধরণের প্রক্রিয়া ও উপকরণ ব্যবহার করছে। আপনি যদি তাদের আচরণ দেখেন তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানির আচরনের মতো মনে হবে। তাদের সুগঠিত প্রচারণা কৌশল রয়েছে।

হিটলার আমল যেভাবে প্রচারণা কৌশল ব্যবহার করতো সেভাবেই মায়ানমার প্রশিক্ষিত হয়েছে।’ শহীদুল হক বলেন, সম্ভবত সেখানে আর মাত্র এক লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে আর বাকিদের তাড়িয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে তারা। দেশটির বর্তমান নীতি হলো স্থিতাবস্থা বজায় রেখে রোহিঙ্গাদের ফেরত না নেওয়া।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সাত লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পালিয়ে আসা বাংলাদেশ-মায়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হলেও তা কার্যকরের বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধীন। বাংলাদেশের তরফে প্রথম দফায় আট হাজার রোহিঙ্গার তালিকা সরবরাহ করা হলেও এখন পর্যন্ত কেবল ৩৮৮ জনকে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া চালু রাখার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার।

শহীদুল হক বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতের শর্ত পূর্ণ হলেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হবে বলেও জানান শহীদুল হক। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বৈশ্বিক চাপ অব্যাহত রাখারও আহ্বান জানান তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় যুক্তরাজ্যের সমর্থনকে উৎসাহব্যঞ্জক বলে অভিহিত করেন শহীদুল হক। তিনি বলেন, ব্রিটিশ সরকার আরও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর তা শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, মানবিক সহায়তার বিবেচনাতেও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। রোহিঙ্গা সংকটকে বহুমাত্রিক ও বহুস্তর বিশিষ্ট বলে বর্ণনা করে শহীদুল হক বলেন, এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কা আছে। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য স্ট্রাটেজিক ডায়ালগে অংশ নিতে লন্ডনে রয়েছেন শহীদুল হক।

  •