ফয়জুলের ন্যাক্ষারজনক ঘটনায় নিজ গ্রাম কালিয়ারকাপনে ক্ষোভ

প্রকাশিত: ১১:৩০ অপরাহ্ণ, মার্চ ৫, ২০১৮

ফয়জুলের ন্যাক্ষারজনক ঘটনায় নিজ গ্রাম কালিয়ারকাপনে ক্ষোভ

আল-হেলাল, সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা : শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও জনপ্রিয় লেখক ড. জাফর ইকবালকে গত শনিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যলয় ক্যাম্পাসে ছুরিকাঘাত করা হয়। এর পরেই হামলাকারী ফয়জুল হাসানের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশের পর সারা দেশের মত ফয়জুলের নিজ গ্রাম সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার কালিয়ার কাপন গ্রামে চলছে তুমুল আলোচনা সমালোচনার ঝড়। ফয়জুল রহমানের এমন ন্যাক্ষারজনক কর্মকান্ডের তীব্র নিন্দার পাশাপাশি তার শাস্তির দাবী জানিয়েছে কালিয়ার কাপন গ্রাম ও দিরাই উপজেলাবাসী। অনেকেই তার ও তার পরিবারের আপন চাচাদের বিষয়েও জানাচ্ছেন নানান অজানা কথা।
এছাড়াও অধ্যাপক জাফর ইকবালের উপর হামলাকারী ফয়জুলের নিজ গ্রাম কালিয়াকাপন সরকারী প্রথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এলাকাবাসী মানববন্ধন করেছে। মানববন্ধনে এলাকাবাসী ফয়জুল কে কালিয়ারকাপন, দিরাইবাসী নয় সমগ্র বাংলাদেশের কলংক বলে আখ্যায়িত করে তীব্র ঘৃনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সেই সাথে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান সবাই।
এদিকে ফয়জুরকে গত রবিবার বিকাল সাড়ে ৫টায় র‌্যাবের ৯ এর একটি দল সিলেট কোতোয়ালী থানা পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহাকারী কমিশনার (এসি,কোতোয়ালী) সাদেক কাওসার দস্তগীর ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ গৌছুল হোসেন এর কাছে হস্তান্তর করেছে।
স্কুল জীবনে ফয়জুল হাসান ছিল মেধাবী। শুরুতেই কওমী মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে শুরু করে তার শিক্ষা জীবন। সে দিরাই উপজেলার তারাপাশা মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেনী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। পরে ভর্তি হয় ধল দাখিল মাদ্রাসায়। এরপর ২০১১ সালে অষ্টম শ্রেনীতে ভর্তি হয়ে জেডিসি পরীক্ষায় জিপিএ ৩.৭৮ পেয়ে উক্তীর্ন হয়। এরপর ২০১৪ সালে দাখিল পরীক্ষায় ৪.৫৬ পেয়ে উত্তীর্ন হয়। দাখিল পাশ করার পর কেউ তার শিক্ষা জীবন নিয়ে জানতে পারেনি।
একাধিক সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কালিয়ার কাপন গ্রামের একবারে দক্ষিন দিকে লম্বা দুটি দালান বিশিষ্ট বসতঘরের আলাদা বাড়িতে পরিবারের লোকজন নেই সবকটি ঘর তালাবদ্ধ। পাশের বাড়িতে রয়েছে ফয়জুরের ফুফু রেহানা বেগম। তিনি কান্নাকাটি করছেন। ফয়জুল হাসান ফয়জুলের পিতা হাফিজ মাওলানা আতিকুর রহমান পরিবার নিয়ে সিলেট থাকেন। এলাকায় পরিচিতি রয়েছে তার কুরেশ আলী নামে। ৩ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে। ফয়জুল হাসান তাদের মধ্যে ৩য়। ফয়জুলের বড় ভাই এনামুল হাসান ঢাকায় একটি প্রতিষ্টানে চাকরী করে। মেঝ ভাই আবুল হাসান কুয়েত প্রবাসী। কিছু দিন পুর্বে ফয়জুল হাসানের বাবা সিলেট শহরের কুমারগাও এলাকায় শেখ পাড়ায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিজস্ব বাসা তৈরী করে বসবাস করছে। এখানে ফয়জুলও বসবাস করছিল। সিলেটে বসবাস করায় গ্রামের বাড়ি কালিয়ারকাপনে একবারেই কম যোগাযোগ ছিল। ফয়জুল মাঝে মাঝে শহরে ফেরী করে কাপড় বিক্রি করত। ফয়জুলের দাদা একজন ভাল মানুষ হলেও তার সন্তান (ফয়জুলের চাচা) জাহার মিয়া ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ফতোয়াবাজীর অভিযোগে ও এলাকায় মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় তাকে এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর আর গ্রামে আসেননি। তিনি বর্তমানে কুয়েত প্রবাসী। ফয়জুলের চাচা জাহার মিয়া ও আব্দুল কাহার আহলে হাদিস ধারার অনুসারী। তারা দীর্ঘদিন ধরেই কুয়েতে থাকে।

ফয়জুল হাসান সম্পর্কে কালিয়ার কাপন গ্রামের স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, গত কয়েক বছর ধরেই ফয়জুল মাঝে মাঝে এলাকায় এসে ফেরী করে কাপড় বিক্রি করত। এছাড়াও আনুমানিক ৫ বছর পূর্বে মাজহাব বিরোধী মতাদর্শ নিয়ে কথাবার্তা বলতে গিয়ে স্থানীয় মুসল্লিদের বাধায় মসজিদ থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। এরপর আর ফয়জুল গ্রামে ফিরে যায়নি।

গ্রামের বাসিন্দা যুবলীগ নেতা লুৎফুর রহমান চৌধুরী জানান, ফয়জুল তার চাচা জাহারের পথ ধরেই তার মতাদর্শ গ্রামের লোকজনের মাঝে মসজিদে প্রচারনা চালায়। গ্রামের কিছু কিছু মানুষ লক্ষ্য করেন তারা (চাচা জাহার ও ভাতিজা ফয়জুল) স্বাভাবিক ভাবে সবাই নামাজ পড়লেও তারা সে নিয়মে নামাজ পড়েনি। এনিয়ে গ্রামের মুসল্লিদের মাঝে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে তাদের মসজিদে নামাজ আদায় করতে বাধা দেওয়া হয়। এক সময় তাদের মসজিদে আসতে নিষেধ করাও হয়। এরপর তারা এলাকা ছেড়ে চলে যায়। মাঝে মাঝে ফয়জুল হাসান লুঙ্গি, গামছা বিক্রি করার জন্য এলাকায় আসত।

কালিয়াকাপন গ্রামের জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ হাবিবুর রহমান জানান, আমি ৩-৪ বছর ধরে এই এলাকার মসজিদে ইমামতি করছি। লোক মুখে শুনেছি ফয়জুল ও তার দু চাচা মাজহাববিরোধী প্রচারনা চালালে সুন্নি মতাবলম্বী মুসল্লিরা তাদেরকে মসজিদে আসতে নিষেধ করেন। এরপর তারা আর মসজিদে নামাজ পড়তে আসত না।

উল্লেখ্য, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও জনপ্রিয় লেখক ড. জাফর ইকবাল গত শনিবার বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যলয় মুক্ত মঞ্চে ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) ফেস্টিভ্যালের সমাপনী অনুষ্টান চলাকালে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন। সাথে সাথে তাকে উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। আর হামলাকারীকে গনধোলাই দিয়ে একাডেমিক ভবনে আটক করে পরে রাত ৯টায় র‌্যাবের একটি টিম হামলাকারীকে উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে র‌্যাব তার মামা ও চাচাকে আটক করেছে।
সুনামগঞ্জের দিরাই থানার পরির্দশক (তদন্ত) এবিএম দেলোয়ার হোসেন জানান, র‌্যাব-৯ সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় কালিয়ার কাপন গ্রামে গত রোববার ভোরে অভিযান চালিয়ে হামলাকারী ফয়জুলের চাচা আব্দুল কাহার লুলই (৫৫) কে আটক করে। এর পূর্বে হামলাকারীর মামা সুনামগঞ্জ জেলা কৃষকলীগের যুগ্ম আহবায়ক ফয়জুর রহমান কে শনিবার রাতে সিলেটের নিজ বাসা থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে র‌্যাব।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট