আজ বিকেলে গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন খালেদা জিয়া

প্রকাশিত: ১২:১১ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৮

আজ বিকেলে গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন খালেদা জিয়া

আজ বুধবার বিকেল ৫টায় গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এ তথ্য জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তা শায়রুল কবির খান। রায়ের আগের দিন এই সংবাদ সম্মেলন ডাকায় ধারণা করা হচ্ছে মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনে জাতির সামনে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা এবং দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরবেন তিনি।

যেকারণে খালাস পেতে পারেন খালেদা
আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। মামলার শুনানিতে খালেদা জিয়ার যাবজ্জীবন সাজা চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। ন্যায় বিচার পেলে তিনি অভিযোগ থেকে খালাস পাবেন।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত একটি মামলা। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠনের সময় বেগম জিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর এই মামলাগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুই নেত্রীকে মাইনাস করার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতার পালা বদল হলে সরকার শেখ হাসিনার সব মামলা প্রত্যাহার করে নিল অপরদিকে খালেদা জিয়ার একটি মামলাও প্রত্যাহার করা হলো না। এতে স্পষ্ট বুঝা যায় এটি একটি রাজনৈতিক মামলা। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুদকের করা এই ঠুনকো মামলাটিতে আগেই খালাসের রায় হয়ে যাওয়া উচিত ছিল।

বার সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদন দেখলেই বুঝা যায় এটা বানানো, নাটকটি সাজানো। যেভাবে আওয়ামী সরকারের মন্ত্রীরা রায়ের আগেই রায় বলে দিচ্ছেন তা প্রমাণ করে সরকার প্রহসনের রায়ের জন্য নাটক সাজানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস আদালত নিরপেক্ষ বিচার করলে বেগম খালেদা জিয়া খালাস পাবেন।

অন্যদিকে, বিএনপির সিনিয়র নেতা ও খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন, রাষ্ট্রপক্ষ কোনো অভিযোগই প্রমাণ করতে পারেনি। প্রসিকিউশনের কোনো এভিডেন্সেই মামলাটি প্রমাণিত হয়নি। সর্বোপরি মামলায় খালেদা জিয়ার ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ হয়নি। তারা আশা করছেন- আদালত সাক্ষ্য, কাগজপত্র, তথ্য-প্রমাণ বিবেচনায় নিলে এ মামলায় খালেদা জিয়া বেকসুর খালাস পাবেন।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আরটিএনএনকে বলেন, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২)(ঘ) উপ-অনুচ্ছেদে সংসদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়ে বলা আছে। এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে’ তাহলে তিনি নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য হবেন।’ তবে উচ্চ আদালতে আপিল আবেদন গৃহীত হলে উচ্চ আদালত সাজা পরিবর্তন ও রায় স্থগিত করতে পারেন। সে ক্ষেত্রেও নিম্ন আদালতে সাজা প্রাপ্ত নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। যার উদাহরণ- আওয়ামী লীগ নেতা ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, বিএনপির লুৎফুজ্জামান বাবরসহ কয়েকজন দুর্নীতির মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েও আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালত থেকে অনুমতি নিয়ে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবী আহসান উল্লাহ বলেন, কুয়েত থেকে টাকা আসার পর দুই ভাগ হলো। এক ভাগ কামাল সিদ্দিকী নিয়ে গেলেন ট্রাস্টের জন্য। আরেক ভাগ তারেক রহমানের কাছে এলো মঈনুল রোডের ঠিকানায়। মামলার তদন্তে বলা হলো, প্রথম ভাগ সুন্দরভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। আর দ্বিতীয় ভাগ সঠিকভাবে পরিচালনা হচ্ছে না। অথচ দ্বিতীয় ভাগের টাকাও ব্যাংকে রয়েছে। প্রাইভেট ট্রাস্টের এ টাকা দুই কোটির পরিবর্তে ৬ কোটিতে পরিণত হয়েছে। এখান থেকে টাকাটা খরচও করা হলো না। তাহলে এই টাকা কী ক্ষতি হলো যে, মামলা করতে হবে। প্রথম ব্যক্তি হিসেবে কামাল সিদ্দিকীর নামে তো মামলা হলো না। তাহলে এখানে কেন মামলা হবে? অথচ মামলার কোনো গ্রাউন্ড নেই। পিপি (সরকারি কৌঁসুলি) সাহেব আসামিদের যাবজ্জীবন চেয়ে বসলেন। তিনিই চাইতে পারেন। কারণ আমরা যখন মুনাজাত করি তখন আল্লাহর কাছে অনেক কিছুই চাই। তখন কিন্তু ফেরেশতা এসে বাধা দেয় না। কিন্তু আল্লাহ যা খুশি মন চাইলে ন্যায়বিচার করে দিতে থাকেন।

এই আইনজীবী বলেন, ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বললেন, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ষড়যন্ত্র করে টাকা খেয়েছেন। কিন্তু এখানে তো ষড়যন্ত্রের ‘ষ’ এর গন্ধ নেই। বরং ঘটনা হলো ১৯৯৩ সালের। আর মামলা হলো ওয়ান এলেভেনের সময়। হাসান মশহুদ চৌধুরীরা (দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা) গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্য এসব কাজ করেছেন। তারা মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের জন্য দুই নেত্রীকে কারাগারে পাঠালেন।’

বিএনপি আইনজীবীদের অভিযোগ ছিল, হারুন অর রশিদ আজ্ঞাবহ হয়ে এ মামলার বাদী হয়েছেন এবং তদন্ত করেছেন। তিনি প্রকৃতভাবে এ মামলার তদন্ত করেননি।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতকে বলেছিলেন, ‘২০১২ সালে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ভৈরব সেতু নির্মাণের সময় ১০০ কোটি টাকার একটি দুর্নীতির অভিযোগ এসেছিল। সেই মামলায় হারুন সাহেব তদন্ত করে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন। তিনি খুব খারাপ লোক, স্যার!’ শুধু খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে না আরো অনেকের বিরুদ্ধে তদন্ত করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন হারুন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। এটা প্রমাণিত তিনি অপরাধী। আদালত খালাস দিবেন নাকি যাবজ্জীবন দিবেন এটা আদালতের বিষয়। আমরা শাস্তি চেয়েছি’।

এদিকে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় একজন আইনজীবী জানান, ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টি এখনো সেটেল হয়নি। কোনো রায়ে নেই, আবার আইনও হয়নি। অনেক আগে একটি রায়ে বিচারপতি জয়নাল আবেদীন বলেছিলেন, নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। আর বিচারপতি খায়রুল হক বলেছেন পারবে না। এ বিষয়টির সুরাহা তৃতীয় কোনো বেঞ্চে যায়নি। এ বিষয়টি পুরো অস্পষ্ট।

এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, এখন পর্যন্ত আইন যা আছে, তাতে আপিল করলে জামিন পাবেন। জামিন পেলেই নির্বাচন করতে পারবেন। আপিলটা ট্রায়াল কোর্টের কন্টিনিউয়েশন। আপিল কোর্টে যা হবে, সেটাই ফাইনাল। যতক্ষণ না ফাইনাল হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত নয়; জেল হিসেবে কাউন্ট হবে জাজমেন্টের পর।

আইনজীবীরা জানান, ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী হিসেবে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় অভিযোগ গঠন হয়েছে। ফলে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা হিসেবে অর্থদণ্ডও হতে পারে। এই ধারায় আদালত কারাদণ্ড না দিয়ে শুধু জরিমানা দণ্ডও করতে পারেন। কেননা এই ধারায় সাত বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

রায় প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, আমার মনে হয় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের প্রসিকিউশনের কোনো এভিডেন্সেই মামলাটি প্রমাণিত হয়নি। তাই সোজা সাপ্টা মামলাটিতে বেগম জিয়া খালাস পেতে পারেন। এই আশায় দেশের জনগণ করতেই পারেন। আদালতের প্রতি আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস আছে। আমি শুধু বলতে পারি প্রসিকিউশনের কোনো এভিডেন্সেই মামলাটি প্রমাণিত হয়নি।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার নথি থেকে জানা যায়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া,তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

মামলায় খালেদা জিয়া ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন—মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী সালিমুল হক কামাল,ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ,প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

প্রসঙ্গত, আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারিত রয়েছে।

আর রায় ঘোষণার আগেই শঙ্কা প্রকাশ করে বিএনপি নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তাদের অভিযোগ সরকারের ছকেই রায় ঘোষণা হবে। এমন হলে সারা দেশে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন তারা। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার মামলাটি আদালতের বিচার্য বিষয়। আদালতে নির্ধারিত হবে তিনি দোষী না নির্দোষ। রায়কে সামনে রেখে দলটিতে চলছে দুই ধরনের প্রস্তুতি। রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা হলে আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি দলটির নেতাকর্মীরা সর্বাত্মকভাবে নামবে রাজপথে। কেন্দ্রের কর্মসূচির অপেক্ষায় থাকবে না তৃণমূল।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায়কে ঘিরে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আওয়ামী লীগ। রায়কে ঘিরে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে সারা দেশে। এ ছাড়া আদালতের রায়কে ঘিরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সরকারের তরফ থেকে।

এরই ধারাবাহিকতায় ৮ ফেব্রুয়ারি রায়কে কেন্দ্র করে সকাল ৪টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় অস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য বহন এবং যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় এমন সকল সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া। মঙ্গলবার দুপুরে ডিএমপি কর্তৃক আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা জানান।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট