চট্টগ্রামের জনসভায় মানুষের ঢল

প্রকাশিত: ১১:২০ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৬, ২০১৮

চট্টগ্রামের জনসভায় মানুষের ঢল

চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আন্দোলনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাজপথে নামলে সরকারের তখতে তাউস তছনছ হয়ে যাবে বলেই তাকে অন্যায়ভাবে নির্জন কারা প্রকোষ্ঠে বন্দি করে রাখা হয়েছে। দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার লুট হয়ে গেছে। জনগণের আন্দোলনের মাধ্যমে লুট হওয়া গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি সরকারকে দাম্ভিকতা পরিহার করে অবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, চলমান সঙ্কট নিরসনে এটিই একমাত্র পথ নিরপেক্ষ নির্বাচন। দয়া করে বিদায় নিন, জনগণ আপনাদের আর চায় না। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বিএনপি আয়োজিত নাসিমন ভবনস্থ দলীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। চট্টগ্রামে বিএনপির জনসভায় মানুষের ঢল নামে। বন্দর নগরীর নুর আহমদ সড়কে অনুষ্ঠিত জনসভাকে ঘিরে প্রায় এক বর্গকিলোমিটার এলাকা জনসমুদ্রে রূপ নেয়। এক সপ্তাহ আগে চট্টগ্রাম মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে লালদীঘি ময়দানে জনসভার ঘোষণা দিলেও পুলিশের অনুমতি পায়নি বিএনপি। বুধবার রাত ১১টার পর পুলিশের পক্ষ থেকে নাসিমন ভবনস্থ দলীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে জনসভা করার অনুমতি দেয়। অনুমতি দেয়ার পরপরই রাত থেকে শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। এরপরও গতকাল জনসভাকে ঘিরে নেতাকর্মীদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে জনসভায় যোগ দেয় নেতাকর্মীরা। নির্ধারিত সময় বিকেল ৩টায় জনসভায় শুরু হলেও তার আগে পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিকেল নাগাদ নগরীর লাভলেইন মোড় থেকে শুরু করে নেভাল এভিনিউ, আউটার স্টেডিয়াম হয়ে কাজির দেউড়ি মোড় ও আলমাস সিনেমা পর্যন্ত বিস্তৃত হয় মানুষের ঢল। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বন্দর নগরীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে জনসভায় যোগ দেয়। তাদের হাতে শোভা পায় বেগম খালেদা জিয়ার ছবি ও ব্যানার ফেস্টুন। আর এতে করে মিছিলের নগরীতে পরিণত হয় পুরো নগরী। জনসভার আশপাশে মোতায়েন ছিল ২ হাজারের বেশি পুলিশ। তবে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয় জনসভা। ধরপাকড়, বাধা-প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে জনসভা সফল করায় চট্টগ্রামের জনগণের প্রতি মোবারকবাদ জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিপ্লবী চট্টগ্রামের মানুষ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রেখেছে। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনেও চট্টগ্রামবাসী প্রমাণ করেছে তারা গণতন্ত্রের পক্ষে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। দেশে চরম দুঃশাসন চলছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, এখানে গণতন্ত্র নেই, বাকস্বাধীনতা নেই, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই। মানবাধিকার চরমভাবে লুণ্ঠিত। অবৈধ সরকার ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে। ১৫৪ আসনে ভোট ছাড়াই যে সংসদ সে সংসদে জনগণের কোনো প্রতিনিধি নেই। এ সংসদে বসে জননিপীড়নমূলক আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। : এক দেশে দুই আইন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে আইনের শাসন নেই। খুন, গুম, অপহরণ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৭৮ হাজার মামলা হয়েছে। ১১ লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। রাস্তায় শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেও সরকার বাধা দিচ্ছে। যখন যাকে খুশি তাকে ধরে নিয়ে গুম করা হচ্ছে। রাজধানীর ছাত্রদল নেতা জাকির হোসেন মিলনের নির্মম হত্যাকান্ডের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, তাকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি তার বাসায় গিয়েছি। তার বড় মেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। সে কথা বলতে পারে না। পিতার জন্য এ বোবা মেয়েটির কান্না পাষাণ হৃদয়কেও গলিয়ে দিচ্ছে। মির্জা ফখরুল বলেন, খনার বচনে আছে- রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট, প্রজা কষ্ট পায়। সরকারের দুঃশাসনের কারণে জনগণ দুঃসময় পার করছে। অর্থনীতি ধ্বংসের পথে দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। ১০ টাকায় চাল খাওয়ানোর ওয়াদা দিয়ে তারা ক্ষমতায় এসেছিল, এখন চালের দাম ৬০-৭০ টাকা। উন্নয়নের নামে লুটপাট চলছে। দেশে মানুষের নিরাপত্তা নেই। চারদিকে আতঙ্ক আর হাহাকার। : আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি নয় আওয়ামী লীগই রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে। আর এ কারণেই তারা পুলিশের মাধ্যমে জুলুম-নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, দেয়ালে লিখন পড়–ন, জনগণের মনের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন, জুলুম-নির্যাতন করে বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা যাবে না। জনগণ আপনাদের আর চায় না, দয়া করে সরে যান। তিনি বলেন, দেশে সঙ্কট চলছে। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য আমরা বারবার আলোচনার প্রস্তাব দিলেও সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না। তিনি বলেন, দাম্ভিকতা পরিহার করুন, সংসদ ভেঙে দিন। নির্দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। এটাই সঙ্কট উত্তরণের একমাত্র পথ। : বেগম খালেদা জিয়াকে মাদার অব ডেমোক্রেসি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি। সরকার তার জনপ্রিয়তাকে ভয় পায় বলেই তাকে কারাবন্দি করে রেখেছে। একজন গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার রক্ষায় তিনি দীর্ঘ সংগ্রাম করেছেন। জীবন সায়াহ্নে এসেও তিনি তার সংগ্রামী ভূমিকা থেকে পিছপা হননি। কারাগারে বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা তাঁর দৃঢ় মনোবল দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছি। মির্জা ফখরুল বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মানুষের অধিকার রক্ষায় গোটা জাতি এখন ঐক্যবদ্ধ। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনা হবে। তিনি তার বক্তব্যের শুরুতে নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে দুর্ঘটনায় নিহতদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকার মনে করেছিল বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দি করে বিএনপিকে তছনছ করে দেবে। কিন্তু তাদের সে পরিকল্পনা বুমেরাং হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া এখন দেশনেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রীতে পরিণত হয়েছেন। তিনি বেগম খালেদা জিয়াকে দেশমাতা উপাধি দিয়ে বলেন, তার নেতৃত্বেই বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে এবং আগামী দিনে সরকার গঠন করবে। : বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, দেশের স্বাধীনতা আজ হুমকির মুখে। স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করতে হলে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশে আইনের শাসন নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে দেশে প্রধান বিচারপতিকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় সে দেশে আইনের শাসন থাকে না। সরকারের দুর্বল পররাষ্ট্রনীতির কারণে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না অভিযোগ করে তিনি বলেন, বিপদে বন্ধুর পরিচয় কিন্তু বাংলাদেশের এ বিপদে ভারত বন্ধুর পরিচয় দেয়নি। এ সরকার ভারতকে না চাইতে অনেক কিছু দিয়েছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা ভারতের সমর্থন পায়নি। তিনি অবিলম্বে জাতিসংঘের মাধ্যমে ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে সে দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায়, সে পরিবর্তন আসবে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। : বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, সরকার লুটপাট করেছে বলেই ভয় পাচ্ছে। কারণ ক্ষমতা থেকে নামলেই তাদের এর জবাব দিতে হবে। উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা কারও কাছে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ভিক্ষা চাই না। আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেফতার হচ্ছে, আমরা তাদেরও মুক্তি চাই না। গণতন্ত্রকে মুক্ত করে আমরা সবাইকে মুক্ত করে আনব। ছাত্রদল নেতা জাকিরকে যারা খুন করেছে তাদের কড়ায়-গন্ডায় হিসাব দিতে হবে। তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদের রাজপথে থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ১৬ কোটি মানুষ বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে, গণতন্ত্রের পক্ষে, আমরা জনগণের পক্ষে আছি। জনগণকে সাথে নিয়েই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করব। বাকস্বাধীনতা এবং জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করব। : বর্তমান সরকার স্বৈরতন্ত্র ও বাকশালের পথে হাঁটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের সাথে জনগণ নেই। আর এ কারণেই তারা বেগম খালেদা জিয়াকে ভয় পায়, জনগণকে ভয় পায়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে বিএনপির জনসভায় লাখো মানুষের ঢল প্রমাণ করে চট্টগ্রাম বিএনপির ঘাঁটি, খালেদা জিয়ার ঘাঁটি। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া আমার মা, কারাগারে থাকবে নাথÑ এ সেøাগান আজ প্রতিটি ঘরে ঘরে মানুষের মুখে মুখে। গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রীকে বন্দি করার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে বন্দি করা হয়েছে। গণআন্দোলনের মাধ্যমে তাকে মুক্ত করে আনব। : বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, চট্টগ্রাম বিপ্লবী চট্টগ্রাম। এ চট্টগ্রাম থেকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন হয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনও চট্টগ্রাম থেকে শুরু হলো। পুলিশের শত বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে জনসভা সফল করায় তিনি চট্টগ্রামের গণমানুষকে অভিনন্দন জানান। : মহানগর বিএনপির সভাপতি সদ্য কারামুক্ত ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করের সঞ্চালনায় জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবেদিন ফারুক, গোলাম আকবর খন্দকার, বেগম রোজী কবির ও এস এম ফজলুল হক, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক এমপি মোস্তফা কামাল পাশা, শ্রমিক দল নেতা এএম নাজিম উদ্দিন, বিএনপি নেতা আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদল নেতা শহিদুল আলম শহিদ প্রমুখ। : জনসভায় বেগম খালেদা জিয়ার ছবি সম্বলিত ব্যানার, ফেস্টুন বহন করে নেতাকর্মীরা। বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে নেতাকর্মীদের অনেকে কালো ব্যাজ ধারণ করেন। কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ঢাকা এবং দেশের মহানগরগুলোতে জনসভার ঘোষণা দেয় বিএনপি। এই ধারাবাহিকতায় ১০ মার্চ খুলনায় জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। আগামী ১৯ মার্চ ঢাকায় জনসভার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরেও জনসভা হবে।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট